১২ হাজার মানুষের গলার কাঁটা একটি ভাঙা সেতু

১২ হাজার মানুষের গলার কাঁটা একটি ভাঙা সেতু

ফন্ট সাইজ:

একটি ড্রামের ভেলা, নিচে গভীর খাল, আর সেই ভেলায় চড়েই প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যায় শিশু, ফসল নিয়ে বাজারে যান কৃষক, খাল পার হন অসংখ্য মানুষ। এভাবেই ৯ বছর ধরে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের ১০ গ্রামের প্রায় ১২ হাজার মানুষ। কামারের ছড়া খালের উপর সেতু ভেঙে যাওয়ার পর আর নির্মিত হয়নি নতুন সেতু। ফলে এই মানুষগুলোর যাতায়াতের একমাত্র ভরসা এখন ঝুঁকিপূর্ণ সেই ড্রামের ভেলা। সেতু না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে তাদের পাড়ি দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত ১০-১২ কিলোমিটার পথ। এতে বাড়ছে সময় ও পরিবহন খরচ।

স্থানীয় কৃষক আনসার আলীর ভাষ্য, ‘হামরা এটে সোগায় আবাদ-সুবাদ করি খাই। জমির ফসল ব্যাচে সংসার চলাই। এই ব্রিজটা ভাঙ্গি কি যে কষ্ট হইছে হামার। ধান হাট ধরি যাবার গেইলে দুই মুল্লুক ঘুড়ি যাওয়া নাগে। কষ্ট আর খচ্ছা দুখ্যানে বেশি হয়।’ শুধু তাই নয়, শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতও হয়ে উঠেছে উদ্বেগের বিষয়। খালে পানি থাকা অবস্থায় ড্রামের ভেলায় চড়ে শিশুদের পারাপার করতে হয়। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় অনেক অভিভাবক নিজেরাই সন্তানদের খাল পার করে দেন। শিশুর অভিভাবক খালেদা বেগমের ভাষ্য, ‘এই খালোত অথাও পানি। এই ড্রাম দিয়া খাল পার হয়া মোর ছাওয়া প্রাইমারি ইস্কুল যায়। ভয় নাগে ছোট ছাওয়া, ওইজন্যে মুই পার করি দেং, ফির ছুটি হইলে নিয়া আইসোং। ব্রিজটা হইলো নিশ্চিন্তে ছাওয়া ইস্কুল গ্যালো হয়।’ স্থানীয়দের এই দুর্ভোগের শুরু ২০১৭ সালে। মেকলী ও ছাটকালুয়া গ্রামের মধ্যবর্তী কামারের ছড়া খালের উপর সেতুটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় প্রবল স্রোতে সেতুটির প্রায় ৭৫ ফুট অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ সেতুটির অধিকাংশ এখন পানির নিচে, অবশিষ্ট সামান্য অংশ ঝুলে রয়েছে। সেতুটি ভেঙে যাওয়ার পর স্থানীয়রা প্রথমে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে চলাচলের ব্যবস্থা করেন। সেটি ভেঙে গেলে ড্রামের ভেলাই হয়ে ওঠে একমাত্র অবলম্বন। সেই পুরনো ভেলাটিও এখন ঝুঁকিপূর্ণ। ছিনাই ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বলেছেন, সবাই শুধু বলেন, প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, বরাদ্দ পেলে কাজ হবে। কিন্তু বাস্তবে কাজ আর হয় না।

এর আগে পিআইও অফিস থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। পরে সেতুটির মাপজোখ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়। কিন্তু এরপর থেকে কাজটি একই অবস্থায় পড়ে আছে। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা প্রকৌশলী মো. এজাহারুল হক জানান, এখন পর্যন্ত কোনো বরাদ্দ আসেনি। তবে ১০০ মিটারের কম দৈর্ঘ্যরে সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় তিন থেকে চারটি সেতুর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত সেতুগুলোর মধ্যে এই সেতুটিও রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু করা হবে। তবে কবে নাগাদ বরাদ্দ পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বলা সম্ভব নয়।