ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির বাকি মেয়াদে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে ডেমোক্রেটরা। তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন আরও একটি ঐতিহাসিক কারণে আলোচনায় এসেছে। মিশিগানে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে ডেমোক্রেট প্রার্থী আবদুল আল-সাইদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।
পেশায় চিকিৎসক সাইদ এর আগে কখনো কোনো নির্বাচিত পদে দায়িত্ব পালন করেননি। তা সত্ত্বেও এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বিতর্কিত ও কাদা ছোড়াছুড়িতে ভরা প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি।
প্রচারণার শেষ দিনগুলোতে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। দলীয় মনোনয়নের লড়াইয়ে সাইদের কাছে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হওয়া তার ডেমোক্রেট সহকর্মী হ্যালি স্টিভেন্স রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন।
গত রোববার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সাইদ বলেন, ‘এটি এক কোটি মানুষের একটি রাজ্য, যারা তাদের সরকারের কাছ থেকে আরও অনেক ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য। আপনারা যাদের কথা বলছেন না, সেই ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৮ জনের ওপরই আমি বরং বেশি মনোযোগ দিচ্ছি।’ ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর বুধবার উল্লসিত সমর্থকদের সামনে বিজয়ের দাবি করেন সাইদ। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমার নাম ও ধর্মকে কেন্দ্র করে তারা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে দেখা সবচেয়ে কদর্য প্রচারণাগুলোর একটি চালিয়েছে।’
সমর্থকদের উদ্দেশ্যে সাইদ বলেন, ‘আপনারা সবচেয়ে অসম্ভাব্য এক প্রার্থীর ওপর আস্থা রেখেছেন। মিশিগান, আপনাদের সেবা করার জন্য আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না।’ সর্বশেষ প্রকাশিত ভোটের ফলাফল অনুযায়ী, সাইদ ৫১.৮ শতাংশ বা ২২,২৬,৭৮৪ ভোট পেয়ে নিজের জয় নিশ্চিত করেছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স পেয়েছেন ৪৬.২ শতাংশ বা ১৯,৮৩,৪৭৭ ভোট।
চিকিৎসক থেকে রাজনীতির ময়দানে
১৯৮৪ সালে ডেট্রয়েটের উপশহর রচেস্টার হিলসে জন্ম আবদুল সাইদের। তিন বছর বয়সে তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। এরপর বাবা ও সৎমা জ্যাকুলিন জনসনের কাছে বেড়ে ওঠেন তিনি। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিদ্যায় পড়াশোনা করেন সাইদ। পরে মহামারিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন। ২০১৫ সালে ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তার নিয়োগ জাতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর তিন বছর পর, ২০১৮ সালে, মিশিগানের গভর্নর পদে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি।
ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও গ্রেচেন হুইটমারের কাছে ২০ শতাংশের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। হুইটমার পরবর্তী সময়ে দুই মেয়াদে গভর্নর নির্বাচিত হন।
২০২৬ সালের সিনেট নির্বাচনের প্রাথমিক পর্যায়ে হুইটমার হ্যালি স্টিভেন্সকে সমর্থন করেছিলেন। তবে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে সাইদের প্রচারণার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান তিনি। সাইদের পক্ষে সমর্থন দেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের মতো প্রগতিশীল নেতারা। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ ডেমোক্রেটদের মধ্যপন্থি নেতারাও তার প্রচারণায় সমর্থন জানান। কারণ, সিনেটে দলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পরিকল্পনায় মিশিগানের এই আসনটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বামপন্থি অবস্থান ও ইসরাইলবিরোধী বক্তব্য
সাইদ একটি বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। তার প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়নে ধনকুবেরদের ওপর কর আরোপ। পাশাপাশি ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা দেয়ার বিরোধিতাও তার প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। ২৯শে অক্টোবর একটি নির্বাচনী সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘কর প্রদান করা এবং এটা জানা যে সেই টাকা অন্য কারও ও তার সন্তানদের ওপর বোমা ফেলার পরিবর্তে আপনার ও আপনার সন্তানদের জন্য ব্যয় করা হবে-এটা এতটা কঠিন হওয়া উচিত নয়।’
২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা বলে আখ্যা দেন সাইদ। অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরাইল বর্ণবৈষম্য চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
৪২ বছর বয়সী এই নেতা প্রায়ই বলেন, বিদেশে অন্যদের ওপর বোমা ফেলার জন্য মার্কিন করদাতাদের অর্থ পাঠানোর পরিবর্তে তা দেশের স্কুল ও মানুষের সুযোগ-সুবিধা তৈরিতে ব্যয় করা উচিত।
ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের আক্রমণ
মিশরীয় অভিবাসীদের সন্তান সাইদকে ‘সন্ত্রাসীদের পক্ষে থাকার’ অভিযোগে অভিযুক্ত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ১৫ই অক্টোবর মাইক রজার্সের নির্বাচনী সমাবেশে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সাইদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, ‘আপনারা এমন এক ধূর্ত লোকের চেয়ে ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য, যার উচিত নিজের মুখ বন্ধ রাখা এবং যে দেশ তাকে সবকিছু দিয়েছে, তার প্রতি সামান্য কৃতজ্ঞতা দেখানো।’ রিপাবলিকানরা সাইদের বিরুদ্ধে মিশরের বৃহত্তম ও প্রাচীনতম ইসলামপন্থি সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগও তুলে। ২০১১ সালের আরব বসন্তের অভ্যুত্থানের পর সংগঠনটি মিশরে অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় ছিল।
সাইদ অবশ্য মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বামপন্থি ভাষ্যকার হাসান পাইকারের সঙ্গে সম্পর্কের কারণেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন সাইদ। গত আগস্টে ডেট্রয়েটের একটি সিনাগগে এক আরব আমেরিকানের সহিংস হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে মন্তব্য করার পর মিশিগানের ইহুদি সমপ্রদায়ের কাছে ক্ষমা চান সাইদ।
সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের বার্তা
নির্বাচনী প্রচারণার সময় সাইদ বারবার বলেছেন, তার আনুগত্য মার্কিন সংবিধানের প্রতি। ভোটারদের প্রতি তার আহ্বান ছিল, অতীত কিংবা পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং তার রাজনৈতিক অবস্থান ও নীতির ভিত্তিতে যেন তাকে বিচার করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমার নাম বা আমার বিশ্বাসের কারণে মানুষ এমন পরিস্থিতিতে পড়ে না, যেখানে তারা গাড়িতে তেল বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারে না, চিকিৎসকের কাছে যেতে পারে না কিংবা যে বাতাসে শ্বাস নেয় ও যে পানি পান করে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে।’
তার ভাষায়, ‘আমি হয়তো গড় আমেরিকানদের চেয়ে কিছুটা ভিন্নভাবে প্রার্থনা করি। কিন্তু আমরা একই জিনিসের জন্য প্রার্থনা করি।’
