কক্সবাজারের টেকনাফে মানব পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলিতে নিহত সৈনিক মো. তিতাস শেখের মর্মান্তিক মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে তার পুরো পরিবার। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন মা রেখা বেগম। স্বামীকে হারিয়ে গগনবিদারি আহজারি করছেন স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। আর আদরের সন্তানকে হারিয়ে বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য আফজাল শেখের মুখ দিয়েও কোনো কথা বের হচ্ছে না। শুধু পরিবারের সদস্য নয়, তিতাসের মৃত্যুতে কাঁদছে তার সহকর্মীসহ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাসিন্দারাও।
স্বজনরা বলছেন, দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিতাস সবার বড়। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। চার বছর আগে পার্শ্ববর্তী গ্রামের সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে তার বিয়ে হলেও তাদের কোনো সন্তান ছিল না। আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তিতাসের। কিন্তু সন্ত্রাসীদের বুলেট চিরতরে থামিয়ে দিলো এই সেনা সদস্যের পথচলা। নিহত তিতাসের মতো তার বাবা আফজাল শেখও অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। ছোট ভাই আকরাম হোসেনও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত ।
গতকাল তার বাড়িতে গেলে দেখা যায়, স্বামীকে হারিয়ে বিলাপ করতে করতে স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার বলেছেন- আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকবো। আমার কোনো অস্তিত্ব রইলো না। আল্লাহ্, আমি এখন কী করবো? আমার তো আর কেউ রইলো না। আর সন্তান হারানোর শোকে আহাজারি করছেন মা রেখা বেগম। অশ্রুসিক্ত হয়ে তিনি বলেন, বুধবার রাতেও আমার ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিতাস তখন আমাকে বলেছিল, মা আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিকালে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাবো, দোয়া কইরো মা। এরপরই আমরা ছেলের মৃত্যুর খবর এলো। আমার তো সব শেষ হয়ে গেল। আমার তিতাসকে আমি এখন কোথায় পাবো। কে আমাকে ফোন দিয়ে প্রতিদিন খবর নিবে? এভাবেই বিলাপ করতে করতে বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিতাসের মা। ২৮ বছর বয়সী ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা আফজাল শেখ। শোকে কথা পর্যন্ত বের হচ্ছে না তার মুখ দিয়ে।
নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখের মামা ও লস্কারদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার বলেন, আমার ভাগিনা তিতাস অত্যন্ত ভদ্র ও নম্র স্বভাবের ছিল। মাত্র কয়েক বছর আগে সে বিয়ে করেছে। নতুন সংসার শুরুর আগেই এভাবে তার চলে যাওয়া আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। তিনি বলেন, তিতাসের লাশ বাড়িতে আনার পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার সন্ধ্যার আগে নিহত সেনাসদস্য তিতাসের লাশ তার গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। সেখানে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেয়া হয়। এরপর জানাজা শেষে পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
এদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকার গহিন পাহাড়ে প্রায় ১২০ জন রোহিঙ্গা ও বাঙালিকে জিম্মি করে রেখেছিল ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি সশস্ত্র মানব পাচারকারী দল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের উদ্ধারে বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় যৌথবাহিনী। ওই সময়ে যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে সশস্ত্র মানব পাচারকারীরা গুলি ছোড়া শুরু করে। তখন দু’পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। একপর্যায়ে তিতাসের বাঁ কাঁধে গুলি লাগে। এতে আহত হন তিনি। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য রামুর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আইএসপিআর জানায়, অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় বন্দুক ও চারটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া মানব পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। জিম্মি থাকা ৫৭ জনকেও উদ্ধার করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি মো. কাওসার সিকদার বলেন, যৌথভাবে পাহাড়ে অভিযান পরিচালনার সময় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে সেনাসদস্য তিতাস শেখ গুলিবিদ্ধ হন। পরে রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার লাশ রামু সিএমএইচ-এ রাখা হয়। সেখান থেকেই তার ছোট ভাই আকরাম হোসেনের মাধ্যমে তার লাশ হস্থান্তর করা হয়েছে।
