আবারও ক্ষমতায় টিকে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু, চাপে বিরোধীরা

ইসরাইলের নির্বাচন

আবারও ক্ষমতায় টিকে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু, চাপে বিরোধীরা

ফন্ট সাইজ:

ইসরাইলের নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। দেশটির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত এ নির্বাচনে ইহুদি ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন নিয়ে আপাতত ক্ষমতায় টিকে থাকার পথ তৈরি হয়েছে তার। তবে সংসদের ১২০টি আসনের মধ্যে নিজের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হতে পারে তাকে।

দেশটির স্থানীয় সময় বুধবার সকালে প্রায় ৭৭ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট গণনা শেষে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলোর পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর ডানপন্থি, কট্টর ডানপন্থি ও অতি-রক্ষণশীল ধর্মীয় দলগুলোর জোট ৫৪টি আসন পেতে পারে।

অন্যদিকে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের আসনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৪৯টিতে। আর আরব বংশোদ্ভূত ইসরাইলিদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো পেতে পারে ১৭টি আসন, যা রেকর্ড।

ভোট গণনা অব্যাহত থাকায় চূড়ান্ত ফলাফলে পরিবর্তন আসতে পারে। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস থাকলেও বিরোধীরা প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল করতে পারেনি। ফলে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সম্ভাবনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও নেতানিয়াহুর বিরোধীদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া সরকার গঠনের মতো আসন নিশ্চিত করা। আরব দলগুলোর ব্যাপক সমর্থন গ্রহণের বিষয়টি ইসরাইলের অনেক ইহুদি রাজনৈতিক নেতা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে এমন সমর্থন নিশ্চিত করাও বিরোধীদের জন্য কঠিন। নতুন সরকার গঠনের আলোচনা চলাকালেও নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন।

নিরাপত্তা ইস্যুতে আরও কঠোর অবস্থান নেতানিয়াহুর

বুধবার রাত ৩টার পর জেরুজালেমে লিকুদ পার্টির নির্বাচনী সদর দপ্তরে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন নেতানিয়াহু। তিনি ‘শক্তিশালী ডানপন্থি জাতীয় সরকার’ গঠনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক সাফল্যের কথা তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথাও বলেন।

নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের অস্তিত্বগত হুমকি চিরতরে দূর করার জন্য আমাদের অংশীদার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরাইলের সামনে এক অনন্য ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। তবে অন্য কোনো স্বার্থ যেন আমাদের এই পবিত্র লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।

এর আগে ট্রাম্পও ইসরাইলি ভোটারদের নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইরানে অভিযান ‘শেষ করার’ জন্য দুই নেতার একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেছিলেন তিনি।
বুধবার টেক্সাসে এক নির্বাচনী অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, তার সমর্থন নেতানিয়াহুকে অনেক সাহায্য করেছে এবং তিনি নির্বাচনে ‘খুব ভালো করেছেন’।
এদিকে নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট এগিয়ে থাকলেও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী জনগণের সমর্থন হারিয়েছেন। তিনি নেতানিয়াহুকে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

ডানপন্থার প্রভাব আরও স্পষ্ট

নেতানিয়াহুর প্রতি অধিকাংশ ইহুদি ভোটারের সমর্থন ইসরাইলের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার নেতৃত্বে ইহুদি জাতীয়তাবাদ, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণের সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনা প্রত্যাখ্যানের প্রবণতা দেশটির মূলধারার রাজনীতিতে আরও দৃঢ় হয়েছে।
একসময় ইসরাইলের রাজনীতিতে প্রভাবশালী মধ্য-বামপন্থিরা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে সমঝোতা এবং শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দিতেন। এখন তারা তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছেন। অধিকাংশ ইহুদি রাজনৈতিক দলই ভবিষ্যতে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করছে। অথচ ১৯৯০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত শান্তি আলোচনার অন্যতম ভিত্তি ছিল স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা।

ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতাদের একজন নেতানিয়াহু ২০০৯ সালে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন। এর আগে ১৯৯০-এর দশকে তিনি দেশটির সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ২০২১ সালে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর একটি জোট প্রায় ১৮ মাসের জন্য তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সক্ষম হয়েছিল। তবে এরপর আবারও ক্ষমতায় ফেরেন তিনি।

রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি, বড় অর্জন আরব দলগুলোর

মঙ্গলবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। নেতানিয়াহুর সমর্থক ও বিরোধী—উভয় পক্ষই নির্বাচনকে দেশের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখেছিলেন।

এবার আরব বংশোদ্ভূত ইসরাইলিদের ভোটার উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের বেশি এই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা ঐতিহাসিকভাবে মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিলেন। নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও আরববিরোধী বক্তব্যের অভিযোগ তাদের অনেককে ভোট দিতে উৎসাহিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেশ কয়েকটি আরব দলের জোট জয়েন্ট লিস্টের সদর দপ্তরে নির্বাচনের প্রাথমিক ফল প্রকাশের পর উল্লাস দেখা যায়। দলটির প্রার্থী ফাতেন গাত্তাস বলেন, “আমরা দখলদারত্ব ও বর্ণবাদ প্রত্যাখ্যান করি এবং এখানেই থাকব।”

এর আগে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধীদের একটি জোট ছোট একটি আরব দলের সমর্থন নিয়েছিল। এবার আইজেনকোটের জোট প্রত্যাশার তুলনায় কম আসন পাওয়ায় সরকার গঠনের জন্য তাদের আরও বিস্তৃত আরব দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনেক ইহুদি রাজনৈতিক নেতার কাছে এমন সমঝোতা গ্রহণযোগ্য নয়।

ফলে নির্বাচনে এগিয়ে থেকেও নেতানিয়াহুর সামনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চ্যালেঞ্জ থাকছে। অন্যদিকে বিরোধীদের জন্যও তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো সহজ হচ্ছে না। ভোট গণনা শেষে চূড়ান্ত ফল এবং পরবর্তী জোট আলোচনা ইসরাইলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।