অভিবাসনে প্রতারণার বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে নিবন্ধনহীন সাব-এজেন্টদের মাধ্যমে। অথচ কর্মীদের জন্য এসব মধ্যস্থতাকারীর পরিচয় যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য নেই। স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগের ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশই নিবন্ধনহীন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ পরিস্থিতিতে রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যকর গ্রেডিং ব্যবস্থা চালু, সাব-এজেন্ট নিবন্ধন ও তদারকি জোরদার এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সরকার, নিয়োগকারী সংগঠন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
বুধবার ঢাকায় ‘ফেয়ার অ্যান্ড এথিক্যাল রিক্রুটমেন্ট: অ্যাকাউন্টেবল সাব-এজেন্টস’ শীর্ষক ‘অভিবাসন সংলাপ ০১’-এ বক্তারা এসব কথা বলেন। তারা বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যকর গ্রেডিং ব্যবস্থা এখনো চালু হয়নি। সাব-এজেন্ট নিবন্ধন ও তদারকিও দুর্বল। ফলে কর্মীরা অর্থ দেওয়ার আগে এজেন্সি বা প্রতিনিধির পরিচয় যাচাই করার নির্ভরযোগ্য উপায় পাচ্ছেন না। অভিবাসন ব্যয় কমানো ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে নিয়োগ ঠেকাতে বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেন তারা।
হোটেল হলিডে ইন ঢাকার ইলিশ হলে সংলাপটির আয়োজন করে উইটনেস ফাউন্ডেশন। কোয়ালিশন ফর ফেয়ারার লেবার মাইগ্রেশনের (সিএফএলএম) আওতায় যুক্তরাজ্যের এফসিডিওর অর্থায়নে দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের ‘পেরি’ কর্মসূচির সহায়তায় অনুষ্ঠানটি হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর রিক্রুটিং এজেন্সির শ্রেণিবিন্যাসের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নিজ নির্বাচনী এলাকার কেউ চাইলে নির্দ্বিধায় কোনো একটি এজেন্সির নাম বলার মতো অবস্থা নেই।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সাব-এজেন্টদের তথ্য জমা দেয়ার সফটওয়্যার ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ভবিষ্যতে এজেন্সিগুলোকে তাদের প্রতিনিধিদের তালিকা জমা দিতে হবে। তালিকাটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে, যাতে কর্মীরা অর্থ দেওয়ার আগে প্রতিনিধির পরিচয় যাচাই করতে পারেন।
কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারকে অভিবাসন তথ্যসেবায় কাজে লাগানোর প্রস্তাবকে স্বাগত জানান তিনি। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে কি না এবং প্রশিক্ষণ শেষে কতজন চাকরি পাচ্ছেন, তা পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দেন। বিদেশি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া সফরের আলোচনার কথাও উল্লেখ করেন।
দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ সাব-এজেন্টদের জবাবদিহির আওতায় এনে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার দাবি জানান।
উইটনেস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ সিদ্দিকী জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থান ৩২ শতাংশ কমে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯২। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
পারভেজ সিদ্দিকী আরও জানান, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে কর্মী প্রেরণের ৭৩ শতাংশই ছিল সৌদি আরবকেন্দ্রিক। এটি একটি নির্দিষ্ট শ্রমবাজারের ওপর ঝুঁকিপূর্ণ নির্ভরতার চিত্র তুলে ধরে।
ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন সৈয়দ সাইফুল হক বলেন, এজেন্সিগুলো অনেক সময় বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে রসিদ দেয় না। মধ্যস্বত্বভোগীরা লেনদেন সামলালে দায়বদ্ধতাও আড়ালে চলে যায়। অনেক এজেন্সির বিরুদ্ধে ভিসা বাণিজ্যের অভিযোগও করেন তিনি।
মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব কাজী আবুল কালাম বলেন, ২০২০ সালের শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। বিদেশে নিজস্ব প্রতিনিধি না রেখে এজেন্সিগুলো কেন ভিসা-মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। একই সঙ্গে কিছু কর্মী কেন তিন মাসের মধ্যে দেশে ফিরে আসেন কিংবা প্রতিশ্রুত কাজ পান না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান।
সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজের অ্যাডভোকেট ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, সাব-এজেন্টদের শুধু আইনি স্বীকৃতি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না, প্রয়োজন বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ। ২০২৩ সালের আইন সংশোধন ও ২০২৫ সালের বিধিমালার প্রসঙ্গ তুলে তিনি নিবন্ধিত মধ্যস্থতাকারীদের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশের দাবি জানান। পাশাপাশি বিএমইটির ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়মপালনের তদারকির প্রস্তাব দেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার রেহনুমা সালাম খান বলেন, অভিবাসন খাতের মূল সমস্যা সুশাসনের। কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন, শুধু সেই সংখ্যা দিয়ে সাফল্য বিচার না করে কর্মীদের দক্ষতা, কাজের পরিবেশ, সুরক্ষা এবং অভিযোগ কমছে কি না, তার ভিত্তিতে সাফল্য পরিমাপের আহ্বান জানান তিনি।
বায়রার সাবেক যুগ্ম সচিব ফখরুল ইসলাম নির্বাচিত কর্মী ও অনুমোদিত খরচের তথ্যসহ অনলাইন নিয়োগ রেকর্ড চালুর প্রস্তাব দেন। তিনি ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়কারী এজেন্সির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও জোর দেন।
বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, বৈধ কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত পথে ঝুঁকছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শ্রমবাজার বহুমুখীকরণ, চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং মানবপাচার চক্রের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) আহমেদ আজিজ অভিবাসনের পুরো প্রক্রিয়ায় রিক্রুটিং এজেন্সির কঠোর পর্যবেক্ষণ, সহজে ব্যবহারযোগ্য অভিযোগ ব্যবস্থা এবং গ্লোবাল কমপ্যাক্ট ফর মাইগ্রেশনের (জিসিএম) জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমাদুল হক জানান, অভিবাসন ব্যয় নিয়ে একটি কমিটি কাজ করছে। একই সঙ্গে কর্মী পাঠানোর চাপের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ পথে নিয়োগ সীমিত করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন জটিল হয়ে পড়ছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
সংলাপে রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যকর গ্রেডিং ও শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা দ্রুত চালু করার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি এজেন্সির সাব-এজেন্ট ও প্রতিনিধিদের তালিকা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়, যাতে কর্মীরা অর্থ দেওয়ার আগে তাদের পরিচয় যাচাই করতে পারেন।
সাব-এজেন্ট নিবন্ধন ও বিধিমালার কার্যকর তদারকি, বিএমইটির ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়মপালন পর্যবেক্ষণ এবং রসিদ ছাড়া অর্থ নেওয়া ও ভিসা বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। নিয়োগের অনলাইন রেকর্ড সংরক্ষণ, ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়কারী এজেন্সির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।
গ্রামীণ পর্যায়ে অভিবাসনবিষয়ক তথ্যসেবা পৌঁছে দিতে টিটিসি ও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারকে কাজে লাগানো এবং শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন বক্তারা। দ্রুত দেশে ফিরে আসা ও প্রতিশ্রুত কাজ না পাওয়া কর্মীদের ঘটনা পর্যালোচনা, শ্রমবাজার বহুমুখীকরণ এবং মানবপাচার চক্রের শাস্তি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া কর্মী পাঠানোর সংখ্যার পরিবর্তে কর্মীদের দক্ষতা, সুরক্ষা ও অভিযোগ হ্রাসের ভিত্তিতে অভিবাসন খাতের সাফল্য পরিমাপ এবং জিসিএমের জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।
উইটনেস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশভিত্তিক একটি বেসরকারি সংস্থা, যা অভিবাসন প্রশাসন, শান্তি ও তরুণদের ক্ষমতায়নে কাজ করে। কোয়ালিশন ফর ফেয়ারার লেবার মাইগ্রেশন (সিএফএলএম) ন্যায্য ও নৈতিক নিয়োগের পক্ষে কাজ করা সংগঠনগুলোর একটি জোট।
