গাজীপুর, সাভার নারায়ণগঞ্জে পোশাক শ্রমিকদের অবরোধ, পুলিশের গাড়িতে আগুন ৬৭০ কারখানায় ছুটি

ফন্ট সাইজ:

সাভার-আশুলিয়ায় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ তিন দফা দাবিতে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের আন্দোলনকে ঘিরে দিনভর উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সকালে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন ও সড়কে বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এ সময় আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় হা-মীম গ্রুপের একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কয়েক দফা টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। উভয়পক্ষের সংঘর্ষে শিল্প পুলিশ-১-এর সহকারী পুলিশ সুপার শোয়েব আহম্মেদ, পথচারী ও সাধারণ শ্রমিকসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। এসব ঘটনায় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নাশকতার অভিযোগে ৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে আশুলিয়া ও সাভারের ৭ শতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

শিল্প পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকালে শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা স্বাভাবিক নিয়মে কাজে যোগ দেন। তবে নিশ্চিন্তপুর এলাকার নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে কর্মবিরতি শুরু করেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তারা কারখানা থেকে বেরিয়ে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে জড়ো হন। পরে হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনে গিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। একপর্যায়ে তারা সড়কে অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করলে উভয়পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় নরসিংহপুর এলাকার নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে হা-মীম গ্রুপের একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।

এদিকে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাড়ইপাড়া এলাকাতেও সকালে শ্রমিকরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। অন্যদিকে সাভারের উলাইল এলাকায় আল-মুসলিমসহ কয়েকটি পোশাক কারখানার সামনে অবস্থান নেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। তারা কারখানার ফটকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভেতরে কর্মরত শ্রমিকদের বের করে আনার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে আল-মুসলিম কারখানার সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে তাদের সরিয়ে দেয়।

এ ছাড়া আশুলিয়ার পলাশবাড়ী এলাকায় স্কাইলাইন কারখানার সামনেও সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, সকালে কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়ে কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। এ ছাড়া নিউ এইজ পোশাক কারখানার দুই শ্রমিককে রোববার পুলিশ আটক করেছে এমন দাবিতে ওই কারখানার শ্রমিকরা সোমবারও বিক্ষোভ করেছেন।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, সকালে পোশাক শ্রমিকরা নবীনগর-চন্দ্রা ও বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কে অবস্থান নিয়েছিলেন। পরে পুলিশ বুঝিয়ে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। কারখানায় ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগে এখন পর্যন্ত তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের পরিচয় এবং কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম পরিচয় জানানো সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সোমবার শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনায় ২৬৪ কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনে বহিরাগত ও দুষ্কৃতকারীরা যোগ দিয়েছেন বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেয়ার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গাজীপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন, গণমাধ্যমের ওপর হামলা
গাজীপুরে বিভিন্ন জায়গায় বেতন বাড়ানোর দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো শিল্প কারখানায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেছে। সকাল থেকেই নগরের নলজানি, লক্ষ্মীপুরা, কোনাবাড়ী, মৌচাক, পল্লী বিদ্যুৎ, চন্দ্রা, ভোগড়া, নাওজোর, ও সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। একপর্যায়ে তা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ভাঙচুরে রূপ নেয়। সংঘর্ষে পুলিশ, বিজিবি ও সংবাদকর্মীসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
গাজীপুর মহানগরের নাওজোর এলাকার ফ্লাইওভারের ওপর দুপুরে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। একই সময় বেপরোয়া শ্রমিকদের হামলায় আহত হয়েছেন সময় টেলিভিশনের রিপোর্টার মেহেদী হাসান ও ক্যামেরাপার্সন। এ সময় তাদের ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। এ ছাড়া পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে এক বিজিবি সদস্য আহত হন। এ সকল ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১০ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়। ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে লক্ষ্মীপুরা, কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুর ও পল্লী বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি’র নেতাকর্মীদের অবস্থান ও মিছিল করতে দেখা যায়। গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি, গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা থেকে কোনাবাড়ী, নাওজোর হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত মহাসড়কের দুই পাশে অবস্থিত শতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

গাজীপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নূরুল করিম ভূঁইয়া জানান, শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে চলমান শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। ২১ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন। আন্দোলনের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, মানুষের জানমালের যেন ক্ষতি না হয় সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করবে।