বিক্ষোভের মিছিল, নিষিদ্ধ সমাবেশ, মেট্রো বন্ধ: আজ প্যারিসে কী হতে যাচ্ছে?

ফন্ট সাইজ:

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে আজ শনিবার নতুন করে বিক্ষোভ ও আন্দোলন কর্মসূচি ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রয়ক্ষমতার সংকট এবং তরুণদের বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিক ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর ঘোষিত মিছিলের পাশাপাশি ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীদের নিষিদ্ধ সমাবেশের ডাককে কেন্দ্র করে রাজধানীতে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভের কারণে একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্যারিসের গণপরিবহন কর্তৃপক্ষ।
আজকের কর্মসূচিতে প্যারিসের দুটি স্থান বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একটি প্লাস দ্য লা রিপাবলিক (Place de la République), অন্যটি প্লাস দ্য লা কঁকর্দ (Place de la Concorde)। প্রথম স্থানে শ্রমিক ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর অনুমোদিত মিছিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে কঁকর্দে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীদের সমাবেশের ঘোষণা থাকলেও সেটি নিষিদ্ধ করেছে প্যারিস পুলিশ প্রিফেকচার।
রিপাবলিক থেকে নাসিওঁ পর্যন্ত অনুমোদিত মিছিল
পুলিশের অনুমোদিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ দুপুর ২টায় স্থানীয় সময় প্লাস দ্য লা রিপাবলিক থেকে মিছিল শুরু হবে। বুলভার ভলতেয়ার (Boulevard Voltaire) হয়ে মিছিলটি প্লাস দ্য লা নাসিওঁতে (Place de la Nation) গিয়ে শেষ হওয়ার কথা।
এ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে যুব সংগঠনগুলোর সমন্বিত জোট এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের আঞ্চলিক শাখা। এতে ইউনিয়ন এত্যুদিয়ঁ (Union étudiante), ফাজ (FAGE), উনেফ (UNEF) ও ইউএসএল (USL)-এর পাশাপাশি সিজেটি (CGT), ফো (FO), এফএসইউ (FSU), সলিদেয়ার (Solidaires) ও সিএফডিটি (CFDT)-এর আঞ্চলিক সংগঠনগুলো যুক্ত রয়েছে।
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, তরুণদের অধিকার এবং ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা। আগের কর্মসূচিগুলোর ধারাবাহিকতায় এবারও এসব দাবিতে রাজপথে নামার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কঁকর্দেতে যাওয়ার ঘোষণা ইয়েলো ভেস্টদের
আজকের আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীদের প্লাস দ্য লা কঁকর্দেতে সমাবেশের পরিকল্পনা। আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে প্যারিস পুলিশ প্রিফেকচার এই জমায়েতের অনুমতি দেয়নি। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের অনুমোদিত শ্রমিক ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর মিছিলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইয়েলো ভেস্ট সমন্বয়ক বেঞ্জামিন বল পুলিশের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কঁকর্দেতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, আন্দোলনকারীরা সেখানে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানাবেন। আরেক সমন্বয়ক ডেভিড লিবেস্কিন বলেছেন, তাঁদের দাবির ধরন শ্রমিক সংগঠনগুলোর কর্মসূচি থেকে আলাদা। সরাসরি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাসহ রাজনৈতিক দাবিও রয়েছে তাঁদের।
এদিকে প্যারিসের বুর্স এলাকা, বারবেস ও অন্যান্য কয়েকটি স্থানে ইয়েলো ভেস্ট গোষ্ঠীগুলোর ঘোষিত পৃথক কর্মসূচিও নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ প্রিফেকচার। ফলে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সম্ভাব্য জমায়েতের ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
মেট্রোর একাধিক স্টেশন বন্ধ, বিঘ্নিত হবে ট্রেন চলাচল
আজকের কর্মসূচির কারণে প্যারিসের গণপরিবহনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। পুলিশ প্রিফেকচারের অনুরোধে নিরাপত্তার স্বার্থে আরএটিপি (RATP) কর্তৃপক্ষ একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
আরএটিপির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সকাল ৫টা ৩০ মিনিট থেকে শার্ল দ্য গল-এতোয়াল (Charles de Gaulle-Étoile), আর্জঁতিন (Argentine), জর্জ ফিফ (George V), তুইলেরি (Tuileries), ফ্রাঁকলাঁ রুজভেল্ট (Franklin D. Roosevelt), শঁজেলিজে-ক্লেমঁসো (Champs-Élysées-Clemenceau), কঁকর্দ (Concorde) ও মিরোমেনিল (Miromesnil) স্টেশন বন্ধ রাখা হবে।
এ ছাড়া সকাল ১০টা থেকে ওবেরকাম্প (Oberkampf), রিশার-লেনোয়ার (Richard-Lenoir), সাঁ-আমব্রোয়াজ (Saint-Ambroise), ভলতেয়ার (Voltaire), শারোন (Charonne), রু দে বুলে (Rue des Boulets), শাতলে (Châtelet) ও লে আল (Les Halles) স্টেশন বন্ধ থাকবে।
মেট্রো লাইন ৬-এ ক্লেবের (Kléber) থেকে শার্ল দ্য গল-এতোয়াল পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া শাতলে ও ওতেল দ্য ভিলের (Hôtel de Ville) মধ্যবর্তী অংশেও ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত হবে। বন্ধ স্টেশনগুলোতে ট্রেন থামবে না এবং সেখান থেকে অন্য লাইনে যাওয়ার সংযোগও পাওয়া যাবে না। পুলিশ প্রিফেকচারের অনুমতি সাপেক্ষে স্টেশনগুলো পুনরায় চালু করা হবে।
দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি মোতায়েন
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শুধু প্যারিস নয়, পুরো ফ্রান্সেই নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ শুক্রবার জানিয়েছেন, শনিবারের কর্মসূচি ঘিরে দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
মন্ত্রী বলেন, আগের শনিবারগুলোর মতোই নিরাপত্তাব্যবস্থা বহাল রাখা হচ্ছে। তবে এবার বিভিন্ন সংগঠনের আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত মিছিলের সংখ্যা তুলনামূলক কম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতা, সরকারি স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং লুটপাটের আহ্বানের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে।
নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে জেন্ডারমেরির ২৫টি সাঁজোয়া যান, ১৫টি জলকামান, ড্রোন ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। গুরুত্বপূর্ণ শহরকেন্দ্র, রেলস্টেশন এবং সড়কপথে তল্লাশি ও নজরদারি জোরদার করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকার নিশ্চিত করা হবে। তবে সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের সংখ্যা পুরো ফ্রান্সের জন্য, শুধু প্যারিসের জন্য নয়।
৫ নভেম্বরের বিক্ষোভে সরকারি হিসাবে ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষের অংশগ্রহণ
এর আগে গত ৫ নভেম্বর ফ্রান্সজুড়ে শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের ডাকে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, সেদিন দেশজুড়ে ১৯৩টি কর্মসূচিতে ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ অংশ নেন। এর মধ্যে শুধু প্যারিসেই অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ৬৫ হাজার।
অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠন সিজেটি (CGT) তাদের হিসাবে দেশজুড়ে ১৫ লাখ ৭৩ হাজার মানুষের অংশগ্রহণের দাবি করেছে। প্যারিসে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৩ লাখ ৫০ হাজার বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। সরকারি হিসাব ও সংগঠকদের দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়নে, ৫ নভেম্বরের অধিকাংশ মিছিল নির্ধারিত পথে অনুষ্ঠিত হলেও কয়েকটি শহরে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্যদের লক্ষ্য করে পাথর ও আতশবাজি নিক্ষেপের ঘটনাও উল্লেখ করেছে মন্ত্রণালয়।
আন্দোলনের পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে নজর
ফ্রান্সে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলমান আন্দোলনের পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, বেতন, পেনশন, শিক্ষা খাত, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ। শ্রমিক সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীদের অংশগ্রহণে এই প্রতিবাদ নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আজকের কর্মসূচিতে প্রকৃত অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কত হয় এবং নিষিদ্ধ সমাবেশ ঘিরে কোনো সংঘর্ষ বা গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে কি না, সেদিকে নজর রয়েছে প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমের। দিনের শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশিত হলে আন্দোলনের প্রকৃত পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।