জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি মাহবুব-উল আলম হানিফসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে আজ রায় ঘোষণা করা হবে। আজ (বৃহস্পতিবার) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করবেন। মামলার অপর তিন আসামি হলো— কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী ও কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান। হানিফসহ মামলার চার আসামিই পলাতক।
এর আগে গত ৫ই অক্টোবর আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে প্রসিকিউশন। আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের পক্ষে নিযুক্ত রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা ৭ই অক্টোবর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন। উভয়পক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি যেকোনো দিন রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। মামলায় চার আসামির বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়া শহরে ছয়জনকে হত্যাসহ মোট ৩টি অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি কুষ্টিয়ায় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার নির্দেশদাতা ও সরাসরি অংশগ্রহণের জন্য আসামিদের অভিযুক্ত করা হয়েছে।
প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম মানবজমিনকে বলেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ দলটির নেতাদের একই ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই অবস্থানে থেকে মাহবুব-উল আলম হানিফসহ আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা পাবেন বলে প্রসিকিউশন আশা করছে। প্রসিকিউটর তামীম আরও বলেন, একটি দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে হানিফ সব ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিয়েছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে উস্কানি ও সহায়তার পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আওয়ামী লীগ এই আন্দোলন দমন করেছে। এ ছাড়া প্রতিটি জেলা ও থানা, ওয়ার্ডে আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতন চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এরই অংশ হিসেব কুষ্টিয়ায়ও এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। টেলিফোনে কথোপকথনের সেসব তথ্যপ্রমাণ ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের সমর্থনে তথ্যপ্রমাণ, দালিলিক নথি ও মৌখিক সাক্ষ্য ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপনের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ সক্ষম হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
আরও দুই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন সম্পন্ন: এদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে লক্ষ্মীপুরে ৫ জনকে হত্যা ও হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় ৮ জনকে হত্যাসহ সংঘটিত মানবতাবেরিাধী অপরাধের ঘটনায় করা মিস-মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমরা ইতিমধ্যে দুটি প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি। এখন এসব পর্যালোচনা করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে। অতঃপর এটি ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া হবে।
জানা যায়, জুলাই আন্দোলন চলাকালে লক্ষ্মীপুরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়। এ মামলায় গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামি হলো— লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী, সদর উপজেলার দিঘলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সালাহ উদ্দিন জাবেদ ও জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন আলম। ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট লক্ষ্মীপুরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলা চালান আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তাদের গুলিতে ৪ শিক্ষার্থীসহ ৫ জন নিহত হন। তারা হলেন— আল আসাদ আফনান, সাব্বির হোসেন রাসেল, কাউসার হোসেন, ওসমান গণি ও মো. সুজন।
এর মধ্যে আফনান শহরের মাদাম ব্রিজ ও অন্যরা তমিজ মার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
এদিকে, ২০২৪ সালে একদফা দাবিতে সারা দেশ যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে তখন হবিগঞ্জে ৫ই আগস্ট পুলিশের গুলিতে নিহত হন শিশুসহ ৮ জন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিল অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ। এ জেলা ছিল সিলেট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিহতের তালিকায়। এসব অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মিস-মামলা তদন্ত প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে দাখিল করা হয়েছে।
