আওয়ামী লীগকে এ দেশে আর রাজনীতি করতে দেয়া হবে না

আওয়ামী লীগকে এ দেশে আর রাজনীতি করতে দেয়া হবে না

ফন্ট সাইজ:

স্বৈরাচার আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে আর রাজনীতি করতে দেয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বলেছেন, যারা মানুষ হত্যা, গণহত্যা, গুম, জুলুম ও নির্যাতন করেছে, অথচ এখনো ক্ষমা চায়নি কিংবা অনুশোচনা প্রকাশ করেনি, সেই দলকে এ দেশে রাজনীতি করার সুযোগ দেয়া হবে না। শুক্রবার চট্টগ্রামের
ফটিকছড়িতে ঐতিহ্যবাহী আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসার ১০৪তম বার্ষিক দীনি মহাসম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ গুম খুন ও নির্যাতনের মাধ্যমে দেশকে বিপর্যস্ত করে ক্ষমতা থেকে পালিয়ে গেছে। শাপলা চত্বরে আলেম-ওলামাদের হত্যা করা হয়েছে, মসজিদ রক্তাক্ত করা হয়েছে। এমন একটি ফ্যাসিবাদী শক্তিকে এ দেশে আর রাজনীতি করতে দেয়া হবে না। আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য ও দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রত্যাবর্তন ঠেকানোর প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ২৩ বছর সময় লেগেছে। আর ফ্যাসিবাদী ও আলেম-ওলামাবিরোধী শাসনের কবল থেকে জনগণকে মুক্ত করতে লেগেছে ১৬ থেকে ১৭ বছর। শাপলা চত্বরে অনেক আলেম-ওলামা রক্ত দিয়েছেন। তাদের অনেকের নাম ও কবরের ঠিকানাও এখনো জানা যায়নি। বহু মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশ ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছে। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের তথ্য তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে গত ১৬ থেকে ১৭ বছরে প্রায় তিন হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনি নিজেও ছিলেন বলে উল্লেখ করেন।

এ ছাড়া প্রায় ৭ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ হামলা-মামলার মাধ্যমে নিপীড়িত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কি আবার সেই ফ্যাসিবাদীদের পুনরাগমন চাই? প্রত্যাবর্তন চাই? তাহলে সেই ক্ষেত্র আজকে কারা তৈরি করে দিচ্ছে?’

গার্মেন্টস খাতে শ্রমিক অসন্তোষ ও অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব ঘটনার পেছনে ফ্যাসিবাদী শক্তির ইন্ধন রয়েছে। যারা এ ধরনের অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এ সময় জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটি শক্তি ইসলামের কথা বলে রাজনীতি করছে, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক দলিল ও নির্বাচনী ইশতেহারে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই। তারা শরিয়াভিত্তিক আইন-কানুন ও শাসনব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেয়নি। এমনকি তাদের দলীয় দলিল ও মনোগ্রাম থেকেও ‘আকিমুদ্দীন’ বাদ দেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘তারা মুখে এক কথা বলে, কিন্তু তাদের দলিলে কী আছে, সেটি বলে না। তারা কখনো তাদের ইশতেহারে বলেনি, তারা ইসলামী শাসন চায় কিংবা শরিয়াভিত্তিক আইন-কানুন চালু করতে চায়; বরং তারা শরিয়াভিত্তিক শাসনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।’ নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেশের সব জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চায় বিএনপি। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা অনুযায়ী দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনার মধ্যদিয়ে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ বিএনপি অবশ্যই বাস্তবায়ন করবে। আওয়ামী লীগ সংবিধান থেকে ইসলামী মূল্যবোধের যেসব বিষয় বাদ দিয়েছিল, সেগুলো পুনরায় সংযোজন করা হবে। মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস এবং বিসমিল্লাহও পুনঃস্থাপন করা হবে।

আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে। সরকারকে সহযোগিতা করা যেতে পারে, তবে দেশের মানুষের স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করা উচিত নয়। দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আলেম-ওলামা ও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নেও উদ্যোগ নেয়া হবে। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর ও বাবুনগর মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। পরে তিনি মহাসম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন, চট্টগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া, জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামারা বয়ান পেশ করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মুফতি রশিদুর রহমান ফারুক বর্ণভী, মাওলানা মুফতি মুস্তাকুন্নবী কাসেমী, মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরী, মুফতি মাহমুদুল হাসান ভুজপুরী, মুফতি হাবিবুল্লাহ মাহমুদ কাসেমী, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, মুফতি সাখাওয়াত হোসেন রাজি, মুফতি রেজাউল করিম আবরার, মাওলানা গাজী ইয়াকুব ওসমানী এবং মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মারুফসহ অনেকে। দুই দিনব্যাপী এ মহাসম্মেলন ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। শুক্রবার রাতে আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় সম্মেলনের সমাপ্তি হয়।