কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যার ঘটনায় তার মায়ের দায়ের করা মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে। মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তদন্ত শেষে পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল হয়। মঙ্গলবার রাতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বুলেট বৈরাগী ৪১তম কুমিল্লার বিবি বাজার স্থলবন্দরে কর্মরত বিসিএস নন ক্যাডার হিসেবে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ছিলেন। চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলো- কুমিল্লার চান্দীপুর উপজেলার নাঈমজলা গ্রামের মৃত নুরু মিয়ার ওরফে নুরু ইসলামের ছেলে মো. সোহরাব (৩৪), জেলার আদর্শ সদর উপজেলার ধর্মপুর এলাকার মৃত হারুন মিয়ার ছেলে ইসমাইল হোসেন জনি (২৮), একই উপজেলার আমড়াতলী গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে ইমরান হোসেন ওরফে হৃদয় (৩৪), আড়াইওরা গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে রাহাত হোসেন জুয়েল (২৭) ও ধর্মপুর এলাকার মৃত সজল মিয়ার ছেলে মো. সুজন (৩২)। আসামিরা বর্তমানে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
বুলেট বৈরাগী (৩৫) গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া থানার ডুমুরিয়া গ্রামের সুশীল বৈরাগীর ছেলে। কুমিল্লায় চাকরির সুবাদে বুলেট বৈরাগী নগরীর রাজগঞ্জ (পানপট্টি) এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। তার অব্যয় নামের দেড় বছরের একমাত্র শিশুসন্তান, স্ত্রী ও বাবা-মা রয়েছেন। বুলেটের স্ত্রীর উর্মি হীরার বাবার বাড়ি বাগেরহাটের চিতলমারী থানার খলিশাখালী গ্রামে। মঙ্গলবার রাতে নিহত বুলেট বৈরাগীর স্ত্রী উর্মি বলেন, তার (বুলেট বৈরাগী) উপার্জনে আমাদের পরিবারের ভরণপোষণ চলতো। ছেলেকে হারিয়ে বুলেটের বাবা-মা এখন দিগভ্রান্ত। কুমিল্লা নগরীর বাসাটি এখনো রয়েছে, মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধে কষ্ট হচ্ছে। চাকরির আশ্বাস পেলেও এ ব্যাপারে কিছুই হয়নি। কাস্টমস বিভাগ থেকে সরকারি প্রাপ্ত টাকাও পাইনি। তিনি সরকারের কাছে চাকরি সহায়তা ও স্বামীর হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার দাবি করেছেন। বুলেট বৈরাগী চট্টগ্রামে কাস্টমস এক্সাইজ অ্যান্ড ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে গত ২৪শে এপ্রিল রাতে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ওইদিন গভীর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আদর্শ সদর উপজেলার ঝাগুরঝুলি এলাকা থেকে বাস থেকে নামার পর ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। ২৫শে এপ্রিল সকালে কুমিল্লার ময়নামতি ক্রসিং হাইওয়ে থানা পুলিশ জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার মহাসড়কের বাতাবাড়িয়ার এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনের সন্নিকটে পড়ে থাকা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে। খবর পেয়ে বুলেট বৈরাগীর পরিবারের লোকজন হাইওয়ে থানায় গিয়ে তার পরিচয় শনাক্ত করেন।
দুষ্কৃতকারীরা ওই রাতে বুলেট বৈরাগী চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় আসার পর হত্যা করে তার সঙ্গে থাকা নগদ টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় বুলেট বৈরাগীর মা লিলিমা বৈরাগী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় মামলা করেন। পরে র্যাব তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে এই মামলার চার্জশিট দাখিল করে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের ওসি মো. সামসুল আলম শাহ বলেন, গ্রেপ্তার পাঁচ আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। টাকা ও মোবাইল ছিনতাইয়ের জন্যই যাত্রীবাহী ছিনতাইকারীরা বুলেট বৈরাগীর সঙ্গে সিএনজি অটোরিকশায় ওঠে এবং ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে সিএনজি অটোরিকশা থেকে ফেলে দেয়। এতে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তিনি মারা যান। আসামিরা বর্তমানে কুমিল্লা কারাগারে আছেন। মামলার বাদী বুলেট বৈরাগীর মা লিলিমা বৈরাগী বলেন, ডিবি পুলিশ চার্জশিট দাখিলের বিষয়টি জানিয়েছেন। আমার সন্তানকে তো আর ফিরে পাবো না। যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের কঠোর শাস্তি দেখতে চাই। কুমিল্লার আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মো. সাদেকুর রহমান জানান, আদালত চার্জশিট গ্রহণ করে বিচারের জন্য মামলাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে প্রেরণ করেছেন।
