রাষ্ট্রীয় সফরের প্রকৃত গুরুত্ব কখনোই কেবল যৌথ ঘোষণাপত্র, বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি কিংবা কূটনৈতিক সৌজন্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কিছু সফর একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, কৌশলগত অবস্থান এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে তার ভূমিকা পুনর্নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করে। সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফর সেই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হতে পারে। কারণ এটি শুধু বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের আরেকটি অধ্যায় নয়; বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক শক্তি-সমীকরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণের প্রশ্ন।
বিশ্ব এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। গত তিন দশকের বৈশ্বিকায়নের যুগ কার্যত পুনর্লিখিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস, প্রযুক্তিগত আধিপত্যের প্রতিযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের উত্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুকে পশ্চিম থেকে পূর্বে স্থানান্তর করছে। বিশ্ব অর্থনীতির নতুন মানচিত্রে বঙ্গোপসাগর আর শুধু একটি সমুদ্রসীমা নয়; এটি পরিণত হচ্ছে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সংযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের গুরুত্বও বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রবেশদ্বার এবং পূর্ব এশিয়ার উৎপাদন ব্যবস্থার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মূল্যবান। জাপান এই ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই সুযোগকে কৌশলগত সক্ষমতায় রূপ দিতে পারবে?
স্বাধীনতার পর থেকেই জাপান বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অংশীদার। ১৯৭২ সালে দ্রুত স্বীকৃতি প্রদান থেকে শুরু করে অবকাঠামো উন্নয়নের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে জাপানের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা দুই দেশের সম্পর্ককে আস্থার এক শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। যমুনা বহুমুখী সেতু, ঢাকার মেট্রোরেল, যমুনা রেলসেতু কিংবা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর কেবল উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অবকাঠামোগত ভিত্তি।
তবে বাস্তবতা হলো, আজকের বিশ্বে অবকাঠামো নির্মাণই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। বরং অবকাঠামো তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। অনেক দেশ বন্দর নির্মাণ করেছে, কিন্তু শিল্পশক্তি হতে পারেনি। অনেক দেশ মহাসড়ক বানিয়েছে, কিন্তু বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশ হতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশকেও এখন নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা কি অবকাঠামোর অর্থনীতিতে আটকে থাকব, নাকি উৎপাদন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণ ঘটাব?
এখানেই জাপান সফরের প্রকৃত তাৎপর্য।
বিশ্বজুড়ে জাপানি কোম্পানিগুলো এখন উৎপাদন কেন্দ্রের বৈচিত্র্য খুঁজছে। শুধু চীনের ওপর নির্ভরশীলতা নয়। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারত এই পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। বাংলাদেশও একই প্রতিযোগিতার অংশ। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ শুধু অর্থের প্রবাহ নয়; এটি প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা এবং বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে প্রবেশের সুযোগ।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগ আকর্ষণ নয়, বিনিয়োগের উপযোগী রাষ্ট্রিক সক্ষমতা তৈরি করা। বিনিয়োগকারী জানতে চান নীতির স্থিতিশীলতা কতটা, প্রশাসনের কার্যকারিতা কতটুকু, অনুমোদন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ এবং ব্যবসার পরিবেশ কতটা পূর্বানুমানযোগ্য। অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা। জাপানি বিনিয়োগকারীরা মূলত দীর্ঘমেয়াদি আস্থা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতাকে মূল্য দেন। ফলে এই সফরের সাফল্য নির্ভর করবে যৌথ বিবৃতির ভাষার চেয়ে বেশি বাস্তব সংস্কারের ওপর।
তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক অর্থনীতি নয়; বরং ভূরাজনীতি।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় মাঝারি শক্তির দেশগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। জাপানের সঙ্গে গভীর অংশীদারত্ব, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়াই বাংলাদেশের বাস্তব স্বার্থ।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে উন্নয়নকেন্দ্রিক কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন। অর্থাৎ কোনো শক্তি-বলয়ের অংশ না হয়ে জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলা। জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা চীনের বিকল্প নয়, যেমন চীনের সঙ্গে সহযোগিতাও জাপানের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র একাধিক অংশীদারকে জাতীয় উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে। আগামী দশকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য নির্ভর করবে এই ভারসাম্য রক্ষার দক্ষতার ওপর।
মানবসম্পদ সহযোগিতাও এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো দক্ষতার স্থানান্তর। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসই প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সবচেয়ে স্থায়ী অর্জন অবকাঠামো নয়, মানুষ। দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতায় প্রশিক্ষিত একটি ক্ষুদ্র কর্মীদল পুরো শিল্পখাতের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। জাপানের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কতজন দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, ব্যবস্থাপক এবং উদ্যোক্তা তৈরি হলো।
কারণ আগামী পৃথিবীতে প্রতিযোগিতা হবে মূলধনের নয়, জ্ঞানের; শুধু উৎপাদনের নয়, উদ্ভাবনের; শুধু বাজারের নয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার।
একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে উদীয়মান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে একটি কৌশলগত সম্পদে পরিণত করেছে। যদি বন্দর, রেল, মহাসড়ক, শিল্পাঞ্চল এবং কাস্টমস ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশ শুধু একটি রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি নয়, বরং দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সেতুতে পরিণত হতে পারে।
কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে উন্নয়নকে প্রকল্পকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বের করে উৎপাদন, প্রযুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কারণ ইতিহাস বলে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন আসে না কেবল ঋণ, প্রকল্প বা অবকাঠামো থেকে; আসে জ্ঞান, দক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা থেকে।
তারেক রহমানের জাপান সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে আটলান্টিক অঞ্চল থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সরে আসছে। বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল আরেকটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়; এটি একটি কৌশলগত মুহূর্ত। আমরা কি বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ভৌগোলিক ক্ষেত্র হয়ে থাকব, নাকি সেই প্রতিযোগিতাকে নিজেদের উন্নয়ন ও রাষ্ট্রশক্তি বৃদ্ধির সুযোগে পরিণত করব, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
ইতিহাস খুব কম সময়ই একটি জাতিকে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ দেয়। টোকিও সফর সেই বিরল সুযোগগুলোর একটি হতে পারে। যদি এই সফর অবকাঠামোর সঙ্গে শিল্পায়ন, বিনিয়োগের সঙ্গে প্রযুক্তি এবং অভিবাসনের সঙ্গে জ্ঞানকে যুক্ত করতে পারে, তবে এটি শুধুমাত্র একটি সফল কূটনৈতিক সফর হিসেবে নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর নতুন এশীয় ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখেন।
ই-মেইল: [email protected]
টোকিওর পথে ঢাকা: নতুন ভূরাজনীতির দাবার ছকে বাংলাদেশের বড় চাল
সহিদুল আলম স্বপন
মত-মতান্তর
১ ঘন্টা আগে
২১ অক্টোবর (বুধবার), ২০২৬, ৮ঃ০৪ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
