চাঁপাইনবাবগঞ্জে পরিকল্পিত নগরায়ণের লক্ষ্যে একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এ প্রকল্পে সরকার ব্যয় করছে ৩০৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া চলতি বছরে মহানন্দা নদীতে ২৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাবার ড্যাম প্রকল্প নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এসব প্রকল্পের প্রয়োজনে ২১২ কোটি ৬১ লাখ টাকার ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমও চলমান।
অভিযোগ আছে, জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা দু’টি প্রকল্পের শতকোটি টাকা আটকে রেখেছে। বছরের পর বছর অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পেতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ঘুরছেন জমির মালিকেরা। অথচ বিধান অনুযায়ী, প্রত্যাশী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা জমা হওয়ার ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করার কথা। কিন্তু সেই আইনের তোয়াক্কা করছে না জেলা প্রশাসন। এদিকে জমি অধিগ্রহণে ধীরগতিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়—দুটিই বেড়েছে। অনুসন্ধান বলছে, জেলা প্রশাসনের অধিগ্রহণ শাখায় জমির মালিকদের হয়রানিতে একটি নির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করা হয়। প্রায় একদশক ধরে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে এমন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তা বদলালেও হয়রানির সেই কৌশল বদলায় না। সর্বশেষ দলিলগ্রহীতা, নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা প্রদানকারী ব্যক্তিই জমির প্রকৃত মালিক। তাকে নোটিশ করলেই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হয়। কিন্তু অধিগ্রহণ শাখা থেকে বিভিন্ন রেকর্ডীয় মালিকের কাছে নোটিশ পাঠিয়ে বিষয়টি জটিল করা হয়।
নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৮ সালে মহানন্দা নদীর সেতুর সঙ্গে সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন হয়। প্রকল্পটি বাস্তায়নে ২১ দশমিক ৪৫ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করে জেলা প্রশাসন। তিনটি প্যাকেজে জমি অধিগ্রহণের প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয় ১৪১ কোটি ৯১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। ভূমি অধিগ্রহণের টাকা জেলা প্রশাসনকে পরিশোধও করে প্রত্যাশী প্রতিষ্ঠান পৌরসভা। মহানন্দা দ্বিতীয় সেতু থেকে বিনপাড়া হয়ে কোপরা পর্যন্ত সংযোগ সড়কের জন্য ৫ দশমিক ৮৪ একর জমি অধিগ্রহণে প্রশাসন অযৌক্তিকভাবে ১০৪ বছর আগের সিএস রেকর্ডে এসব জমি নদী থাকার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। ফলে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এখন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়িয়েছে। অধিগ্রহণ না হওয়ায় কাজ শুরুই করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অন্য দুই প্যাকেজের অধিকাংশ টাকা বিতরণ করা হয়নি। একই কৌশলে আটকে রাখা হয়েছে মহানন্দা নদীতে রাবার ড্যাম প্রকল্পে অধিগ্রহণের ৭০ কোটি টাকা। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও অধিগ্রহণ করা জমির মালিকরা ক্ষতিপূরণ পাননি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সদ্যবিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবিব জানান, অধিগ্রহণের টাকা জেলা প্রশাসনকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। জমির মালিকদের টাকা দেয়া বা না দেয়ার সঠিক ব্যক্তি জেলা প্রশাসক। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ভালো বলতে পারবেন। দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী তৌফিকুল ইসলাম বলেন, জমি অধিগ্রহণ বিলম্ব হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এলএ শাখার সামনে কথা হয় ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলামের সঙ্গে। পৌরসভার চরনয়নশুকা মৌজার ২৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ জমি ২০২০ সালে অধিগ্রহণ হয়। যার এলএ কেস নং-০১/২০১৯-২০। ছয় বছরেও অধিগ্রহণের টাকা পাননি। তার অভিযোগ, ৭ ধারার নোটিশে জমির শ্রেণি ধানী জমি বলা হলেও ৮ ধারার নোটিশে সেটি বদলে করা হয় ডোবা। চাহিদামতো ১০ লাখ টাকা ঘুষ না দেয়ায় তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা জমির শ্রেণি পরিবর্তন করেন। ডোবা শ্রেণিতেও সরকারি দর অনুযায়ী ৮৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা পায়। কিন্তু মনগড়া দর নির্ধারণ করে আমাকে ১৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা প্রস্তাব করে। এ নিয়ে সেই সময়ে আমি লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। এতদিনে অভিযোগ নিষ্পত্তি করেনি, অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণও দেয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শতভাগ নির্ভুল ও আইনি জটিলতামুক্ত করতে প্রস্তাবিত জমির আগের ও বর্তমান রেকর্ড পর্যালোচনা করতে হয়। সিএস রেকর্ডে জমিটি নদী হিসেবে চিহ্নিত ছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ডভুক্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের অনাপত্তি প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, জমির ইতিহাস খতিয়ে দেখতে ভূমি জরিপ অধিদপ্তরের কারিগরি বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং ডিজিটাল ম্যাপিংয়ের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। যাতে ক্ষতিপূরণের অর্থ কোনো অবৈধ দখলদার বা ভুল রেকর্ডধারীর হাতে না যায়। তবে সংশ্লিষ্ট নদীটি অধিগ্রহণের জন্য প্রস্তাবিত জমি থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে। রাবার ড্যাম প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
