ধারদেনা করে গিয়েছিলেন সৌদি, নিঃস্ব হয়ে ফিরেছেন শতাধিক প্রবাসী শ্রমিক

ফন্ট সাইজ:

ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সৌদি আরব গিয়েছিলেন চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের দিদারুল। ভিসার টাকা জোগাতে বিক্রি করেছিলেন জীবনের শেষ সম্বল, বসতভিটা। করেছিলেন লাখ লাখ টাকা ধারদেনাও। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। সেখানেও হয়েছেন প্রতারণার শিকার। সর্বশেষ পুলিশের কাছে আটক হয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয় তাকে। দেশে ফেরেন খালি হাতে। মাথায় লাখ লাখ টাকার ঋণের বোঝা। বৃহস্পতিবার তার সঙ্গে শতাধিক সৌদি প্রবাসী নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে অনেকের বাড়িতে যাওয়ার টাকাও ছিল না। অনেকের পরিবারের লোকজন জানেও না, দেশে ফিরছেন। নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নিয়েও দেশে ফিরতে পারেননি অনেকে। দিদারুল আলম মানবজমিনকে বলেন, আমি ২০২৩ সালে সৌদি আরবে যাই।

যাওয়ার পরে শুনি কফিল তিন মাসের আকামা দিয়েছে। অথচ আমার কাছে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়েছে। এরপর এক বছর বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করি। গাড়ি চালাই। এভাবে ২৬ হাজার রিয়াল আয় করি। কিন্তু তারা এক টাকাও দেয়নি। সেখানে বলেছে, আকামা লাগাবে, ড্রাইভিং লাইসেন্স করে দেবে। এটা বলে একটা টাকাও দেয় নাই। এরপর আরেক জায়গায় চলে যাই। সেখানে আরেকজন বলে, আকামা লাগাবে। এজন্য দেশ থেকে টাকা নেই। টাকা নেয়ার পরও আকামা দেয়নি। এরপর সেখানে গিয়ে আটকে যাই। শেষে সেখানে আরেকজনের সঙ্গে একটি গাড়ি কিনি। কিন্তু এখানেও আমার সব টাকা পানিতে গেছে। কারণ আমি আকামা লাগাতে পারছি না, লাইসেন্সও করতে পারছি না। এ কারণে ঠিকমতো গাড়িও চালাতে পারছিলাম না। কোনোভাবে তিন মাস চালাই। এরপর গাড়িটা বিক্রি করে দেই। কিন্তু সেই টাকাও আজ পর্যন্ত পাইনি। তিনি বলেন, এই তিন বছরে মাত্র ৫০ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠাতে পেরেছি। যার নামে গাড়ি কিনেছিলাম, তার বাড়ি নোয়াখালী। তিনি বলেছেন, টাকা দিয়ে দেবেন। এখন আল্লাহ্‌ জানেন, দেবে কিনা। টাকা দিলে ধারদেনা কিছু শোধ করতে পারবো।

দিদারুল বলেন, গত মাসের ১৯ তারিখে জেলে ঢুকি। সর্বশেষ ১লা অক্টোবর বিমানবন্দরে নিয়ে আসে। সেখানে দুইদিন রাখে। এ সময় খাবারও দেয়নি। দুইদিন পর রুটি, জুস আর পানি দেয়। এরপর ওমানে পাঠায়। সেখানে দু’দিন রাখার পর দেশে পাঠায়। বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে ৬০ রিয়াল দিয়ে নিজের ব্যাগ কিনেছি। আমরা তিনজন মোবাইল জমা দেই। সেখানেও ৪৫ রিয়াল নেয়। আমার সঙ্গে আসা বাকি দু’জনের কাছে এক টাকাও ছিল না। বাড়ি যাবে সেই টাকাও ছিল না। তারা কীভাবে গেছে তাও জানি না। তিনি বলেন, চারজন ছেলে আমার। তাদের কথা ভেবে সৌদিতে যাই। কিন্তু সেখানে গিয়ে সব খোয়ালাম। এখন আমি নিঃস্ব। বাড়ি-গাড়ি সব বিক্রি করেছি। শেষ সম্বল বলতে আপাতত খালি থাকার ঘরটা আছে। ঘরের জায়গাটাও নেই। অথচ ব্যাংকে লোন আছে ৫ লাখ টাকা।

একইভাবে দেশে ফেরেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলামিন। তিনি মানবজমিনকে বলেন, তিন বছর আগে সৌদিতে যাই। এক জায়গায় কাজ করতাম। সেখানে আমাদের ব্যাগ ছিল। ব্যাগে আমার পাসপোর্ট ছিল। আগুন লেগে সবকিছু পুড়ে যায়। এরপর অ্যাম্বাসির কাছে যাই। কিন্তু তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পরবর্তীতে আমি ওমরাহ করতে মক্কায় যাই। সেখান থেকে মদিনায় যাওয়ার পথে পুলিশ আমাকে ধরে। পাসপোর্ট না থাকায় আড়াই মাস জেল খেটেছি। এই সময়ে আমাদের অ্যাম্বাসি থেকে খোঁজ নিতেও আসেনি। অথচ পাকিস্তান, ইন্ডিয়ান অ্যাম্বাসি প্রতি ১৫ দিনে একবার গিয়ে খোঁজখবর নেয়। তিনি বলেন, সৌদিতে অনেক পরিশ্রম করেছি। কিন্তু ফিরলাম খালি হাতে। সাপ্লায়ার ঠিকমতো টাকা দেয়নি। পাসপোর্ট না থাকায় আকামা করতে পারিনি। পরে বাড়ি থেকে ধারদেনা করে ৪৫ লাখ টাকা নিয়ে যাই। কিন্তু কপিলে পাসপোর্ট-আকামা কিছুই করে দেয়নি। আমাকে একবারে লুটে খেয়েছে। এখন আমি বাড়ি যাবো যে সেই ভাড়ার টাকা পর্যন্ত নাই।

এদিকে, মানুষের উপকার করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন নরসিংদীর বেলাব উপজেলার দুলাল মিয়া। আফসোস করতে করতে তিনি মানবজমিনকে বলেন, দেশি একজন খুব বিপদের মধ্যে পড়ে। তার থাকার মতো জায়গাও ছিল না। পরে তাকে আমার রুমে থাকতে দেই। সেই ছেলে রুমের মধ্যে নেশা করা শুরু করে। একদিন নেশা করা অবস্থায় পুলিশের কাছে ধরা খায় সে। এরপর তাকে জিজ্ঞেস করে রুম কার? সে আমার কথা বলে দেয়। তখন পুলিশ আমাকেও গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। অথচ আমি এসবের সঙ্গে জড়িতও না। তবুও ১৩ মাস জেল খাটতে হয়েছে। জেল থেকে বের হয়ে দেখি, আমার কোনো কিছু নাই। যাদের সঙ্গে পার্টনারে ব্যবসা করতাম তারা সবকিছু বিক্রি করে চলে গেছে। আমার প্রায় ১ কোটি টাকা লুট করে নিয়েছে। আমার আকামার মেয়াদ ৭ মাস ছিল। কিন্তু আকামায় পলাতক দেখানো হয়। সেটা আমি জানতাম না। পরে ২ হাজার রিয়াল দেই আকামার জন্য। কিন্তু আমাকে কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি। ২৮ দিন পর আবার পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে। আমার রুমের মধ্যে ১০ হাজার রিয়াল ছিল। তাও আমাকে নিতে দেয়নি। অ্যাম্বাসিকে জানিয়েছি।

তারা আমার কোনো সাহায্য করেনি। দু’মাস জেল খেটে এখন নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরলাম। তিনি বলেন, পাকিস্তানি, ভারতের অ্যাম্বাসি মাসে ৩-৪ বার দেখতে আসে। অথচ আমাদের অ্যাম্বাসি খোঁজই রাখে না। ২ মাস পর অ্যাম্বাসি আমার কাছে আসে। আমি বলি, আমার রুম থেকে টাকা নিয়ে গেছে। আর আপনারা দুই মাস পরে আসছেন? তারা ওই টাকার আশাও ছেড়ে দিতে বলেছে। কষ্ট লাগে, আজকে সাড়ে ১৩ বছর পর বাড়িতে যাচ্ছি। অনেক টাকা খুঁইয়ে খালি হাতে ফিরছি। আমার দুইটা সন্তান আছে। মা আছে, বোন আছে। ভাইগ্না-ভগ্নি আছে। তাদের জন্য কিছুই আমি নিতে পারনি।