ঐতিহাসিক ৭ই নভেম্বর আজ। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। বাংলাদেশের রাজনীতির বাঁক পরিবর্তনের দিন। অস্থির এক রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঘটেছিল সিপাহী-জনতার বিপ্লব। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। শেষ হয় অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের পালা। সব অনিশ্চয়তা দূর করে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। রাজনৈতিক পালাবদলের পর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করে। চলে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান। ৩রা নভেম্বর ক্ষমতা দখল করেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। আটক করা হয় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে। এক পর্যায়ে গৃহবন্দি করা হয় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। ৭ই নভেম্বর সিপাহী-জনতা মুক্ত করেন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে। এই ঘটনার পরই মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বীর উত্তম খেতাব পাওয়া সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্স প্রধান জিয়াউর রহমানকে দেশের দায়িত্বভার নিতে হয়। ক্ষমতার মোহ নয়, জনপ্রিয়তা আর গ্রহণযোগ্যতাই দৃশ্যপটে নিয়ে আসে জিয়াউর রহমানকে। অল্প সময়ের মধ্যেই সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন তিনি। তার হাত ধরেই গণতন্ত্রের নবযাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশে।
দিনটিকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালন করে আসছে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে এ দিনের সরকারি ছুটি বাতিল করে। দুই দশক পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে দিবসটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাতদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলও দিবসটি পালন করছে। দিবসটি উপলক্ষে আজ সকালে শেরেবাংলা নগরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিএনপি’র চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলের জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা শহীদ জিয়ার সমাধিতে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করবেন। এদিকে দিবসটি উপলক্ষে গতকাল রাজধানীতে আলোচনা সভার আয়োজন করে জামায়াত। এতে দলটির আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ সিনিয়র নেতারা বক্তব্য রাখেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে পাল্টে দিতে ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। কয়েকদিনের জন্য বাংলাদেশ সরকার শূন্য অবস্থায় পড়ে যায়। জনগণ নিমজ্জিত হয় চরম হতাশা ও আতঙ্কে। তাদের পরম আস্থার উৎস সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান অভ্যুত্থানকারীদের হাতে গৃহবন্দি হয়ে পড়েন। ৬ই নভেম্বর মধ্যরাতের পর বিপ্লবী সৈনিকদের কামানের গোলার গর্জন কুচক্রীদের সব চক্রান্ত ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সকালের উদ্ভাসিত সূর্যালোকে ঢাকায় রাজপথে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য-ট্রাকে ট্রাকে সৈনিকরা আকাশের দিকে গুলিবর্ষণ করে তাদের বিজয়ের কথা জানান দিতে থাকেন। সৈনিক ও জনগণ অভূতপূর্ব আনন্দ মিছিলে যোগ দেয়। সেনা ট্যাঙ্কে ফুলের মালা পরিয়ে জনগণ সিপাহী বিপ্লবকে অভিনন্দন জানাতে থাকেন। রেডিওতে আবার জিয়ার কণ্ঠস্বর ‘আমি জিয়া বলছি’ শুনতে পায় দেশবাসী। ৭ই নভেম্বরের চেতনা সব ধরনের জাতিঘাতী এবং রাষ্ট্রঘাতী অপকৌশলের বিরুদ্ধে এক শানিত হাতিয়ার।
গত ৫০ বছরের অধিকাংশ সময় দিবসটি সরকারিভাবে পালিত হয়েছে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত দিবসটি ছিল সরকারি ছুটির দিন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তা বাতিল করা হয়। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আবারো এই দিনে সরকারি ছুটি বহাল করা হয়। ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি দেশ জুড়ে জরুরি আইন জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৬ সালের সরকারি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ওই বছর দিনটিতে সরকারি ছুটি বহাল ছিল। পরের বছর ২০০৮ সালে তা ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল থেকে দিনটিকে সরকারি ছুটি বাতিল করে। দুই দশক পর বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ফের দিবসটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।
বিএনপি’র কর্মসূচি: ৭ই নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উদ্যাপনে ৭ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। গতকাল রাজধানীর নয়াপল্টন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, দিবসটি উপলক্ষে শনিবার রাজধানীতে কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রা বের করা হবে। নয়াপল্টন থেকে শুরু হয়ে বাংলামোটর ও ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে গিয়ে শেষ হবে এই শোভাযাত্রা। এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই দিন সারা দেশের জেলা ও মহানগর পর্যায়ে বিএনপি’র উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র্যালি হবে।
শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে কোনো সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, বিশৃঙ্খলা বা যেকোনো ধরনের অরাজকতা মোকাবিলায় সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরোপুরি সক্ষম ও প্রস্তুত রয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ জনগণও যেকোনো বিশৃঙ্খলা প্রতিহত করতে সচেষ্ট থাকবে।
মানবিক ও নিরাপদ দেশ গড়ার আহ্বান প্রেসিডেন্টের: দিবসটি উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ৭ই নভেম্বরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দলমত নির্বিশেষে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্নীতি, বৈষম্য ও সকল ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটাতে হবে। প্রেসিডেন্ট বলেন, ঐতিহাসিক ৭ই নভেম্বর আমাদের জাতীয় জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন, দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। তাঁবেদারি অপশাসন, দুর্নীতি, নৈরাজ্য ও আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্রের সেই কঠিন সময়ে ঐক্যবদ্ধ সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্যদিয়ে দেশ তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ফিরে পায়। সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়। স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন। জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে তার ওপর রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতীয় সংকট উত্তরণের গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়। জাতির এই ক্রান্তিকালে তার ভূমিকা ছিল ত্রাতার। সিপাহি-জনতার এই সংহতি ছিল স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত এক অভূতপূর্ব জাগরণ-উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট বলেন, আমাদের সশস্ত্রবাহিনী দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার রক্ষায় সর্বদা সংহতি ও ঐক্য প্রকাশ করেছে। সেই একই চেতনা পুনর্জাগরিত হয় ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে। এসময় ছাত্র-ছাত্রী, নারী-পুরুষ, সশস্ত্রবাহিনীর সদস্য নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের সুদৃঢ় ঐক্যে দীর্ঘ ষোলো বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার বিপর্যয় থেকে আবারো রক্ষা পায় প্রিয় স্বদেশ।
সিপাহি-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের পথ নির্ধারণ করেছিল: প্রধানমন্ত্রী: দিবসটি উপলক্ষে দেয়া অপর এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ৭ই নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের পথ নির্ধারণ করেছিল। যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল এবং দেশের শৌর্য, বীর্য, সাহস ও সম্মানের প্রতীক সেনাবাহিনীর গৌরব ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল, ৭ই নভেম্বর দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটেছিল।’ বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৭ই নভেম্বর সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। দেশের ইতিহাসে ঐতিহাসিক দিনটি ছিল বাংলাদেশের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার দিন।’
তারেক রহমান বলেন, ইতিহাস সাক্ষী, দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের পথ ধরে ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর পরাজিত সেই অপশক্তি মহাজোটের নামে একজোট হয়ে দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। বিডিআর পিলখানায় পরিকল্পিত সেনা হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে সেনাবাহিনীর গৌরব ও মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করেছিল। জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছিল। হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ এবং বীর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর অবশেষে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।
