নিরপেক্ষতার দাম: অস্ত্র রপ্তানি কি সুইজারল্যান্ডের নীতিকে বন্দি করছে?

নিরপেক্ষতার দাম: অস্ত্র রপ্তানি কি সুইজারল্যান্ডের নীতিকে বন্দি করছে?

ফন্ট সাইজ:

বিশ্ব রাজনীতিতে সুইজারল্যান্ড একটি ব্যতিক্রমী রাষ্ট্র। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেশটি নিজেকে নিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দুই বিশ্বযুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ বা সাম্প্রতিক ইউরোপীয় নিরাপত্তা সংকট, প্রতিটি অধ্যায়েই সুইজারল্যান্ডের পরিচয় ছিল শান্তি, মধ্যস্থতা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের রাষ্ট্র হিসেবে। কিন্তু সেই দেশটিই আজ এমন এক প্রশ্নের মুখোমুখি, যার উত্তর শুধু অর্থনীতির নয়, নৈতিকতা ও রাষ্ট্রদর্শনের সঙ্গেও জড়িত। প্রশ্নটি হলো, একটি নিরপেক্ষ দেশ কতদূর পর্যন্ত অস্ত্র রপ্তানি করতে পারে?

ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে, অস্ত্র উৎপাদন বাড়াচ্ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। এই বাস্তবতায় সুইজারল্যান্ডের প্রচলিত অস্ত্র রপ্তানি নীতি ইউরোপের অনেক দেশের কাছে ক্রমশ অসুবিধার কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ, সুইস আইনে যুদ্ধরত কোনো দেশের কাছে অস্ত্র বিক্রি নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয়, কোনো দেশ সুইস অস্ত্র কিনলে সেটি অন্য কোনো দেশে পুনরায় রপ্তানি করতেও সুইজারল্যান্ডের অনুমতি প্রয়োজন হয়। ফলে জার্মানি, ডেনমার্ক কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো ইউক্রেনকে সুইস অস্ত্র বা গোলাবারুদ সরবরাহ করতে পারেনি।

এখানেই তৈরি হয়েছে নীতিগত দ্বন্দ্ব। সুইজারল্যান্ড বলছে, নিরপেক্ষতা রক্ষার জন্য এ ধরনের বিধিনিষেধ অপরিহার্য। অন্যদিকে ইউরোপের একটি বড় অংশ মনে করে, আগ্রাসনের শিকার কোনো দেশকে আত্মরক্ষার সুযোগ করে দেওয়া নিরপেক্ষতার পরিপন্থী নয়। বরং মানবিক দায়িত্বের অংশ। ফলে নিরপেক্ষতার অর্থ ও প্রয়োগ নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।

সুইস সরকার এখন এই আইন কিছুটা শিথিল করতে চায়। তাদের যুক্তি, বর্তমান বিধিনিষেধের কারণে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। অনেক দেশ সুইস অস্ত্র কিনতে দ্বিধা করছে, কারণ সেগুলোর ব্যবহারে রাজনৈতিক ও আইনি অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটো জড়িত কোনো বড় সংঘাত দেখা দিলে সরবরাহ সংকটও তৈরি হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।

সরকার ও অস্ত্র শিল্পের প্রতিনিধিরা বলছেন, এই খাত শুধু ব্যবসার বিষয় নয়, জাতীয় নিরাপত্তারও অংশ। অস্ত্র উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে হারিয়ে যাবে দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও শিল্পভিত্তি। একবার এই সক্ষমতা হারালে প্রয়োজনের সময় তা পুনর্গঠন করা কঠিন হবে। তাদের মতে, প্রতিরক্ষা শিল্প টিকিয়ে রাখা কৌশলগতভাবে অপরিহার্য।

কিন্তু বিরোধীরা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাদের প্রশ্ন, অস্ত্র কি সাধারণ কোনো পণ্য? ওষুধ, গাড়ি বা ভোগ্যপণ্যের সঙ্গে কি অস্ত্রের তুলনা চলে? একটি অস্ত্রের উদ্দেশ্যই হলো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার। ফলে অস্ত্র রপ্তানিকে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাদের মতে, অর্থনৈতিক মুনাফার জন্য এমন একটি শিল্পকে উৎসাহিত করা উচিত নয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি মানুষের প্রাণহানি।

মজার বিষয় হলো, রাজনৈতিক গুরুত্বের তুলনায় সুইস অস্ত্র শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব খুব বেশি নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ০.৪ শতাংশ এবং জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ এ খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। মোট রপ্তানির মাত্র ০.২ শতাংশ আসে যুদ্ধসরঞ্জাম বিক্রি থেকে। অর্থাৎ সুইস অর্থনীতির ভিত্তি অস্ত্র শিল্প নয়। ব্যাংকিং, প্রযুক্তি, ওষুধশিল্প কিংবা উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যই দেশটির অর্থনৈতিক শক্তির প্রধান উৎস।

তবে এটাও সত্য, অর্থনীতির সব হিসাব শুধু সংখ্যায় হয় না। একটি প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং কৌশলগত সক্ষমতা। তাই এই খাতকে একেবারে অপ্রয়োজনীয় বলার সুযোগও নেই।
আসল প্রশ্নটি অর্থনীতি বা নিরাপত্তার বাইরের। প্রশ্নটি হলো, সুইজারল্যান্ড তার পরিচয় কোন ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায়?

বিশ্বের কাছে সুইজারল্যান্ড পরিচিত হয়েছে অস্ত্র রপ্তানিকারক রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে। আন্তর্জাতিক রেডক্রস, শান্তি আলোচনা, মানবিক কূটনীতি কিংবা বৈশ্বিক সংকটে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে দেশটির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে এই ভাবমূর্তির কারণেই। সেই নৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হলে হয়তো কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা আসবে, কিন্তু হারিয়ে যেতে পারে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক পুঁজি।

ইতিহাস বলে, ছোট রাষ্ট্রগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সামরিক সক্ষমতা নয়; বরং তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা। সুইজারল্যান্ডও তার ব্যতিক্রম নয়। একটি দেশের অস্ত্রভাণ্ডার তাকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আস্থা তাকে প্রভাবশালী করে তোলে। সেই আস্থা গড়ে তুলতে দশক লাগে, অথচ নীতিগত বিচ্যুতিতে তা নষ্ট হতে পারে অল্প সময়েই।

শেষ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের সামনে প্রশ্নটি অস্ত্র রপ্তানির নয়, বরং আত্মপরিচয়ের। দেশটি কি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার চাপে নিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে শিথিল করবে, নাকি নতুন বাস্তবতার মধ্যেও সেই নৈতিক অবস্থান ধরে রাখার পথ খুঁজবে?

যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বের এ সময়ে হয়তো সবচেয়ে বড় সাহস অস্ত্র বিক্রিতে নয়, বরং নীতির পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে। সুইজারল্যান্ডের আসল শক্তি তার তৈরি গোলাবারুদে নয়, বরং তার প্রতি বিশ্বের আস্থায়। তাই আগামী দিনের সিদ্ধান্ত শুধু অস্ত্র রপ্তানির নিয়ম বদলাবে না; এটি নির্ধারণ করবে, একবিংশ শতাব্দীতে নিরপেক্ষতা এখনও একটি জীবন্ত আদর্শ, নাকি তা কেবল ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত এক সম্মানজনক স্মৃতি। কারণ নিরপেক্ষতার প্রকৃত শক্তি অস্ত্র বিক্রিতে নয়, বিশ্বাসযোগ্যতায়। আর একবার সেই বিশ্বাস ক্ষয়ে গেলে, সুইস ব্যাংক, সুইস ঘড়ি কিংবা সুইস কূটনীতি কোনোটিই তাকে সহজে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখেন।

ই-মেইল: [email protected]