অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রকৃতির সঙ্গে লড়ছে উত্তরের কৃষকরা

অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রকৃতির সঙ্গে লড়ছে উত্তরের কৃষকরা

ফন্ট সাইজ:

উত্তরাঞ্চলের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত মাঠগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের এক নিঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়া আর ঋতুচক্রের খামখেয়ালিপনায় অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে এই জনপদের প্রাণ কৃষি। তৃষ্ণার্ত মাটির বুক চিরে ফসল ফলাতে গিয়ে চিরাচরিত ধানের মায়া ত্যাগ করে এখন ফলদ বাগানের দিকে ঝুঁকছে কৃষক। এই ঝুঁকে পড়া প্রকৃতির বৈরী আচরণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকার একান্ত যুদ্ধ।
বাংলাদেশের মানচিত্রে যে অঞ্চলটিকে এক সময় সুজলা সুফলা শস্যভাণ্ডার বলা হতো, সেই উত্তরাঞ্চলের চিরাচরিত কৃষি এখন কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট ও রাজশাহী সংলগ্ন বরেন্দ্র অঞ্চলের দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠগুলো প্রকৃতি আর জলবায়ুর খামখেয়ালি আচরণে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে।

পাল্টে যাচ্ছে এই জনপদের মাটির ঘ্রাণ আর কৃষকের স্বপ্ন। সামপ্রতিক বছরগুলোতে অনাবৃষ্টি এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমেছে। ফলে এই অঞ্চলের মানুষের জন্য বেঁচে থাকার লড়াই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এবং ইনস্টিটিউট অফ ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) সামপ্রতিক গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশকে উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকায় পানির স্তর গড়ে ১৫ থেকে ২০ ফুট নিচে নেমে গেছে। ফলে এক সময় যেসব অগভীর নলকূপ দিয়ে অনায়াসে মাঠের সেচ কাজ চলতো, সেগুলো এখন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এই পানির হাহাকারই মূলত উত্তরাঞ্চলের কৃষিকে আমূল বদলে দিচ্ছে। এই রূপান্তরের পেছনে কাজ করছে অমোঘ অর্থনৈতিক সমীকরণ। মাঠপর্যায়ের হিসাব বলছে, এক বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদে বীজ, সার, সেচ এবং শ্রমিকের পেছনে যে খরচ হয়, ধান বিক্রির পর তার লভ্যাংশ অনেক সময়ই কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে পারে না। অথচ একই পরিমাণ জমিতে ফলের বাগান করলে শুরুর দুই এক বছরের বিনিয়োগের পর লাভের পরিমাণ ধানের তুলনায় প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি।

এই গাণিতিক লাভ কৃষকের পকেট ভারী করছে। সেইসঙ্গে বদলে দিচ্ছে গ্রামীণ শ্রমবাজারের চিত্রও। এক সময় ধান রোপণ কিংবা মাড়াইয়ের মৌসুমে যে নারী শ্রমিকদের সরব উপস্থিতি দেখা যেত, বাগানভিত্তিক কৃষিতে তাদের অংশগ্রহণ কিছুটা সংকুচিত হচ্ছে। ফলে ধান থেকে ফলের বাগানে এই রূপান্তর গ্রামীণ কর্মসংস্থানের চিরাচরিত কাঠামোতেও পরিবর্তন আনছে। অনেক প্রান্তিক কৃষক এখন অন্যের জমিতে কামলা দেওয়ার চেয়ে নিজের ছোট আম বা মাল্টার বাগান নিয়ে ব্যস্ত থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেমন পানির অভাব দেখা দিয়েছে তেমনি ঋতুচক্রের খামখেয়ালিপনাও কৃষকদের ভাবিয়ে তুলছে। উত্তরাঞ্চলে এখন আর আগের মতো সময়মতো বৃষ্টি হয় না। বর্ষার বদলে হুট করে তীব্র তাপদাহ কিংবা অসময়ের অতিবৃষ্টি কৃষকের হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিচ্ছে। বিশেষ করে চৈত্র ও বৈশাখ মাসে যখন ধানে থোড় আসে, তখন পানির তীব্র সংকটে অনেক সময় মাঠের ফসল মাঠেই শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। পানির এই সংকটের সমান্তরালে উত্তরাঞ্চলে কাজ করছে সেচ ব্যবস্থাপনার এক অদৃশ্য রাজনীতি। বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থা মূলত গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল, আর এই নলকূপ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অপারেটরদের প্রভাব অনেক সময় সাধারণ কৃষকদের জন্য বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পানির অভাবের চেয়েও সঠিক সময়ে পানির সুষম বণ্টন না হওয়া অনেক ক্ষেত্রে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এর পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে ধানি জমিকে বাগানে রূপান্তর করায় মাটির উপরিভাগের চরিত্রেও পরিবর্তন আসছে। একটানা ধান চাষের ফলে মাটির যে আর্দ্রতা এবং রাসায়নিক ভারসাম্য থাকতো, ফলের বাগানে অধিক মাত্রায় কীটনাশক ও হরমোন ব্যবহারের ফলে সেই ভারসাম্যের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে বাগান তৈরি মাটির তলার পুষ্টি উপাদানে এমন সব পরিবর্তন আনতে পারে যা ভবিষ্যতে অন্য কোনো ফসল চাষের জন্য মাটিকে অনুপযোগী করে তুলতে পারে। তাই এই রূপান্তর যেন মাটির প্রাণ কেড়ে না নেয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। এই প্রতিকূলতার মাঝেও আশার আলো দেখাচ্ছে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি। অনেক সচেতন কৃষক এখন ড্রিপ ইরিগেশন বা ফোঁটায় ফোঁটায় সেচ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। তবে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে খরা সহিষ্ণু জাতের বীজ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা সব প্রান্তিক কৃষকের কাছে এখনো সমানভাবে পৌঁছায়নি। এই জটিল পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে নিহিত। উন্নত বিশ্বে যখন সেন্সর ব্যবহার করে মাটির আর্দ্রতা মেপে একদম মেপে মেপে সেচ দেওয়া হচ্ছে, আমাদের উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা তখনো অনুমানের ওপর ভিত্তি করে মাঠে পানি দিচ্ছে।

এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার করে যদি কোন জমিতে কতটুকু পানির প্রয়োজন তা শনাক্ত করা যেত, তবে ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় আরও বহুগুণ কমানো সম্ভব হতো। পাশাপাশি যমুনা ও তিস্তার মতো নদীগুলোর নিয়মিত ড্রেজিং এবং বর্ষার পানি সংরক্ষণের জন্য বড় বড় পুকুর বা জলাধার খনন এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে অনেক শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা যারা করপোরেট পেশা ছেড়ে মাটির টানে বাগানে বিনিয়োগ করছেন, তারা এই স্মার্ট প্রযুক্তির প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারেন।

কৃষির এই রূপান্তর সাময়িকভাবে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে হলেও বিশেষজ্ঞ মহলে কিছু দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ধানি জমি যদি এভাবে কমতে থাকে, তবে দেশের প্রধান খাদ্যশস্য চালের উৎপাদনে এর প্রভাব পড়তে পারে। শস্যভাণ্ডার খ্যাত এই অঞ্চলটি যেন মরুপ্রক্রিয়ার গ্রাসে না পড়ে, সেজন্য সুপরিকল্পিত কৃষি ব্যবস্থাপনা ও পানির বিকল্প উৎসের সন্ধান করা এখন সময়ের দাবি। উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করছে। এই লড়াইয়ে তারা জয়ী হতে শুরু করেছে কৃষির ধরন পরিবর্তনের মাধ্যমে। তবে এই রূপান্তর যেন সুপরিকল্পিত হয় এবং প্রান্তিক কৃষকরা যেন আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক সুবিধা পায়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। অন্যথায়, উত্তরের এই সবুজ ভূখণ্ড অদূর ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন