ইসরাইলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি মিত্র ও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের অতি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে নিজের সাম্রাজ্যের কার্যত পতন হয়েছে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের। তিনি ও তার দল কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। ফলে যা খুশি তা-ই এখন আর তিনি করতে পারবেন না। তার হাত-পা বেঁধে ফেলেছে বিরোধী দল ডেমোক্রেটরা। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে তাদের অনুমতি নিতে হবে। তবে নির্বাহী ক্ষমতায় তিনি কিছু কাজ করতে পারবেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যনীতি বা ইরান যুদ্ধের পরিণতি কোনদিকে যাবে এখনই বলা যাচ্ছে না। ট্রাম্প কি ইসরাইলে তার উগ্র মিত্র নেতানিয়াহুকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে নতুন করে যুদ্ধ করবেন! সেই আশঙ্কা এখন অনেকটাই ক্ষীণ। কারণ, নির্বাচনে পরাজিত হয়ে নেতানিয়াহু এখনও নিজের ঘর গোছাতে পারেননি। প্রায় এক সপ্তাহ অতিবাহিত হয়ে গেলেও তিনি সরকার গঠন করতে পারেননি। পারেনি অন্য কোনো দলও। ফলে রাজনৈতিকভাবে জগাখিচুরি পাকিয়ে গিয়েছে ইসরাইলে। নিজের ক্ষমতা পাকা করা বাদ দিয়ে নেতানিয়াহু ইরানে হামলা চালাতে রাজি হবেন এমন সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে ডনাল্ড ট্রাম্পও দেশে নিজের রাজনৈতিক দলের ভিতর সমালোচিত। তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তো সাফ বলেই দিয়েছেন- ইরান যুদ্ধের কারণে কংগ্রেস নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে রিপাবলিকানদের। এতে ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আগেই বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে এনেছেন নেতানিয়াহু। এক্ষেত্রে দেশে বা কংগ্রেসে বা নীতিনির্ধারণী মহলের অনুমোদন নেননি ট্রাম্প। তিনি একতরফা সিদ্ধান্তে নেতানিয়াহুর সঙ্গে যুদ্ধে শামিল হয়েছেন। ইরানে শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের উদ্দেশে হামলা করলেও পরে তা চলে যায় ইরানের স্কুলে হামলা, পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা, ইরানের তেলভাণ্ডারে হামলা, হরমুজ প্রণালিতে হামলা। শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের তেলসম্পদকে লুফে নেয়ার মতো কথাও বলেন ট্রাম্প। কিন্তু তাতে সফল হতে পারেননি। উল্টো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছেন। সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, জর্ডান, ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া সহ ওই অঞ্চলের দেশগুলোতে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন তারা। ট্রাম্পের এসব উন্মাদনার কারণে তাকে জবাবদিহিতায় আনার প্রচেষ্টা নেয় ডেমোক্রেটরা। কিন্তু তারা সে প্রচেষ্টায় সফল হয়নি। এখন তারা কার্যত কংগ্রেশনাল ক্ষমতায়। তারা ট্রাম্পের বিভিন্ন মামলা পুনরুজ্জীবিত করতে পারে বা তাকে জবাবদিহিতায় আনতে পারে। ফলে ট্রাম্প কার্যত ‘লেম ডাক’ বা খোঁড়া হয়ে পড়েছেন বলেই মনে হচ্ছে।
এ অবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি- নির্বাচনী চক্র শেষ হওয়ার পর ইরানের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধ শুরু করার সম্ভাবনা কি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বেড়েছে, নাকি কমেছে? মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালানোর দ্বারপ্রান্তে বলে মনে হচ্ছিল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম ও বাহিনী মোতায়েন করা হয়। আরব নেতারাও নতুন করে ভয়াবহ সংঘাতের বিষয়ে রহস্যময় সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের দিন ঘিরে কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা যে হামলার আশঙ্কা করছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত ঘটেনি। বরং ডেমোক্রেটদের কাছে ভয়াবহ পরাজয়ের জন্য রিপাবলিকানরা এখন ইরানের যুদ্ধ, এমনকি ইসরাইলকেও দায়ী করছেন।
বুধবার ট্রাম্প বলেন, ইরানের যুদ্ধ এবং এই সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জ্বালানির উচ্চমূল্য তার দলের ঐতিহাসিক পরাজয়ের কারণ হয়েছে- এ কথা ‘অনেকাংশে সত্য’। আরও স্পষ্টভাবে বুধবার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, আমরা যে কারণে হেরেছি, তা হলো যুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট নিজেই গত রাতে তা বলেছেন। দলের বিপর্যয়কর পরাজয়ের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ককেও দায়ী করেন তিনি। উল্লেখযোগ্যভাবে, প্রেসিডেন্টের বড় ছেলে ডনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এক্সে ভ্যান্সের এই বিশ্লেষণের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা তাকে একজন কট্টর সামরিক হস্তক্ষেপবিরোধী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের ফলাফলে বুধবার তেলের দাম ৯ শতাংশ কমে যাওয়ায় প্রত্যাশার পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আমেনা স্ট্র্যাটেজিসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেরিসা খুরমা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহল এবং কংগ্রেসকে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধ শুরু করা থেকে প্রেসিডেন্টকে বিরত রাখার সুযোগ দিতে পারে। রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইনস্টিটিউটের অনাবাসিক ফেলোও খুরমা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, এটি নির্ভর করছে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নির্বাচিত সদস্যরা ইরানের বিষয়ে নীতিগত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে কীভাবে একসঙ্গে কাজ করেন এবং ট্রাম্পকে তার উপদেষ্টারা কী পরামর্শ দেন, তার ওপর। তবে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই যুক্তি খারিজ করার মতো কয়েকটি কারণও রয়েছে। কংগ্রেসের ওপর নিজের ‘ভেটো ক্ষমতা’ নিয়ে গর্ব করেছেন প্রেসিডেন্ট।
মঙ্গলবার নির্বাচনী খবরাখবরের মধ্যে পলিটিকোকে ট্রাম্প বলেন, তিনি শুধু দুই বছর ধরে বসে থেকে সবকিছুতে ভেটো দিতে চান না। তবে ৮০ বছর বয়সী এই ধনকুবের, যিনি তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না, আইনপ্রণেতাদের দ্বারা সীমাবদ্ধ বোধ নাও করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের। তবে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন নিতে কংগ্রেসের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ- ২০০১ ও ২০০২ সালে। তারপরও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেমোক্রেটদের বড় বিজয় ট্রাম্পকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। খুরমা বলেন, ট্রাম্প কী করবেন, তা অনুমান করা কঠিন। তবে আরও উত্তেজনা বৃদ্ধি ঠেকাতে আগ্রহী রিপাবলিকানদের সঙ্গে ডেমোক্রেটরা কীভাবে কাজ করেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
বুধবার সিনেটে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা চাক শুমার ইরানের যুদ্ধকে দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। শুমার বলেন, আমরা এই যুদ্ধ শেষ করব। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ইতিমধ্যে আমাদের সঙ্গে কয়েকজন রিপাবলিকান যোগ দিয়েছেন।
এসব বক্তব্য এবং তেলের দামের নিম্নমুখী প্রবণতা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম ও বাহিনী মোতায়েনের চিত্র বলছে, সংঘাত আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানবাহী রণতরী বহর এবং একটি উভচর আক্রমণকারী জাহাজ রয়েছে। তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী বহরও ওই অঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে। এদিকে ইরানের নেতৃত্ব ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিপর্যয়কে উপভোগ করছে বলে মনে হচ্ছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই এক্সে দেয়া পোস্টে বলেন, ইরানি জাতি যুদ্ধক্ষেত্রে এবং হরমুজে ট্রাম্পকে কৌশলগত পরাজয় করে দিয়েছে। আর ওয়াশিংটনে দিয়েছে রাজনৈতিক পরাজয়। ইরানের যুদ্ধ তার দলের বিস্ময়কর পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে বলে স্বীকার করলেও বছরের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি ট্রাম্প। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটে কর্মরত এবং ইরানবিষয়ক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইর মিডল ইস্ট আইকে বলেন, যদি কিছু ঘটে থাকে, তাহলে ট্রাম্প এখন আরেক দফা হামলা চালানোর জন্য মুক্ত হয়ে গেছেন। তিনি বলেন, নতুন কংগ্রেস জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব গ্রহণ করবে না। এরপরও প্রেসিডেন্টকে সীমাবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাদের প্রকৃত সক্ষমতা কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই আমার মনে হয় না এতে খুব বেশি পরিবর্তন আসবে।
