জাসদ ও বিএনপি’র মতাদর্শিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ

৭ই নভেম্বর, ১৯৭৫

জাসদ ও বিএনপি’র মতাদর্শিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর যুগান্তকারী, অত্যন্ত জটিল এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব সৃষ্টিকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। দিনটিকে ঘিরে বাংলাদেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক ধারা বাংলাদেশ জাতীয়তা-বাদী দল (বিএনপি) এবং জাতীয় সমাজ-তান্ত্রিক দল (জাসদ) সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাজনৈতিক আখ্যান ও মতাদর্শিক ব্যাখ্যা ধারণ করে। বিএনপি দিনটিকে “জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস” হিসেবে উদ্‌যাপন করে, যার মাধ্যমে তাদের মতে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার হয়েছিল এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত হয়েছিল। অন্যদিকে, জাসদ দিনটিকে ‘সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান’ হিসেবে পালন করে এবং একে একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অসম্পূর্ণ ও ব্যর্থ প্রচেষ্টা হিসেবে মূল্যায়ন করে, যা পরবর্তীতে একটি প্রতিবিপ্লবে রূপ নিয়েছিল।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে তীব্র উপদলীয় কোন্দল বিরাজমান ছিল। এই কোন্দল মূলত ‘মুক্তিযোদ্ধা বনাম প্রত্যাগত’ এবং ‘রক্ষণশীল বনাম সমাজতান্ত্রিক’ অফিসারদের মধ্যে বিভক্ত ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অফিসাররা দ্রুত পদোন্নতি পেলেও পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত অফিসাররা নিজেদের কোণঠাসা মনে করতেন, যা সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাকে দুর্বল করে দেয়।

তদুপরি, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন এবং ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা কায়েম করার ফলে সামরিক ও বেসামরিক উভয় স্তরেই ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করে। এই প্রেক্ষাপটেই ১৫ই আগস্ট সামরিক বাহিনীর কতিপয় মধ্যম সারির কর্মকর্তার হাতে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

খন্দকার মোশতাকের ৮১ দিনের শাসনকালের পর, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একটি রক্তপাতহীন পাল্টা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। কিন্তু ৩রা নভেম্বরের অভ্যুত্থানটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। একদিকে খন্দকার মোশতাকের অনুসারীরা ক্ষমতা ছাড়ার পূর্বেই ৩রা নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে, অন্যদিকে সেনানিবাসের অভ্যন্তরে জাসদের গোপন সশস্ত্র শাখা ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে তীব্র প্রচার শুরু করে। খালেদ মোশাররফকে ‘ভারতের দালাল’ এবং তার অভ্যুত্থানকে ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করা হয়, যা ৭ই নভেম্বরের বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি করে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এবং এর সামরিক শাখা ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মূল কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং জাসদ নেতা কর্নেল (অব.) আবু তাহের এই সশস্ত্র অভ্যুত্থানের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক নেতৃত্ব প্রদান করেন। জাসদের তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খান এবং সামরিক কৌশলবিদ কর্নেল তাহের বিশ্বাস করতেন যে, একটি প্রচলিত ঔপনিবেশিক কাঠামোর সামরিক বাহিনী দিয়ে মেহনতি মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়। তাদের লক্ষ্য ছিল একটি ‘শ্রেণিহীন গণবাহিনী’ (PeopleÕs Army) গঠন করা, যেখানে অফিসার এবং সিপাহীর মধ্যে কোনো বিভেদ থাকবে না।

জাসদের এই বৈপ্লবিক রূপরেখার প্রতিফলন ঘটেছিল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার উত্থাপিত ১২ দফা দাবির মাধ্যমে। এই দাবিগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল- সামরিক বাহিনীর কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে মার্ক্সীয় ধাঁচে ঢেলে সাজানো। ১২ দফা দাবির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল: সামরিক বাহিনীতে অফিসার এবং সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে বৈষম্য দূর করা, ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা ‘ব্যাটম্যান’ প্রথার বিলোপ সাধন, সকল রাজবন্দিদের অবিলম্বে মুক্তি প্রদান, একটি সর্বদলীয় গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন, এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতে মেহনতি ও শোষিত শ্রেণির স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান। লরেন্স লিফশুলৎজ এর গবেষণায় উঠে এসেছে যে, কর্নেল তাহের এই দাবিগুলোকে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে তাদের একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। জাসদ জানত যে, জিয়াউর রহমান সাধারণ সৈনিকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন সৎ এবং মুক্তিযোদ্ধা অফিসার, তাই তারা নিজেদের বিপ্লব সফল করার জন্য কৌশলগতভাবে জিয়াউর রহমানের এই ক্যারিশমাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

৬ই নভেম্বর মধ্যরাতে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একটি ব্যাপক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। সুবেদার মেহবুবের একটি গুলির মাধ্যমে অভ্যুত্থানের সূচনা হয় এবং সাধারণ সৈনিকরা অস্ত্রাগার লুট করে ট্রাক ও জিপে করে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিশৃঙ্খল দিকটি ছিল অফিসারদের প্রতি সাধারণ সিপাহীদের তীব্র আক্রোশ। ‘সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই’ স্লোগান দিয়ে বিদ্রোহীরা সেনানিবাসে চরম নৈরাজ্য তৈরি করে এবং সামরিক বাহিনীর চেইন অব কমান্ড সম্পূর্ণরূপে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। এই রাতেই খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নাজমুল হুদা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এটিএম হায়দারকে ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দপ্তরে হত্যা করা হয়।

বিদ্রোহী সৈনিকরা গৃহবন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টের সদর দপ্তরে নিয়ে আসে। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, সেখানে কর্নেল তাহের উপস্থিত হলে জিয়াউর রহমান তাকে আলিঙ্গন করে জীবন বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ জানান এবং আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন যে তিনি দেশের ও জাতির জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু এই আবেগপূর্ণ মুহূর্তের পরপরই মতাদর্শিক ও প্রায়োগিক সংঘাতের সূচনা হয়। কর্নেল তাহের জিয়াউর রহমানকে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ১২ দফা দাবিনামায় স্বাক্ষর করতে চাপ প্রয়োগ করেন এবং রেডিও স্টেশনে গিয়ে বিপ্লবের স্বপক্ষে ভাষণ দেওয়ার আহ্বান জানান।

জিয়াউর রহমান অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক কাঠামোবিহীন শ্রেণিহীন বাহিনী রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলবে। তিনি বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার উগ্র দাবিগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানান এবং রেডিওতে দেওয়া ভাষণে দেশব্যাপী শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন। জিয়াউর রহমান তার ভাষণে ‘বিস্‌মিল্লাহির রাহ্‌মানির রাহিম’ দিয়ে শুরু করেন এবং ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’- বলে শেষ করেন, যা জাসদের ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি জাতীয়তাবাদী বার্তার ইঙ্গিত বহন করছিল।

জিয়াউর রহমান মুক্ত হওয়ার পর সামরিক বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার দাবিগুলো মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালে, সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে এবং অফিসারদের উপর আক্রমণ অব্যাহত থাকে। ফলশ্রুতিতে, তাহের এবং জিয়াউর রহমানের মধ্যে দ্রুতই সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে। জাসদ এবং তাহের পুনরায় জিয়াউর রহমানকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র শুরু করলে, জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষার্থে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

১৯৭৫ সালের ২৪শে নভেম্বর কর্নেল তাহেরকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরবর্তীতে জাসদের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদেরও অন্তরীণ করা হয়। প্রখ্যাত গবেষক লরেন্স লিফশুলৎজ ৭ই নভেম্বরের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে ‘অসমাপ্ত বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জাসদের মতে, ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থান ছিল শোষিত সৈনিকদের স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ এবং একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের ঐতিহাসিক সুযোগ, যা জিয়াউর রহমানের ডানপন্থি বিচ্যুতির কারণে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কাছে ৭ই নভেম্বর হলো এমন একটি ঐতিহাসিক দিন, যেদিন জিয়াউর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব বাংলাদেশকে একটি সম্ভাব্য অরাজকতা এবং চরমপন্থি বাম হঠকারিতার হাত থেকে রক্ষা করেছিল। বিএনপি’র দৃষ্টিতে এই দিনটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে মহিমান্বিত, কারণ এই দিনেই সিপাহী ও সাধারণ জনতার মধ্যে দেশপ্রেমের এক অভূতপূর্ব সংহতি তৈরি হয়েছিল।

বিএনপি’র আখ্যান অনুযায়ী, ১৫ই আগস্ট এবং ৩রা নভেম্বরের অভ্যুত্থানের ফলে সামরিক বাহিনী এবং রাষ্ট্রের কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার দ্বারা অফিসার হত্যা এবং চেইন অব কমান্ডের লঙ্ঘন সামরিক বাহিনীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। জিয়াউর রহমান তার পেশাদারিত্ব এবং দেশপ্রেম দিয়ে এই চরম বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং উগ্র বামপন্থিদের সশস্ত্র তৎপরতা কঠোরভাবে দমন করেন। বিএনপি’র মতে, জিয়াউর রহমান যদি সেদিন কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ না করতেন, তবে বাংলাদেশ কম্বোডিয়া বা ভিয়েতনামের মতো একটি ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধ বা সামরিক নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হতো।
ক্ষমতা সুসংহত করার পর জিয়াউর রহমান এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যা আধুনিক বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রচনা করে। তিনি বাকশাল দ্বারা প্রবর্তিত একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাতিল করে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন। পাশাপাশি, তিনি এমাজউদ্দীন আহমদের পরিভাষায় একটি ‘সিভিল-মিলিটারি ব্যুরোক্রেটিক স্টেট’ গড়ে তোলেন, যেখানে সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সমন্বয়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালিত হয়।

জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল এই নতুন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপরেখা। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন, কৃষি বিপ্লব, গ্রামীণ উন্নয়ন, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, এবং শিল্পায়নে বেসরকারি খাতের বিকাশ। তিনি অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটিয়ে মুক্তবাজার অর্থনীতি প্রবর্তন করেন। তার সময়েই তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (EPZ) গোড়াপত্তন ঘটে, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।

উপরন্তু, ৭ই নভেম্বরের রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বড় উৎপাদন হলো ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে, কেবল ভাষা বা সংস্কৃতির ভিত্তিতে নয়, বরং একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ডের ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয় গঠন করা উচিত, যেখানে সকল ধর্ম, বর্ণ এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার নিশ্চিত হবে। ১৯৭৯ সালে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে তিনি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ এর পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রবর্তন করেন এবং সংবিধানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌র উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ প্রতিস্থাপন করেন। এর মাধ্যমে তিনি ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন, যা বামপন্থি ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের কাছে তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়, কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি একটি বৃহত্তর রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী জনসমর্থন আদায় করতে সক্ষম হন।

সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করা সত্ত্বেও, ঐতিহাসিক ৭ই নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ এবং এর রাজনৈতিক প্রয়োগরে ক্ষেত্রে বিএনপি ও জাসদের মধ্যে বেশ কিছু কৌশলগত ও পরিস্থিতিগত মিল পরিলক্ষিত হয়। এই মিলগুলো মূলত তৎকালীন বাস্তবতার নিরিখে অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের যুগপৎ অবস্থানের কারণে তৈরি হয়েছিল।
প্রথমত, উভয় দলই ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের ৩রা নভেম্বরের অভ্যুত্থানকে দৃঢ?ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। জাসদ এটিকে বুর্জোয়া অফিসারদের ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের অংশ হিসেবে দেখেছিল। অন্যদিকে, জিয়াউর রহমান এবং তার অনুসারীরা এটিকে সামরিক শৃঙ্খলার পরিপিন্থ এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। উভয় শক্তিই এই অভ্যুত্থানের পতন চেয়েছিল এবং এই অভিন্ন স্বার্থ তাদের ৭ই নভেম্বরের রাতে সাময়িকভাবে একই সমতলে নিয়ে এসেছিল।

দ্বিতীয়ত, জাসদ এবং বিএনপি (জিয়ার অনুসারীরা) উভয়েই শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) এবং জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ঘোর বিরোধী ছিল। উভয় দলই মনে করত যে বাকশাল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে এবং রক্ষীবাহিনী বিরোধী দল দমনে ব্যবহৃত হয়েছে।

তৃতীয়ত, উভয় দলই তৎকালীন ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচক ছিল। যদিও বিএনপি তখন জন্মলাভ করেনি আমি এখানে জিয়া সমর্থক যারা পরে বিএনপির সাথে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতীয় হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে জাসদ এবং জিয়াউর রহমানের অনুসারীদের মধ্যে একধরনের ঐক্যমত ছিল, যা ৭ই নভেম্বরের সিপাহীদের ভারতবিরোধী স্লোগানের মাধ্যমেও প্রতিফলিত হয়েছিল।

চতুর্থত, জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কৌশলগত ব্যবহার ছিল উভয় অংশের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। কর্নেল তাহের এবং জাসদ জানত যে, জিয়াউর রহমান সাধারণ সৈনিকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন সৎ এবং মুক্তিযোদ্ধা অফিসার। জাসদ নিজেদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বিপ্লব সফল করার জন্য জিয়াউর রহমানের এই ক্যারিশমাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। পরবর্তীতে, বিএনপিও জিয়াউর রহমানের এই সামরিক ও জনতুষ্ট জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করেই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।

পরিশেষে, উভয় দলই বিশ্বাস করে যে, ৭ই নভেম্বরের পরিবর্তনটি কেবল উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের ষড়যন্ত্র ছিল না; এতে সাধারণ সিপাহী এবং জনতার ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। জাসদ একে ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ বলে এবং বিএনপি একে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে।