অস্ট্রেলিয়ার বহুল আলোচিত ট্রেনিং ভিসা সাবক্লাস ৪০৭-এর আবেদন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে দেশটির সরকার। ১২ নভেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন বিধান অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করে এই ভিসার আবেদন করার সুযোগ আর থাকছে না। শুধু আবেদন জমা দেওয়ার সময়ই নয়, ভিসা মঞ্জুরের সময়ও আবেদনকারীকে থাকতে হবে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে। দেশের ভেতর থেকে জমা দেওয়া আবেদন সরাসরি অবৈধ (ইনভ্যালিড) হিসেবে বিবেচিত হবে।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত নতুন নির্দেশনায় এ পরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছে। ফলে দেশটিতে অবস্থানরত যেসব বিদেশি নাগরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ বা পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের উদ্দেশ্যে ৪০৭ ভিসা নিতে চান, তাদের আবেদন করার কৌশল থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানের পরিকল্পনাও নতুন করে সাজাতে হবে। অনলাইনে ইম্মিএকাউন্ট-এর মাধ্যমে আবেদন জমা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও আবেদনকারী অস্ট্রেলিয়ার ভেতরে থাকলে সেটি বৈধ হবে না।
স্পনসর থাকলেই হবে না, আগে নিতে হবে অনুমোদন
৪০৭ ভিসার আবেদন প্রক্রিয়ায় নতুন করে কড়াকড়ি আরোপের সূচনা হয়েছে আগেই। গত ১১ মার্চ থেকে কার্যকর হওয়া পরিবর্তন অনুযায়ী, স্পনসরশিপ, নমিনেশন ও ভিসার আবেদন একসঙ্গে জমা দেওয়ার আগের সুযোগ আর নেই। এখন ভিসার আবেদন করার আগেই সংশ্লিষ্ট স্পনসরের অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মনোনীত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের নমিনেশনও অনুমোদিত হতে হবে। অর্থাৎ শুধু কোনো প্রতিষ্ঠান স্পনসর হতে রাজি হলেই ৪০৭ ভিসার আবেদন করা যাবে না। স্পনসরশিপ ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নমিনেশন অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ করেই ভিসার আবেদন জমা দিতে হবে। এতে আবেদনকারীদের পাশাপাশি স্পনসর প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আগেভাগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে।
তবে অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ সরকারের কোনো সংস্থা অনুমোদিত স্পনসর হলে আলাদা নমিনেশন অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থার স্পনসরশিপ অনুমোদিত থাকতে হবে এবং আবেদনকারীকে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানাতে হবে। অর্থাৎ সরকারি সংস্থার স্পনসরশিপ ও প্রশিক্ষণের আমন্ত্রণের ভিত্তিতে নমিনেশন ছাড়ের সুবিধা পাওয়া যাবে।
১২ নভেম্বর থেকে আবেদন করতে হবে দেশের বাইরে থেকে
নতুন বিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ৪০৭ ভিসার আবেদন জমা দেওয়ার সময় আবেদনকারীকে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থাকতে হবে। আগামী ১২ নভেম্বর থেকে দেশটির ভেতরে অবস্থান করে ইম্মিএকাউন্ট-এর মাধ্যমে আবেদন জমা দিলেও তা বৈধ হবে না। ফলে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা যারা এই ভিসার জন্য আবেদন করতে চান, তাদের দেশের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা আগেই চূড়ান্ত করতে হবে। শুধু আবেদন জমা দেওয়াই যথেষ্ট নয়। আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায় অন্য কোনো বৈধ ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের সুযোগ থাকলেও ৪০৭ ভিসা মঞ্জুরের সময় আবেদনকারীকে অবশ্যই দেশের বাইরে থাকতে হবে। এ ছাড়া বিদেশ থেকে জমা দেওয়া ৪০৭ ভিসার আবেদনের বিপরীতে কোনো ব্রিজিং ভিসা দেওয়া হবে না। ফলে আবেদন বিবেচনাধীন থাকা অবস্থায় বিদেশে অবস্থানের সময়, ভ্রমণ এবং আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়েই আবেদন করতে হবে।
অবৈধ আবেদন, বাড়তে পারে অভিবাসন জটিলতা
নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার ভেতর থেকে ৪০৭ ভিসার আবেদন জমা দিলে সেটি অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এর প্রভাব শুধু ওই আবেদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, আবেদনকারীর বর্তমান ভিসার অবস্থার ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে কারও বর্তমান ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে অন্য কোনো ভিসার জন্য আবেদন করার যোগ্যতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির বর্তমান অভিবাসন অবস্থা ও প্রযোজ্য বিধির ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইনভ্যালিড ঘোষিত আবেদনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিভিউ ট্রাইব্যুনালে মেরিটস রিভিউয়ের সুযোগ থাকবে না। ফলে আবেদন করার আগে অবস্থানসংক্রান্ত শর্ত যাচাই না করলে আইনি ও অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতায় পড়তে পারেন আবেদনকারীরা।
১২ নভেম্বরের আগে আবেদনকারীদের জন্য কী বিধান?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১২ নভেম্বর এর আগে বৈধভাবে জমা দেওয়া ৪০৭ ভিসার আবেদন নতুন অফশোর আবেদনসংক্রান্ত বিধানের আওতায় পড়বে না। অর্থাৎ এসব আবেদন জমা দেওয়ার সময় কার্যকর নিয়ম অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হবে। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১১ মার্চ ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া স্পনসরশিপ ও নমিনেশনসংক্রান্ত পরিবর্তন পুরোনো আবেদনগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ফলে ১২ নভেম্বরের আগে আবেদন করলেও স্পনসরশিপ ও নমিনেশনের ক্ষেত্রে নতুন শর্ত এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
ইংরেজি দক্ষতার প্রমাণে পাঁচ দেশের নাগরিকদের ছাড়
৪০৭ ভিসার আবেদনে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের পাসপোর্টধারীদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। দেশগুলো হলো যুক্তরাজ্য, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও আয়ারল্যান্ড। এসব দেশের বৈধ পাসপোর্টধারীদের নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ইংরেজি দক্ষতার পরীক্ষার ফল জমা দিতে হয় না। তবে অন্যান্য আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ইংরেজি ভাষার শর্ত পূরণ করতে হবে।
আবেদন ফি শুরু ৫৩৫ অস্ট্রেলীয় ডলার থেকে
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাবক্লাস ৪০৭ ভিসার মূল আবেদনকারীর আবেদন ফি শুরু হচ্ছে ৫৩৫ অস্ট্রেলিয়ান ডলার থেকে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আবেদন করলে প্রত্যেকের জন্য আলাদা আবেদন ফি দিতে হবে। এর বাইরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও বায়োমেট্রিকের জন্য অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র এবং তিমুর-লেস্তের নাগরিকদের জন্য বিশেষ আবেদন ফি ছাড় রয়েছে। অন্যান্য দেশের নাগরিকেরা এ সুবিধার আওতায় পড়ছেন না। ফলে অন্যান্য দেশ থেকে আবেদনকারীদের নির্ধারিত ফি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের প্রস্তুতি রাখতে হবে।
আবেদন করার আগে যেসব বিষয় নিশ্চিত করতে হবে
নতুন বিধানের কারণে ৪০৭ ভিসা প্রত্যাশীদের আগের চেয়ে বেশি সতর্কতার সঙ্গে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত আবেদনকারীদের বর্তমান ভিসার মেয়াদ ও শর্ত যাচাই করা জরুরি। দেশ ছাড়ার আগে স্পনসরশিপ অনুমোদন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নমিনেশন অনুমোদনের কপি সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি, স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রস্তুতি ও স্বাস্থ্যবিমার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করতে হবে। ১২ নভেম্বরের পর আবেদন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে অবস্থান নিশ্চিত করে ইম্মিএকাউন্ট-এর মাধ্যমে আবেদন করতে হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে, আবেদন জমা দিলেই ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। আবেদনকারীকে ৪০৭ ভিসার অন্যান্য সব যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে ভিসার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। ফলে নতুন বিধান কার্যকর হওয়ার আগে কিংবা পরে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের বর্তমান ভিসার অবস্থা, স্পনসরশিপ, নমিনেশন এবং বিদেশে অবস্থানের সক্ষমতা বিবেচনা করেই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
