রাত গভীর হলেও হাসপাতালের কাজ থামে না। জরুরি বিভাগে রোগী আসে, ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে প্রতিটি মুহূর্তে সতর্ক থাকতে হয়। এই সেবা সচল রাখেন চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। অথচ যাদের ওপর মানুষের জীবন রক্ষার এত বড় দায়িত্ব, তাঁদের নিজেদের জীবিকা, চাকরি ও অবসর জীবনের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত-সেই প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে এখন সমন্বিত সংস্কার জরুরি। চিকিৎসক সহ সব ধরনের স্বাস্থ্য কর্মীর জন্য পদ ও যোগ্যতা ভিত্তিক বাধ্যতামূলক ন্যূনতম মজুরি বা বেতন নির্ধারণ করতে হবে। জাতীয় বেতন স্কেলকে ভিত্তি করে বেতন-ভাতা এবং সরকারি চাকরির অনুরূপ চাকরির সুরক্ষা, পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
এসব শর্ত বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, নিবন্ধন, লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন নীতিমালায় যুক্ত করা প্রয়োজন। কর্মীদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বাধ্যতামূলক শর্ত হতে হবে। নীতিমালায় অধিকার উল্লেখ করার পাশাপাশি বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটিও নিয়মিত যাচাই করতে হবে।
বেসরকারি খাতের অবদান উপেক্ষার সুযোগ নেই
সরকারি হাসপাতাল ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার একটি বড় দায়িত্ব বহন করছে বেসরকারি খাত। মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এই বিস্তৃত কাঠামো বাদ দিয়ে দেশের চিকিৎসা সেবার সক্ষমতা মূল্যায়ন করা অসম্পূর্ণ।
২০২২ সালে ‘হিউম্যান রিসোর্সেস ফর হেলথ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাস্থ্যশ্রম বাজার বিশ্লেষণে মোট স্বাস্থ্যজনবলের আনুমানিক ৮২ শতাংশ বেসরকারি খাতে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। বেসরকারি জনবল সংক্রান্ত হিসাবের ভিত্তি ছিল ২০১৯ সালের জাতীয় পর্যায়ের জরিপ। তবে এতে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের পাশাপাশি ওষুধ বিক্রেতা, গ্রামীণ সেবাদাতা ও অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক স্বাস্থ্য কর্মীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ফলে এই সংখ্যাকে বর্তমান বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত নিবন্ধিত চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত বলা যাবে না। গবেষণাটি অবশ্য সরকারি ব্যবস্থার বাইরের স্বাস্থ্য-জনবলের ব্যাপক উপস্থিতি স্পষ্ট করে।
হাসপাতালের শয্যাসংখ্যাও বেসরকারি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে। ২০২৪ সালে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত স্বাস্থ্য বুলেটিন ২০২২-এর তথ্য নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি হাসপাতালের শয্যা ছিল ৭১ হাজার ৬৬০টি এবং বেসরকারি হাসপাতালের শয্যা ৯৯ হাজার ৯৭৫টি। অর্থাৎ উল্লিখিত দুই খাতের মোট শয্যার প্রায় ৫৮ শতাংশ ছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। শয্যার এই হিসাব রোগীর অনুপাত বা সেবার মানের পরিমাপ নয়; তবে চিকিৎসা অবকাঠামোয় বেসরকারি খাতের বড় অংশীদারত্বের নির্দেশক।
এই খাতের কর্মীদের বেতন ও কর্মপরিবেশ তাই কেবল প্রতিষ্ঠান মালিক ও কর্মীর ব্যক্তিগত চুক্তির বিষয় হতে পারে না। এর সঙ্গে জনস্বার্থ, চিকিৎসা সেবার ধারাবাহিকতা এবং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা জড়িত।
নবীন চিকিৎসকের শ্রমের মূল্য কত?
দীর্ঘ শিক্ষাজীবন ও ইন্টার্নশিপ শেষে একজন নবীন চিকিৎসক পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন। জরুরি রোগীর প্রাথমিক মূল্যায়ন, ভর্তি রোগীর পর্যবেক্ষণ, অবস্থার অবনতি শনাক্ত করা এবং জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের নির্দেশনা বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁকে পালন করতে হয়।
২০২৬ সালের ১৬ জুলাই দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বেতন কাঠামো প্রণয়নকারী কমিটির একজন সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক বেসরকারি ক্লিনিকে আট ঘণ্টার শিফটের জন্য চিকিৎসককে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা দেওয়া হয়। ঘণ্টাপ্রতি হিসাবে তা ৭৫ থেকে ১০০ টাকা। এটি সব প্রতিষ্ঠানের বেতনের জাতীয় গড় নয়; কিন্তু কম পারিশ্রমিকের একটি উদ্বেগজনক প্রকাশিত উদাহরণ।]
বাসা ভাড়া, খাবার, যাতায়াত, পরিবারের দায়িত্ব এবং পেশাগত শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ব্যয়ের সঙ্গে এ ধরনের পারিশ্রমিকের সামঞ্জস্য কোথায়? ভবিষ্যতে কেউ প্রতিষ্ঠিত হয়ে বেশি আয় করতে পারেনÑএই সম্ভাবনা দিয়ে তাঁর বর্তমান শ্রমের কম মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।
প্রত্যেক শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য পারিশ্রমিক প্রাপ্য। চিকিৎসকের বেতন নির্ধারণে তাঁর শিক্ষা, দক্ষতা, দায়িত্ব, ঝুঁকি ও কর্মঘণ্টার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। একই নীতিতে নার্স সহ প্রত্যেক শ্রেণির স্বাস্থ্য কর্মীর কাজের মূল্য নির্ধারণ করা জরুরি।
ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে সব শ্রেণির জন্য
বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের জন্য পদ ভিত্তিক বাধ্যতামূলক ন্যূনতম বেতন ও মজুরি তালিকা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ওয়ার্ড সহকারী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নিরাপত্তা কর্মী সহ সব শ্রেণির কর্মীকে এর আওতায় আনতে হবে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, দায়িত্ব ও কাজের ঝুঁকির ভিত্তিতে পৃথক গ্রেড এবং প্রতিটি গ্রেডের ন্যূনতম প্রাপ্য নির্ধারণ করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যেন নির্ধারিত সীমার নিচে কাউকে নিয়োগ দিতে বা কাজ করাতে না পারে।
মাসিক বেতনের পাশাপাশি ঘণ্টা ভিত্তিক, খণ্ডকালীন ও শিফট ভিত্তিক কাজের ন্যূনতম পারিশ্রমিকও নির্ধারণ করতে হবে। রাতের ডিউটি, অন-কল দায়িত্ব, ছুটির দিনে কাজ এবং অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার পারিশ্রমিকের পৃথক বিধান থাকতে হবে। অস্থায়ী, চুক্তি ভিত্তিক বা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দিয়ে এই বাধ্যবাধকতা এড়ানোর সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
ন্যূনতম বেতন নির্ধারণে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং জাতীয় বেতন স্কেলের সংশ্লিষ্ট গ্রেড বিবেচনা করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পরপর পর্যালোচনা ও সমন্বয় জরুরি। এই সীমা হবে কর্মীর প্রাপ্যের সর্বনিম্ন নিশ্চয়তা। বিশেষ দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার জন্য প্রতিষ্ঠান আরও বেশি পারিশ্রমিক দিতে পারবে।
জাতীয় বেতন স্কেলের সঙ্গে স্থায়ী সংযোগ
ন্যূনতম মজুরির সঙ্গে জাতীয় বেতন স্কেল ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামোর সম্পর্ক স্পষ্ট করতে হবে। কোন পদের জন্য কোন গ্রেড প্রযোজ্য, মূল বেতনের সঙ্গে কী কী ভাতা থাকবে এবং কীভাবে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি হবেÑএসব বিষয় লিখিতভাবে নির্ধারিত থাকা দরকার।
জাতীয় বেতন স্কেল সংশোধিত হলে বেসরকারি স্বাস্থ্য কর্মীদের বেতন সমন্বয়ের পদ্ধতি ও সময় সীমাও নীতিমালায় থাকতে হবে। ইতোমধ্যে যাঁরা অধিকতর বেতন বা সুবিধা পাচ্ছেন, তাঁদের অর্জিত সুবিধা কমানো যাবে না।
অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক, উৎসব ভাতা কিংবা নিয়োগ কর্তার পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অবদানকে নিয়মিত ন্যূনতম বেতনের বিকল্প হিসেবে দেখানো যাবে না। নির্দিষ্ট তারিখে ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন পরিশোধ এবং বিস্তারিত বেতন বিবরণী প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে।
উদ্যোগকে বাস্তবায়নে নিতে হবে
বেসরকারি চিকিৎসকদের বেতন নিয়ে নীতিগত উদ্যোগের কথাও প্রকাশিত হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের ২০২৬ সালের ১৬ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কমিটি নিয়মিত নবীন মেডিকেল অফিসার ও প্রভাষকদের মূল বেতন সরকারি নবম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতনের অন্তত ৯০ শতাংশ করার সুপারিশ করেছিল। নিয়োগ পত্র, ভাতা, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এবং সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কর্মসীমার প্রস্তাবও ছিল।
একটি গণমাধ্যমে ২১ জুলাই প্রকাশিত ও ৮ সেপ্টেম্বর হালনাগাদ করা প্রতিবেদনে প্রস্তাবটিকে খসড়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাই এসব প্রতিবেদনে উল্লিখিত সুপারিশকে কার্যকর বিধান হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এই উদ্যোগকে সব শ্রেণির স্বাস্থ্য কর্মীর জন্য বিস্তৃত করতে হবে। বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, অবসরকালীন সুবিধা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
চাকরির নিরাপত্তা ছাড়া বেতন সংস্কার অসম্পূর্ণ
প্রত্যেক কর্মীর লিখিত নিয়োগ পত্র থাকতে হবে। সেখানে পদ, দায়িত্ব, বেতন, ভাতা, কর্মঘণ্টা, প্রবেশন কাল, ছুটি, পদোন্নতির সুযোগ এবং চাকরি সমাপ্তির শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
নির্দিষ্ট প্রবেশন কাল শেষে স্বচ্ছ মূল্যায়নের ভিত্তিতে চাকরি স্থায়ীকরণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। স্থায়ী প্রকৃতির কাজে বছরের পর বছর অস্থায়ী নিয়োগ দিয়ে কর্মীদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
চাকরির নিরাপত্তার সঙ্গে পেশাগত জবাবদিহিতাও থাকতে হবে। অসদাচরণ বা কর্মদক্ষতার সমস্যা হলে লিখিত কারণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং আপিলের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ব্যক্তিগত অসন্তোষ, ন্যায্য দাবি উত্থাপন কিংবা অনিয়মের অভিযোগ জানানোর কারণে কাউকে চাকরিচ্যুত করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
প্রতিষ্ঠান বন্ধ, পুনর্গঠন বা পদ বিলুপ্তির ক্ষেত্রেও যথাযথ নোটিশ, ক্ষতিপূরণ এবং সব পাওনা পরিশোধের বিধান থাকতে হবে। মাতৃত্ব বা অসুস্থতার কারণে কর্মী যেন অন্যায্যভাবে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে না পড়েন।
অবসর জীবন যেন অনিশ্চয়তায় না কাটে
স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য সরকারি চাকরির অনুরূপ অবসরকালীন সুরক্ষার লক্ষ্য নিয়ে বাধ্যতামূলক পেনশন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এর অর্থায়ন, নিয়োগ কর্তা ও কর্মীর অবদান, প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় নিরূপণ করতে হবে।
পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির বিধান এবং পারস্পরিক সম্পর্ক স্পষ্ট থাকা জরুরি। কর্মীর ওপর অতিরিক্ত অবদানের চাপ দিয়ে নিয়োগ কর্তার দায় কমানো যাবে না।
অবসর তহবিল প্রতিষ্ঠানের পরিচালন হিসাব থেকে পৃথক ও সুরক্ষিত রাখতে হবে। স্বাধীন নিরীক্ষা, নিয়মিত হিসাব প্রকাশ এবং প্রত্যেক কর্মীর নিজস্ব জমা ও অর্জিত সুবিধার তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করলে সঞ্চিত অর্থ ও অর্জিত অবসর-অধিকার বহাল থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলেও কর্মীদের এই তহবিল সুরক্ষিত রাখতে হবে।
ছুটি, চিকিৎসা ও পরিবারের সুরক্ষা
সরকারি চাকরির অনুরূপ প্রযোজ্য ছুটি ও সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুস্পষ্ট বিধান প্রয়োজন। বার্ষিক ছুটি, নৈমিত্তিক ছুটি, অসুস্থতা জনিত ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি, উৎসব ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা কাঠামোর অংশ হতে হবে। পিতৃত্বকালীন ও পারিবারিক জরুরি ছুটির ব্যবস্থাও রাখা উচিত।
সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা চালু রাখতে ছুটির দিনে কাজের প্রয়োজন হলে বিকল্প ছুটি বা নির্ধারিত অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দিতে হবে। কর্মীদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত ডিউটি রোস্টার ও উপযুক্ত জনবল রাখতে হবে।
কর্মী ও তাঁর নির্ভরশীল পরিবারের জন্য চিকিৎসা সহায়তা বা স্বাস্থ্য বীমা দরকার। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, পেশাগত সংক্রমণ, স্থায়ী অক্ষমতা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ ও পরিবারের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সহিংসতা ও হয়রানি থেকে সুরক্ষা এবং রাতের ডিউটিতে নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতির সুযোগ
ন্যায্য বেতন কাঠামোর সঙ্গে পেশাগত অগ্রগতির পথও থাকতে হবে। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ পদোন্নতি, উচ্চতর প্রশিক্ষণ, শিক্ষা-ছুটি এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের পাঠদান, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও শিক্ষার্থী তত্ত্বাবধানের জন্য অনুকূল পরিবেশ দরকার। নার্স, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য কর্মীর নিয়মিত প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ জনবল ধরে রাখা এবং তাঁদের সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সেবার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়।
অনুমোদন ও নবায়নের শর্তে কর্মীর অধিকার
প্রস্তাবিত সংস্কারের কেন্দ্রীয় বিষয় হলোÑকর্মীদের ন্যায্য বেতন ও সুবিধা নিশ্চিত করাকে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বাধ্যতামূলক শর্ত করা।
এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি ও নীতিমালা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং অন্যান্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের প্রযোজ্য অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় অভিন্ন ন্যূনতম চাকরি ও মজুরি সংক্রান্ত মান যুক্ত করতে হবে।
নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের আগে ভবন, যন্ত্রপাতি ও জনবল পরিকল্পনার পাশাপাশি নিয়মিত বেতন, ভাতা এবং অবসর তহবিলের ব্যয় বহনের সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। প্রতিষ্ঠান চালু করার সামর্থ্যের সঙ্গে কর্মীদের ন্যায্য পাওনা দিয়ে তা পরিচালনার সামর্থ্যও মূল্যায়ন করতে হবে।
নবায়নের সময় নিয়োগ পত্র, বেতন পরিশোধের ব্যাংক রেকর্ড, কর্মঘণ্টা, ছুটির হিসাব এবং অবসর তহবিলে অবদান জমার প্রমাণ যাচাই করতে হবে। কর্মী প্রকৃতপক্ষে নির্ধারিত অর্থ পাচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য গোপনীয়ভাবে কর্মীদের বক্তব্য নেওয়া এবং অভিযোগ যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সংশোধনের নির্দেশ, নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে বকেয়া পরিশোধ এবং অনিয়মের মাত্রা অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিধান থাকতে হবে। গুরুতর বা পুনরাবৃত্ত লঙ্ঘনে অনুমোদন ও নবায়ন সংক্রান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায্য শুনানি, রোগীদের চলমান চিকিৎসা এবং কর্মীদের পাওনা সুরক্ষার পরিকল্পনাও অপরিহার্য।
বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা
ছোট ক্লিনিক, মাঝারি হাসপাতাল ও বড় মেডিকেল কলেজের আর্থিক সক্ষমতা এক নয়। তাই ব্যয় মূল্যায়ন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। তবে রূপান্তর কাল যেন অনির্দিষ্টকাল কম বেতন দেওয়ার অজুহাত না হয়।
বেতন বাড়ানোর নামে জনবল কমিয়ে অবশিষ্ট কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কাজ চাপানো ঠেকাতে হবে। একইভাবে সংস্কারের সম্পূর্ণ ব্যয় অযৌক্তিক ভাবে রোগীর ওপর চাপিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা, অপচয় নিয়ন্ত্রণ এবং সেবামূল্য নির্ধারণে জবাবদিহিতা প্রয়োজন।
নীতিমালা তৈরিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ, প্রতিষ্ঠান মালিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স, অন্যান্য কর্মীর প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ এবং অবসর তহবিল বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। পেশা ভিত্তিক জনবল, বেতন, কর্মঘণ্টা ও চাকরির ধরনের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করতে হবে, যাতে সিদ্ধান্ত নির্ভরযোগ্য উপাত্তের ভিত্তিতে নেওয়া যায়।
অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। কর্মী যেন চাকরি হারানোর ভয় ছাড়াই বেতন না পাওয়া, অন্যায্য কর্তন, ছুটি থেকে বঞ্চিত হওয়া বা হয়রানির অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগ করার কারণে প্রতিশোধ মূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তারও কার্যকর প্রতিকার থাকতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আবেদন
বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ দেশের চিকিৎসা সেবার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। সেই সক্ষমতাকে প্রতিদিন কার্যকর রাখছেন শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থায়িত্ব এবং কর্মীর মর্যাদাকে গুরুত্ব দিয়ে টেকসই সমাধান গড়ে তুলতে হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, বেসরকারি চিকিৎসক সহ সব ধরনের স্বাস্থ্য কর্মীর জন্য পদ ও যোগ্যতা ভিত্তিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হোক। জাতীয় বেতন স্কেল ভিত্তিক বেতন-ভাতা, সরকারি চাকরির অনুরূপ চাকরির নিরাপত্তা, পেনশন, ছুটি, চিকিৎসা সহায়তা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সমন্বিত ও বাধ্যতামূলক জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক।
বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার সহ সব ধরনের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও নবায়ন নীতিমালায় এসব শর্ত যুক্ত করা হোক। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য তা মেনে চলা বাধ্যতামূলক এবং বাস্তবায়ন নিয়মিত যাচাইযোগ্য করা হোক।
যাদের শ্রমে দেশের চিকিৎসা সেবার একটি বিশাল অংশ সচল থাকে, তাঁদের জীবিকা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ জাতীয় স্বাস্থ্য নীতির কেন্দ্রে থাকা উচিত। মানুষের জীবন রক্ষায় নিয়োজিত কর্মীদের নিজের জীবন, পরিবার ও অবসর সুরক্ষিত করা রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ও বিভাগীয় প্রধান, হৃদরোগ বিভাগ পপুলার মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, ঢাকা।
