নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার শান্তনা ও শান্ত ইসলাম দম্পতি স্বপ্ন দেখেছিল যমজ শিশুর মুখ দেখার। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন এখন ধোঁয়াশায় পরিণত হয়েছে। গৃহবধূ শান্তনাকে পরপর দুইবার জানানো হয়েছিল তার গর্ভে যমজ সন্তান। কিন্তু সিজারের পর ধরিয়ে দেয়া হয়েছে ভূমিষ্ঠ হওয়া মেয়ে শিশুকে। একটি সন্তানের কথা শুনে তাদের চোখ কপালে। কোনোভাবেই মানতে নারাজ তারা। বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে এমনই ঘটনা ঘটেছে নওগাঁ শহরের বলাকা নামক বেসরকারি ক্লিনিকে। এদিকে খবর পেয়ে জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
অপরদিকে, সঠিক বিচার চেয়ে নওগাঁ সদর থানায় এজাহার দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামী শান্ত ইসলাম। তার দাবি- অপর নবজাতকের সন্ধান এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। সূত্র মতে, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর যমজ নবজাতকের একজনকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে অপর নবজাতকের কী হয়েছে- তার কোনো সদুত্তর পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন শান্তনার স্বামী শান্ত ইসলাম। তার দাবি- অস্ত্রোপচারের আগে দু’টি আল্ট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদনেই যমজ জীবিত সন্তানের কথা নিশ্চিত করা হয়েছিল। অথচ অস্ত্রোপচারের পর একটি কন্যাশিশুকে দেখানো হলেও অপর সন্তানটির বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। এ ঘটনায় বলাকা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে আর্থিক প্রস্তাব দেয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
শান্ত ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, আমার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর গত ১২ ও ২১শে অক্টোবর পৃথক দু’টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। উভয় পরীক্ষার প্রতিবেদনেই স্ত্রীর গর্ভে যমজ সন্তান থাকার কথা বলা হয়েছিল। প্রথমে জয়পুরহাট জেলার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রিপোর্ট করালে সেখানে দু’টি জীবিত ভ্রূণের উপস্থিতির কথা বলা হয়। এরপর পুনরায় গত ২১শে অক্টোবর নওগাঁ শহরের রি-লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিবেদনেও দু’টি জীবিত ভ্রূণের কথা উল্লেখ করা হয়। এমনকি ডাক্তার দিনা আল্ট্রা করার পর আমাদের বলেন, আপনাদের যমজ সন্তান হবে। চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুন বলেন যেহেতু যমজ বাচ্চা, কাজেই সিজার করতে হবে, নরমালে করা যাবে না। এবং তার পরামর্শে আমার স্ত্রীকে বৃহস্পতিবার বিকালে নওগাঁর বলাকা ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়। পরে ওই চিকিৎসকের অধীনে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেন তার স্ত্রী। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর পরিবারের কাছে একটি নবজাতক হস্তান্তর করা হলেও অপর সন্তানটির বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেয়া হয়নি।
শান্ত ইসলামের অভিযোগ, অপর নবজাতকের বিষয়ে জানতে চাইলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। বরং বিষয়টি ধামাচাপা দিতে আমাকে আর্থিক প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। শান্তনা বলেন, ‘পরিবারের সদস্যরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলে তারা আমার পেটের কাটা অংশ সেলাই না করে ফেলে রাখে। এ সময় মোবাইল ফোনে ভিডিও করে এবং বলে, তাদের কথা না শুনলে এ অবস্থায় রেখেই চলে যাবে। পরে আমার শরীরে কাঁপুনি শুরু হলে আমি বলি, আপনাদের সব কথা শুনবো, আগে পেটের সেলাই করেন। পরে পেটের কাটা অংশ সেলাই করা হয়। আমি আমার দুই সন্তানকেই চাই। আমার আরেক সন্তান কোথায়, তা জানতে চাই।’
রি-লাইফ ক্লিনিকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা ডাক্তার দিনা বলেন, আমি উনার লাস্ট একটা আল্ট্রা করেছিলাম। এবং আমার মেশিনে যেভাবে দেখানো হয়েছে, আমি সেটাই রোগীকে বলেছি। হয়তোবা ভুল হতে পারে। আর ওটিতে যেহেতু একটা বেবি হয়েছে, কাজেই আমার মেশিনে ভুল হতেও পারে। আমার কোনো ভুল বা দোষ নেই বলে জানান রি-লাইফ ডায়াগনস্টিকের মালিক শরিফুল। তিনি বলেন, এখানে ডাক্তার মাহফুজার নির্দেশনায় ডাক্তার দিনা আল্ট্রা করেছে। এবং দিনা ম্যাডাম টুইন বেবির রিপোর্ট দিয়েছে। কিন্তু সিজারের পর জানতে পারলাম একটা বেবি হয়েছে। এখন এটা নিয়ে রোগীদের দ্বিধামত আসলে রিপোর্ট নাকি অপারেশন কোনটা সঠিক?
বলাকা ক্লিনিকের মালিক এনামুল হক বলেন, ‘ডা. মাহফুজা খাতুনের পরামর্শেই ওই নারীকে আমার ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছিল। তিনি নিজেই অস্ত্রোপচার করেছেন। এর আগে তার নির্দেশেই রি-লাইফ ক্লিনিকে দিনা নামের এক ডাক্তার আল্ট্রাসনোগ্রাম করেছে। আমার এখানে শুধু অপারেশন করা হয়েছে। অপারেশনের পর সন্তান হাতে দেয়ার সবকিছু সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড আছে। পুলিশ এসে দেখে গেছে। জানতে চাইলে সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মিন্টু রহমান বলেন, বাদী এজাহার লিখছে। এজাহার দায়েরের পর এই কাজের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সকলের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনা জানার পরই আমি একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে পাঠিয়েছিলাম। ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে আবেদন জানালে নিরপেক্ষ তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে। এ বিষয়ে জানতে অভিযোগ ওঠা চিকিৎসক ডা. মাহফুজা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
