বাংলাদেশের শিক্ষায় শেখার সংকট ও কার্যকর শিক্ষণপদ্ধতি

বাংলাদেশের শিক্ষায় শেখার সংকট ও কার্যকর শিক্ষণপদ্ধতি

ফন্ট সাইজ:

একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করেও যদি একটি অনুচ্ছেদের অর্থ বুঝতে না পারে, দৈনন্দিন হিসাব করতে না পারে কিংবা নতুন সমস্যার সমাধান খুঁজতে ভয় পায়, তবে তার শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি থেকে যায়। বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারে এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত, শিক্ষার্থী কতটা শিখছে এবং শেখা জ্ঞান কোথায় ব্যবহার করতে পারছে। বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠদান, মূল্যায়ন ও শিক্ষকের সহায়তাকে এই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
কার্যকর শিক্ষার জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট ব্যাখ্যা, অনুশীলন, প্রশ্ন করার সুযোগ এবং সময়মতো প্রতিক্রিয়া। প্রযুক্তি এই কাজ সহজ করতে পারে, কিন্তু শিক্ষক, পাঠ্যবস্তু ও শিক্ষার্থীর প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয়ই মূল বিষয়। শিক্ষার্থীকে আত্মবিশ্বাসী, যুক্তিনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে পরিবার, সমাজ এবং কর্মজগতের সংযোগও বাড়াতে হবে।

পরিসংখ্যানে শেখার ঘাটতি
বিবিএস ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বা এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৭-১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৫০ দশমিক ২ শতাংশের মৌলিক পড়ার দক্ষতা এবং ৩৯ দশমিক ২ শতাংশের মৌলিক গণনার দক্ষতা রয়েছে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট মূল্যায়নে প্রায় অর্ধেক শিশু পড়ার এবং প্রায় তিন-পঞ্চমাংশ শিশু গণনার মৌলিক মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। এই বয়সভিত্তিক সূচককে কোনো একটি শ্রেণির পরীক্ষার ফল কিংবা সব ধরনের সাক্ষরতার হার হিসেবে দেখা যাবে না।

একই জরিপে প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সীদের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয় বয়সীদের ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার বাইরে থাকার তথ্য এসেছে। প্রাথমিক স্তরে সমাপ্তির হার ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশ, কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এগুলো ভিন্ন বয়সগোষ্ঠীর সূচক; একই শিক্ষার্থীদলের ধারাবাহিক ঝরে পড়ার হার নয়। তবে শিক্ষায় থাকা ও শেখা, উভয় ক্ষেত্রেই সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজন।

ডিজিটাল সুযোগও সমান নয়। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, ৭২ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারে বাড়ি থেকে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ থাকলেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নিজস্ব যন্ত্র, পর্যাপ্ত ডেটা কিংবা পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ আছে, এমন নয়। অনলাইনভিত্তিক কাজ বাধ্যতামূলক করার আগে বিদ্যালয়কে দেখতে হবে কোন শিক্ষার্থী তাতে অংশ নিতে পারবে এবং কার জন্য বিকল্প প্রয়োজন।
জলবায়ুর ধাক্কা শিক্ষার ধারাবাহিকতায় নতুন চাপ তৈরি করছে। ইউনিসেফের জানুয়ারি ২০২৫-এর বিশ্লেষণে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর বিদ্যালয়শিক্ষা তাপপ্রবাহ, বন্যা ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ায় ব্যাহত হওয়ার কথা এসেছে। আবার সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে অন্তত ১৭ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থী জলবায়ুজনিত বিদ্যালয়শিক্ষার বিঘ্নের মুখে পড়েছে। দ্বিতীয় সংখ্যাটি বিশ্বব্যাপী, বাংলাদেশের নয়।

চার পদ্ধতির সমন্বয়ে কার্যকর পাঠ
শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিখন বা এসসিএলে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করে, আলোচনা করে এবং কাজের মাধ্যমে নিজের বোঝাপড়া প্রকাশ করে। শিক্ষক লক্ষ্য নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ নির্বাচন এবং ভুল ধারণা সংশোধনের দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী বাড়াতে হয়। মৌলিক জ্ঞান না দিয়ে তাকে একা জটিল বিষয় আবিষ্কার করতে বললে দুর্বল শিক্ষার্থী আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
শিক্ষককেন্দ্রিক শিখন বা টিসিএলের কার্যকর রূপ হলো পরিকল্পিত ব্যাখ্যা, উদাহরণ দেখানো এবং নির্দেশিত অনুশীলন। নতুন ধারণা, ভাষার নিয়ম কিংবা গণিতের ধাপ শেখাতে এটি প্রয়োজনীয়। শিক্ষক কথা বলবেন এবং শিক্ষার্থী কেবল শুনবে, এমন সীমায় এই পদ্ধতিকে আটকে রাখা ঠিক নয়। ব্যাখ্যার মাঝেও ছোট প্রশ্ন, শিক্ষার্থীর উত্তর এবং তাৎক্ষণিক সংশোধন থাকতে পারে।
সমস্যাভিত্তিক শিখন বা পিবিএলে একটি বাস্তব বা বাস্তবসম্মত সমস্যা অনুসন্ধানের সূচনা করে। শিক্ষার্থী জানতে চায় কী তথ্য দরকার, তা সংগ্রহ করে, সম্ভাব্য ব্যাখ্যা পরীক্ষা করে এবং সমাধান যুক্তিসহ তুলে ধরে। প্রকল্পভিত্তিক শিখনে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট কাজ বা পণ্য তৈরির প্রক্রিয়া গুরুত্ব পায়। দুটি পদ্ধতি সম্পর্কিত হলেও এক নয়; পাঠের উদ্দেশ্য অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।
মাইন্ড ম্যাপিং বা এমএম একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট ধারণা সাজানোর কৌশল। কারণ, ফলাফল ও উদাহরণ শাখায় দেখালে শিক্ষার্থী নিজের চিন্তার সংগঠন বুঝতে পারে। এটি ব্যাখ্যা, পাঠ ও অনুশীলনের সহায়ক। সুন্দর ছবি আঁকা কিংবা রঙ ব্যবহারের দক্ষতাকে বিষয়ের বোঝাপড়ার বিকল্প হিসেবে মূল্যায়ন করা যাবে না। কাগজ ও পেনসিল দিয়েও এই কাজ সম্ভব।
সব পাঠে চারটি কৌশল সমানভাবে ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। শিক্ষক প্রথমে ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারেন, পরে জোড়ায় অনুশীলন, সমস্যা অনুসন্ধান এবং ধারণাচিত্র দিয়ে বিষয়টি গুছিয়ে নিতে পারেন। কোন শিক্ষার্থী কোথায় আটকে আছে, তার ভিত্তিতে সহায়তা বদলাতে হবে। কার্যকর শিক্ষণপদ্ধতির নির্বাচন হবে পাঠের লক্ষ্য ও শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুসারে।

একটি শ্রেণিকক্ষের ব্যবহারযোগ্য উদাহরণ
পঞ্চম শ্রেণিতে পানি অপচয় নিয়ে একটি পাঠ ধরা যাক। শিক্ষক প্রথমে লিটার, সময় ও গড়ের ধারণা ব্যাখ্যা করবেন। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের একটি কল থেকে নির্দিষ্ট সময়ে কত পানি পড়ে তা নিরাপদভাবে মাপবে। দলগুলো পাওয়া তথ্য দিয়ে অপচয়ের আনুমানিক হিসাব করবে এবং কমানোর প্রস্তাব দেবে। শেষে পানি ব্যবহারের কারণ, সমস্যা ও সমাধান একটি ধারণাচিত্রে সাজাবে।
চল্লিশ মিনিটের একটি পাঠে প্রথম পাঁচ মিনিটে আগের শেখা যাচাই, পরের দশ মিনিটে ব্যাখ্যা ও উদাহরণ, পনেরো মিনিটে জোড়া বা দলীয় কাজ এবং পাঁচ মিনিটে আলোচনা রাখা যেতে পারে। শেষ পাঁচ মিনিটে প্রত্যেকে একটি ছোট প্রশ্নের উত্তর দেবে। এটি প্রস্তাবিত সময়বণ্টন; বিষয়, শ্রেণির আকার ও শিক্ষার্থীর সক্ষমতা অনুযায়ী বদলাতে হবে।
দলীয় কাজেও প্রত্যেকের শেখা যাচাই জরুরি। একজন হিসাব করবে, আরেকজন লিখবে এবং অন্যরা চুপ করে থাকবে, এমন হলে পদ্ধতির উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। কাজের ভূমিকা পালাক্রমে বদলানো এবং ব্যক্তিগতভাবে উত্তর ব্যাখ্যা করতে দেয়া প্রয়োজন। বড় শ্রেণিতে ছোট কাজ, স্পষ্ট নির্দেশনা ও জোড়ায় আলোচনা দিয়ে শুরু করা সহজ হতে পারে।

মৗলিক দক্ষতায় সহায়তা ও মূল্যায়নের পরিবর্তন
শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সংক্ষিপ্ত ও চাপমুক্ত মূল্যায়নে পড়া, বোঝা, লেখা ও গণনার সক্ষমতা জানা দরকার। যারা পিছিয়ে আছে, তাদের বয়সের মর্যাদা বজায় রেখে সাময়িকভাবে দক্ষতাভিত্তিক সহায়তা দেয়া যেতে পারে। নিয়মিত পাঠের পাশাপাশি ছোট দলে নির্দিষ্ট ঘাটতি পূরণ, পর্যায়ক্রমিক অগ্রগতি যাচাই এবং প্রয়োজনমতো দল পরিবর্তন করা উচিত। দুর্বল শিক্ষার্থী হিসেবে স্থায়ী চিহ্ন দেয়া অনুচিত।
বাংলাদেশেই লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার একটি আশাব্যঞ্জক অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইউনিসেফ ইনোসেন্টির ডিসেম্বর ২০২৫-এর ইএমডিসি প্রতিবেদনে পাঁচ জেলায় ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি শিশুর কাছে কর্মসূচি পৌঁছানোর এবং ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তথ্য এসেছে। এটি প্রাথমিক কর্মসূচি-ফল, জাতীয় পর্যায়ে একই ফলের নিশ্চয়তা নয়। স্থানীয় শিক্ষিকা, কমিউনিটির অংশগ্রহণ ও সক্ষমতা অনুযায়ী পাঠদানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া যেতে পারে।
পরীক্ষায় মুখস্থ উত্তরের পাশাপাশি অপরিচিত অনুচ্ছেদ বোঝা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং যুক্তিসহ সমাধান ব্যাখ্যার সুযোগ থাকতে হবে। শ্রেণিকক্ষের ছোট মূল্যায়ন মূলত পরবর্তী পাঠ ঠিক করার জন্য ব্যবহার করা উচিত। দলীয় প্রকল্পে ব্যক্তিগত অবদান, কাজের খাতা ও মৌখিক ব্যাখ্যা যাচাই করতে হবে। কেবল ব্যয়বহুল উপকরণ বা অভিভাবকের সাহায্যে বানানো প্রদর্শনীর জন্য বেশি নম্বর দিলে বৈষম্য বাড়ে।

উচ্চশিক্ষায় বাস্তব অভিজ্ঞতার সংযোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ে তত্ত্বের সঙ্গে গবেষণা, শিক্ষানবিশ কাজ, উদ্যোক্তা উদ্যোগ এবং সমাজভিত্তিক প্রকল্প যুক্ত করা প্রয়োজন। অর্থনীতি ও ফিন্যান্সের শিক্ষার্থীরা স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসার নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ, পরিবারের বাজেট পরিকল্পনা কিংবা আর্থিক প্রতারণা সম্পর্কে সচেতনতার উপকরণ তৈরি করতে পারেন। প্রকৌশল বা জনস্বাস্থ্যের শিক্ষার্থীরা নিজ ক্ষেত্রের সমস্যা নিয়ে কাজ করবেন। মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহে সম্মতি ও প্রয়োজনীয় গবেষণা-নৈতিকতার অনুমোদন থাকতে হবে।
ইন্টার্নশিপের মান নির্ভর করে কাজের উদ্দেশ্য, তত্ত্বাবধান ও মূল্যায়নের ওপর। বিশ্ববিদ্যালয় ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানের চুক্তিতে শেখার ফল, সময়কাল, নিরাপত্তা, ভাতা বা ব্যয় সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা নির্ধারণ করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মস্থলের পরামর্শকের যৌথ তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থী কাজের নথি রাখবে। ইন্টার্নশিপকে নিয়মিত কর্মীর বিনা পারিশ্রমিকের বিকল্প বানানো যাবে না।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বিনিময়েও কোর্সের সমতুল্যতা ও ক্রেডিট স্বীকৃতি আগে নির্ধারণ করতে হবে। বিদেশের স্বাধীন শিক্ষণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যায়, কিন্তু নির্দিষ্ট বিদেশি ক্রেডিটব্যবস্থাকে বাংলাদেশের স্বয়ংক্রিয় অধিকার হিসেবে ধরা যাবে না। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অনুমোদন অনুযায়ী নমনীয় ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। অনলাইন যৌথ কোর্স ও স্থানীয় অংশীদারত্ব কম খরচে সুযোগ বাড়াতে পারে।
উদ্যোক্তা শিক্ষায় বাজার যাচাই, হিসাব রাখা, নৈতিকতা এবং ব্যর্থতা থেকে শেখাকে গুরুত্ব দেয়া দরকার। কেউ ব্যবসা শুরু করলেই সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার নিয়ম যুক্তিসংগত নয়। পরিকল্পনার মান, তথ্যের ব্যবহার ও শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে। সামাজিক প্রকল্পে জাকাত ও ওয়াকফসহ অর্থায়নব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা যায়; বাস্তব অর্থ ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট বিধি ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।

প্রযুক্তি ব্যবহারে সমতা ও শিক্ষকের সক্ষমতা
বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হোক স্পষ্ট সমস্যা সমাধান দিয়ে। স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত পাঠ, অডিও, মুদ্রিত অনুশীলন ও ভাগাভাগি যন্ত্রের ব্যবস্থা থাকলে ইন্টারনেট না থাকলেও শেখা চালানো যায়। বাংলা ভাষায় মানসম্মত উপকরণ এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য পাঠযোগ্য, শ্রবণযোগ্য ও বিকল্প উপস্থাপনা প্রয়োজন। কেবল যন্ত্র কেনার প্রকল্পে রক্ষণাবেক্ষণ ও শিক্ষক সহায়তা বাদ দিলে সুফল স্থায়ী হয় না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষককে অনুশীলনের খসড়া, পাঠ পরিকল্পনা বা বিকল্প ব্যাখ্যা তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু তথ্য ও উত্তরের শুদ্ধতা শিক্ষককে যাচাই করতে হবে। শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত ব্যবস্থায় দেয়া উচিত নয়। বয়সোপযোগী ও তত্ত্বাবধানে ব্যবহার, উৎস যাচাই এবং নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করার অনুশীলন থাকলে প্রযুক্তি শেখার সহায়ক হতে পারে।
শিক্ষার্থীরা কখন এবং কীভাবে এআই ব্যবহার করেছে, তা জানাতে পারে। মূল্যায়নে খসড়া, সংশোধন, শ্রেণিকক্ষের কাজ ও সংক্ষিপ্ত মৌখিক ব্যাখ্যা রাখলে নিজের শেখা বোঝা সহজ হয়। শুধু এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যারের ফল দিয়ে অসদাচরণ নির্ধারণ করা উচিত নয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে ব্যবহারবিধি পরিষ্কার থাকলে বিভ্রান্তি কমবে।
শিক্ষককে শুধু এককালীন প্রশিক্ষণ দিয়ে পরিবর্তন আশা করা কঠিন। নিয়মিত সহকর্মী আলোচনা, নমুনা পাঠ, শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ ও গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন। প্রস্তাবিতভাবে মাসে একটি যৌথ পাঠপরিকল্পনা এবং পরের সভায় তার ফল আলোচনা করা যেতে পারে। শিক্ষকের প্রস্তুতির সময়, উপযুক্ত উপকরণ ও অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজের চাপও বিবেচনায় নিতে হবে।

টেকসই বাস্তবায়নে প্রথম কাজগুলো
প্রথম তিন মাসে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানে শেখার ভিত্তিতথ্য, অনুপস্থিতির কারণ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ যাচাই করা যায়। পরবর্তী ছয় মাসে মৌলিক দক্ষতার সহায়তা, মিশ্র শিক্ষণপদ্ধতি ও শিক্ষক পরামর্শ কর্মসূচি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা উচিত। একটি পূর্ণ শিক্ষাবর্ষ শেষে অগ্রগতি, ব্যয় ও বাস্তব সমস্যার স্বাধীন মূল্যায়ন করে কার্যকর উদ্যোগ সম্প্রসারণ করতে হবে।
বন্যা ও তাপপ্রবাহপ্রবণ এলাকায় বিদ্যালয়ের বিকল্প পাঠ পরিকল্পনা আগে প্রস্তুত রাখতে হবে। নিরাপদ সময়সূচি, মুদ্রিত উপকরণ, স্থানীয় যোগাযোগ এবং ফিরে আসার পর ঘাটতি পূরণের পাঠ জরুরি। দরিদ্র পরিবার, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং দূরবর্তী এলাকার শিশুদের অতিরিক্ত সহায়তা না দিলে একই পদ্ধতির সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে না। স্থানীয়ভাবে যাচাই করা উপবৃত্তি, পুষ্টি ও যাতায়াত সহায়তা শিক্ষায় টিকে থাকতে সাহায্য করতে পারে।
শিক্ষার অর্থায়নে সরকারি দায়িত্ব অক্ষুণ্ন রেখে স্বচ্ছ সামাজিক ওয়াকফ, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বে পাঠাগার, সহায়ক উপকরণ বা বৃত্তির ব্যবস্থা করা যায়। এসব সহায়তার আয়-ব্যয় প্রকাশ ও নিয়মিত নিরীক্ষা প্রয়োজন। ফল মাপতে পড়া ও গণনার দক্ষতা, উপস্থিতি, শিক্ষায় ফিরে আসা, শিক্ষক সহায়তা এবং শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় দেখতে হবে। তথ্য প্রকাশে ব্যক্তিগত পরিচয় সুরক্ষিত রাখতে হবে।
সফল শিক্ষা সংস্কারের সুফল দেখা যাবে শিক্ষার্থীর প্রশ্নে, ব্যাখ্যায় ও কাজে। মৌলিক দক্ষতা তাকে পরবর্তী পাঠ বুঝতে সাহায্য করবে; সমস্যাভিত্তিক কাজ যুক্তি ও সহযোগিতা শেখাবে; বাস্তব অভিজ্ঞতা দায়িত্ববোধ গড়ে তুলবে। ভবিষ্যতের নেতৃত্বও এই অভ্যাস থেকেই তৈরি হয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় সহায়তা পেয়ে জ্ঞান অর্জন করবে এবং তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে শিখবে।

লেখক: ফিন্যান্স ও বিনিয়োগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক, কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব।