রাজধানী ঢাকার ৩০০ ফিট এলাকায় পুলিশের এক অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় অভিযান চালিয়ে ২৬ নারীসহ ৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে আইস, ইয়াবা, মদ, গাঁজা ও কুশের মতো মাদক । অভিযোগ অনুযায়ী, ওই বাসায় দীর্ঘদিন ধরে ‘এয়ারবিএনবি’র মাধ্যমে ভাড়া নিয়ে ডিজে পার্টি ও মাদক সেবন চলছিল ।
ঘটনাটি কেবল একটি মাদক অভিযানের খবর নয়। এটি আমাদের প্রশাসনিক ও নৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক গভীর সংকটের প্রকাশ। কারণ, যিনি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত, তার মালিকানাধীন সম্পত্তিতে যদি দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম চলতে পারে, তবে প্রশ্ন উঠে যায়—পদের আড়ালে আসলে কী হচ্ছে, তা কে দেখবে? ঘিটনাটিকে দায়িত্বশীলতার অভাবের চরম উদাহরণ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়।
একজন অতিরিক্ত ডিআইজি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার প্রতীক। তাঁর বাসা যদি মাদক ও অসামাজিক কার্যক্রমের আড্ডায় পরিণত হয়, তবে তা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়—এটি তার পেশাগত অবস্থান ও ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তিনি নিয়ম মেনেই বাসা ভাড়া দিয়েছিলেন এবং ভাড়াটেরা নিয়ম ভঙ্গ করেছে । কিন্তু প্রশ্ন হলো—এত বড় একটি বাসা, এত মানুষ, এত মাদক—এসবের কিছু কি তাঁর জানার কথা ছিল না? নাকি তিনি জানতেন, কিন্তু চোখ বন্ধ রেখেছিলেন? কারণ যাই হোক, খারাপ দৃষ্টান্তের ভার তাকে বহন করতে হয়েছে। তাকে ওএসডি করা হয়েছে।
পুলিশ বাহিনীর ভেতরে যদি এমন দৃষ্টান্ত তৈরি হয় যে, উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার সম্পত্তি ব্যবহার করে অবৈধ কাজ চালিয়ে যাওয়া যায়, তবে তা নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্যও একটি সবুজ সংকেত হয়ে দাঁড়ায়। ‘উপরের লোকেরা তো আছেনই’—এই মনোভাব আইনের শাসনকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়।
আমাদের সমাজে ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে যত আলোচনা হয়, এই ঘটনা তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
নিজের পদ-পদবীর মর্যাদা না রাখা পেশাগত দায়িত্বহীনতার অন্যতম দুর্বলতা। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, এই ঘটনা ঘটার আগে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ—বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল । অর্থাৎ, তিনি ইতিমধ্যেই ‘ওএসডি’ (বিশেষ দায়িত্বে) ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছিল। এমন একজন ব্যক্তির মালিকানাধীন বাসায় মাদক ও ডিজে পার্টি চলছে—এটি প্রমাণ করে, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তিনি নিজের পদ-পদবীর মর্যাদা রক্ষা করেননি, বরং আরও বড় কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছেন।
আসলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতির কারণেই বার বার এমন ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ, ঘটনার পর অভিযুক্ত কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া ছিল আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক। তিনি বলেছেন, ভাড়াটেরা নিয়ম ভঙ্গ করেছে । কিন্তু একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে সবাই আরও বেশি দায়বদ্ধতার প্রত্যাশা করে। ‘আমি জানতাম না’—এই অজুহাত একজন অতিরিক্ত ডিআইজির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর দায়িত্ব কেবল নিজের কাজকর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর মালিকানাধীন সম্পত্তি ব্যবহার করে যদি কোনো অবৈধ কাজ হয়, তবে তার নৈতিক দায়ও তাঁরই।
এ ধরনের ঘটনায় করণীয় কী? প্রথমত, এই ঘটনার তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ। কেবল ভাড়াটেদের আটক করলেই হবে না; অভিযুক্ত কর্মকর্তার সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি, তাঁর জানার সম্ভাবনা এবং দায় এড়ানোর চেষ্টা—সবদিক খতিয়ে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুলিশ বাহিনীর ভেতরে সম্পদ ও সম্পত্তির ঘোষণা ও তদারকি ব্যবস্থা আরও কঠোর করতে হবে। তৃতীয়ত, ‘ওএসডি’ অবস্থায় থাকা কর্মকর্তাদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে তাঁরা নিজেদের ‘অবসর’ ভেবে অবৈধ কাজে জড়িয়ে না পড়েন।
এই ঘটনাটি কেবল একটি মাদক অভিযানের খবর নয়। এটি আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক গভীর সংকটের প্রকাশ—যেখানে পদের আড়ালে অনেক কিছু এড়িয়ে যাওয়া হয়, দায়িত্বশীলতার অভাব প্রকট হয়ে ওঠে এবং খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি হয়। প্রশ্ন হলো—এ ধরনের ঘটনায় করণীয় কী?
প্রথমত, এই ঘটনার তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ। কেবল ভাড়াটেদের আটক করলেই হবে না; অভিযুক্ত কর্মকর্তার সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি, তাঁর জানার সম্ভাবনা এবং দায় এড়ানোর চেষ্টা—সবদিক খতিয়ে দেখতে হবে। প্রশ্ন হলো—এত বড় একটি বাসা, এত মানুষ, এত মাদক—এসবের কিছু কি তাঁর জানার কথা ছিল না? নাকি তিনি জানতেন, কিন্তু চোখ বন্ধ রেখেছিলেন? ‘আমি জানতাম না’—এই অজুহাত একজন অতিরিক্ত ডিআইজির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর দায়িত্ব কেবল নিজের কাজকর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর মালিকানাধীন সম্পত্তি ব্যবহার করে যদি কোনো অবৈধ কাজ হয়, তবে তার নৈতিক দায়ও তাঁরই। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে তিনি জানতেন বা সহযোগিতা করেছেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কেবল বিভাগীয় ব্যবস্থাই নয়, ফৌজদারি ব্যবস্থাও নিতে হবে। আর যদি প্রমাণিত হয় যে তিনি জানতেন না, তবুও সম্পত্তি ব্যবহারের নৈতিক দায় এড়ানো যাবে না—কারণ একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছ থেকে আরও বেশি সতর্কতা প্রত্যাশিত।
দ্বিতীয়ত, পুলিশ বাহিনীর ভেতরে সম্পদ ও সম্পত্তির ঘোষণা ও তদারকি ব্যবস্থা আরও কঠোর করতে হবে। একজন কর্মকর্তার একাধিক বাসা, ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক সম্পত্তি থাকলে সেগুলোর ব্যবহার সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য নিতে হবে। সম্পদের উৎস ও ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। অনেক সময় দেখা যায়, কর্মকর্তারা নিজের নামে নয়, বরং আত্মীয় বা বেনামি ব্যক্তির নামে সম্পত্তি কেনেন। এই প্রবণতা রোধে কঠোর নিয়ম ও নিয়মিত নিরীক্ষা প্রয়োজন। সম্পত্তি ঘোষণার পাশাপাশি সেগুলোর ব্যবহারের উদ্দেশ্য ও প্রকৃত মালিকানা যাচাই করতে হবে।
তৃতীয়ত, ‘ওএসডি’ (বিশেষ দায়িত্বে) অবস্থায় থাকা কর্মকর্তাদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে তাঁরা নিজেদের ‘অবসর’ ভেবে অবৈধ কাজে জড়িয়ে না পড়েন। অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। এমন অবস্থায় তাঁর বাসায় মাদক ও ডিজে পার্টি চলছে—এটি প্রমাণ করে, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তিনি নিজের পদ-পদবীর মর্যাদা রক্ষা করেননি। ‘ওএসডি’ মানে দায়মুক্তি নয়; বরং এটি একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, যা চলাকালীন কর্মকর্তার কার্যক্রম কঠোর নজরদারিতে রাখা উচিত।
চতুর্থত, শুধু পুলিশ নয়, সরকারের অন্যান্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এমনটি করছেন কি না, তা-ও নজরদারিতে রাখতে হবে। নইলে একজন ধরা পড়লেও দশজন একই কাজ করতেই থাকবে। আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটি পুরোনো প্রবণতা রয়েছে—কোনো ঘটনা ঘটলে কেবল নিচের স্তরের লোকদের শাস্তি দেওয়া হয়, আর ঊর্ধ্বতনরা রক্ষা পান। কিন্তু যদি প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজস্ব, পুলিশ—সব বিভাগেই এমন অবৈধ কার্যক্রম চলতে থাকে এবং কেবল একটি ঘটনা ধরা পড়ে, তবে প্রকৃত সংস্কার হবে না।
পঞ্চমত, প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে অভ্যন্তরীণ তদারকি, সম্পদ ঘোষণা ও ব্যবহারের হিসাব, এবং নিয়মিত নিরীক্ষা—এসব নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আরও সক্রিয় করতে হবে, যাতে তারা কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক নিরীক্ষার মাধ্যমে সম্পদ ও সম্পত্তির ব্যবহার যাচাই করতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি বিভাগে একটি অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কর্মকর্তারা নিজেদের সম্পদ ও কার্যক্রমের হিসাব দিতে বাধ্য থাকবেন।
ষষ্ঠত, নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন। কেবল আইন বা শাস্তির মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন একটি সংস্কৃতির পরিবর্তন—যেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিজেরাই উদাহরণ হয়ে উঠবেন, যেখানে ‘আমি জানতাম না’ বলার সুযোগ থাকবে না, যেখানে দায় এড়ানোর সংস্কৃতির অবসান হবে। এই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে প্রশিক্ষণ, সচেতনতা এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে।
সবশেষে, এই ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি দর্পণ—যেখানে প্রতিফলিত হয় দায়িত্বশীলতার অভাব, খারাপ দৃষ্টান্ত এবং পদের আড়ালে লুকানো নানা অনিয়ম। যদি আমরা এই সংস্কৃতি বদলাতে না পারি, তবে আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমে থাকবে—বাস্তবে নয়। পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় মাদক ও ডিজে পার্টি—এটি একটি সতর্কবার্তা। সময় থাকতে যদি আমরা এই সংকটের মুখোমুখি না হই, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় দৃষ্টান্তের জন্ম হবে।
একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার আইন প্রয়োগকারীরা নিজেরাই আইনের আওতায় থাকেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দায়িত্বশীলতার ঘাটতি রয়েছে এবং পদের আড়ালে অনেক কিছু এড়িয়ে যাওয়া হয়। যদি আমরা এই সংস্কৃতি বদলাতে না পারি, তবে আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমে থাকবে—বাস্তবে নয়।
পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় মাদক ও ডিজে পার্টি—এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। সময় থাকতে যদি আমরা এই সংকটের মুখোমুখি না হই, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় দৃষ্টান্তের জন্ম হবে।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিন্ট।
