সোমবার সকাল ১০টা। মিরপুর-২ নম্বর বড়বাগ এলাকায় লাঠি হাতে শোডাউন দিচ্ছিলেন অর্ধশত তরুণ। এসময় দেশওয়ান এ্যাপারেলস পোশাক কারখানায় তিন শতাধিক শ্রমিক কাজ করছিলেন দেখে ক্ষুব্ধ হন তারা। কয়েকজন তরুণ ওই কারখানার এসে বলেন, আন্দোলনের সময় কীসের কাজ, দ্রুত বন্ধ করেন। তখন আচমকা তাদের অপর একটি গ্রুপ পেছন থেকে কারখানার দিকে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। আতঙ্কে কারখানার শ্রমিকরা নিচে নেমে আসেন। তারা আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমাদের কারখানায় ছুটি দেয়া হয়েছে। আপনারা ভাঙচুর চালাবেন না। এরপর ওই গ্রুপটি সেখান থেকে পাশের গার্মেন্টস সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেডে যান। সেখানেও তখন প্রায় ৭৫০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। বিষয়টি জেনে আক্রমণাত্মক আচরণ শুরু করে তরুণরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ওই কারখানায় তাণ্ডব চালায়। তাৎক্ষণিক সেই কারখানায় ছুটি দেন কর্তৃপক্ষ। আতঙ্কে ওই কারখানার শ্রমিকরাও বের হয়ে যান।
সরজমিন দেখা যায়, মিরপুর মডেল থানার পাশের রাস্তা দিয়ে একটু সামনে এগুতেই দেশওয়ান এ্যাপারেলসের কারখানা। কারখানার সামনে কয়েকজন কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির সিইও, মানবসম্পদ বিভাগের প্রধানসহ অনেক কর্মকর্তাই ছিলেন। সকালে তাদের চোখের সামনেই কারখানাটি ভাঙচুর করা হয়। যদিও তাদের শ্রমিকগুলো বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় তেমন ক্ষয়ক্ষতি করতে পারেনি। কর্মকর্তারা জানান, সকাল ১০টার দিকে দেশওয়ান এ্যাপারেলসের সামনে যায় বিক্ষুব্ধ তরুণরা। সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের আন্দোলনে অংশ নেয়ার আহ্বান জানান। এ সময় ফ্যাক্টরিতে ঢিল ছুড়ে ১৫-২০ জন কিশোর। এতে ফ্যাক্টরির সামনের অংশের কাঁচ ভেঙে যায়।
দেশওয়ান এ্যাপারেলসের মানবসম্পদ কর্মকর্তা সামিরুদ্দীন নওশাদ বলেন, আমাদের ফ্যাক্টরির সামনে জড়ো হয়ে তারা ঢিল মেরে কাঁচ ভেঙেছে। এর মধ্যে আমাদের শ্রমিকরা নেমে এসে ফ্যাক্টরি ভাংচুরে বাধা দেয়। তখন তারা পাশের সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন ফ্যাক্টরির দিকে চলে যায়। প্রতিষ্ঠানটির সিইও মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন মানবজমিনকে বলেন, যারা এসেছিল তারা কেউই শ্রমিক নয়। সবাই টোকাই। আমরা কাজ চালু রেখেছিলাম। কারণ শিপমেন্ট ও শ্রমিকদের বেতন দেয়ার সময় হয়ে গেছে। কাজ না চললে শিপমেন্ট মিস হবে। আমরা বেতন দিতে পারবো না। এই বিষয়টা আমাদের শ্রমিকরাও জানেন। তাই তারা কাজে এসেছিল এবং ফ্যাক্টরি রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিল। ওরা চলে যাওয়ার পরই আমরা আবার কাজ শুরু করেছি।
দুপুর আড়াইটার দিকে সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেড ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখা যায়, গার্মেন্টসটির অভ্যর্থনা কক্ষটি ভাংচুর করা হয়েছে। সেখানে থাকা সিসিটিভি মনিটর, চেয়ার-টেবিল, কক্ষের কাঁচসহ শ্রমিকদের পাঞ্চমেশিন (ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র) ভাঙচুর করা হয়েছে। এছাড়া সিঁড়ির পাশে কাঁচও ভাঙা দেখা গেছে। ফ্যাক্টরির চারতলায় ভাঙচুর করা হয়েছে। এই সময় কাঁচের আঘাতে একজন সিকিউরিটি গার্ডের হাতও কেটে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির সিকিউরিটি সুপারভাইজার মো. মোয়াজ্জেম হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ১০০ থেকে ১৫০ লোক এসে প্রথমে ফ্যাক্টরির দরজা খুলতে বলে। খুলতে না চাওয়ায় তারা চড়াও হয়। বলে, আন্দোলনের মধ্যে কিসের কাজ? এর পরপরই গার্মেন্টস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে হামলা চালায়। তারা ফ্যাক্টরির কাঁচ, বেশ কিছু যন্ত্রপাতিও ভেঙে ফেলে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের ফ্যাক্টরিতে প্রায় ৭৫০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। হুট করেই বাইরে থেকে আসা শতাধিক লোকজন আমাদের এখানে হামলা ও ভাংচুর করে। তারা যখন আসে তখন আমরা আমাদের ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের নামিয়ে দেই। তারপরও তারা ভাঙচুর চালায়। ভাঙচুরকারীরা কারা এবং কী কারণে ভাঙচুর চালিয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের এখানে যারা এসেছিল তাদের অনেকের গলায় আইডি কার্ড দেখেছি। যদিও যারা সামনে থেকে ভাংচুর চালিয়েছে তাদেরকে শ্রমিক বলে মনে হচ্ছিল না। তবে ভাংচুরে আমাদের ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা ছিল না।
ভোর ৬টায় গার্মেন্টসের সামনে শোডাউন দেয় কারা?
মিরপুর-২, ৬, ৭ নম্বর ও পল্লবী এলাকার স্থানীয় দোকানি পথচারী ও পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোর ৬টার দিকে কিছু লোক সবগুলো গার্মেন্টসের সামনে শোডাউন দেয়। এ সময় কোনো কারখানার লাইট জ্বলতে দেখলে ইটপাটকেল ছোড়া, ভাঙচুর চালানো হয়। তারা শোডাউন দিতে দিতে শ্রমিকদের জড়ো করেন। কেউ না চাইলেও যেতে বাধ্য করা হয়। তারা কোথা থেকে আসেন কেউ জানেন না। সকলে আন্দোলনকারী ভেবেই তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। আব্দুর রহিম নামের এক চা দোকানদার মানবজমিনকে বলেন, দু’দিন থেকে ভোর ৬টা থেকে ৭টার দিকে কিছু লোকজন শোডাউন দিয়ে আসছে। তাদের সংখ্যাটা খুব বেশিও না। তাদেরকে এই এলাকায় আগে কখনো দেখিনি। আশপাশে ১০টির অধিক গার্মেন্টস আছে। শ্রমিকরা আমার দোকানেই চা খায়। তাদের মধ্যে কাউকে দেখি না। তারা কোথা থেকে আসে বুঝতে পারছি না। তারা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক থাকে। কোনো কারখানার লাইট জ্বলতে দেখলেই হামলা চালায়।
তৃতীয় দিনে মিরপুরে সড়কে নামতে দেয়নি পুলিশ
ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণের দাবিতে মিরপুরে শ্রমিকদের তৃতীয় দিনে সড়কে নামতে দেয়নি পুলিশ। সোমবার সকাল থেকে অলিগলি দিয়ে মূল সড়কে আসার চেষ্টা করে শ্রমিকরা। এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। মিরপুর-১৪ ও মিরপুর-২ এলাকায় ধাওয়া দিয়ে তাদের সরিয়ে দেয়। সকাল ১১টার দিকে মিরপুর-৬ নম্বর শিয়ালবাড়ী ও পূরবী এলাকার কয়েকটি গার্মেন্টস থেকে শ্রমিকরা মিরপুর-২ নম্বর হয়ে ১০ নম্বর এলাকায় জড়ো হওয়ার চেষ্টা করছিল। সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। স্থানীয় দোকানদার ও পথচারীরা জানান, শ্রমিকরা শিয়ালবাড়ী মোড় থেকে জড়ো হয়েছিল। তখন পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। এর আগে সকাল ৯টায় মিরপুর-১৪ নম্বর এলাকায় জড়ো হয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন শ্রমিকরা। এ সময় পুলিশ ধাওয়া দিলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে নিজ নিজ কারখানায় ফিরে যান।
দুপুরে মিরপুর গোল চত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডিএমপি’র যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম ও প্রিভেনশন উত্তর) মো. মহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, রোববার শ্রমিক মজুরি বোর্ড গঠন হওয়ার পর শ্রমিকরা বিষয়টি জেনে গেছেন। তাদের দাবির বিষয়ে কাজ চলমান রয়েছে। সুতরাং এখন আর রাস্তা বন্ধ করা, গাড়ি ভাঙচুর কিংবা কোনো ফ্যাক্টরিতে ভাঙচুরের কোনো কারণ আমরা দেখছি না। মহিদুল ইসলাম বলেন, যারা রাস্তাঘাট বন্ধ করে, আইন লঙ্ঘন করে আইন-শৃঙ্খলা অবনতি করতে চায়, তাদের কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তারা শ্রমিকদের সঙ্গে দুষ্কৃতকারী হতে পারে। তারা যারাই হোক, যারা আইন অমান্য করছে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি করতে চাচ্ছে বা করছে, তারা আমাদের দৃষ্টিতে অপরাধী। আমরা তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের কাছে কোনো অপরাধীর বিশেষ কোনো পরিচয় নাই। যারা আইন অমান্য করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করার চেষ্টা করছে তারা আমাদের দৃষ্টিতে অপরাধী। আমরা তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি।
