ইউরোপজুড়ে আন্দোলন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

ইউরোপজুড়ে আন্দোলন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

ফন্ট সাইজ:

ইউরোপজুড়ে বিক্ষোভের আড়ালে এমন কিছু সংকেত রয়েছে, যা তরুণদের ক্ষোভ, রাষ্ট্রের দমন ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের দিকে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে। ইউরোপের দেশে দেশে সর্বসাম্প্রতিক বিক্ষোভকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা, বিচ্ছিন্ন দাঙ্গা বা তরুণদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখলে এর গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। কারণ, ফ্রান্সে শিক্ষা, সরকারি সেবা, জ্বালানি ও বাজেট নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ; স্পেনে আবাসন ও উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আন্দোলন; পর্তুগালে মূল্যস্ফীতি ও বাড়িভাড়ার প্রতিবাদ; ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ; আলবেনিয়ায় দুর্নীতি, বেকারত্ব ও শিক্ষার সংকট—এসব ঘটনাকে একত্রে পড়লে একটি বৃহত্তর চিত্র সামনে আসে, যা ইউরোপীয় শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনেকগুলো দুর্বলতাকে সামনে আনে।

ইউরোপের দেশসমূহের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলো এখন এমন এক বৈপরীত্যের মুখোমুখি, যেখানে নির্বাচন ও প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান, কিন্তু নাগরিকদের একটি বড় অংশ মনে করছে—রাষ্ট্র তাদের কথা শুনছে না, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে না এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রচলিত গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতিগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।

এই আন্দোলন তাই শুধু সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়; এটি গণতন্ত্রের কার্যকারিতা, প্রতিনিধিত্ব, সামাজিক ন্যায়, রাষ্ট্রের জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক বৈধতার পরীক্ষা। রাস্তায় নামা আন্দোলনকারী তরুণরা মূলত জানতে চাইছে: গণতন্ত্র যদি নাগরিকের জীবনমান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে তার বাস্তব মূল্য কোথায়?

এক মহাদেশ, বহু সংকট, একই ক্ষোভ
ইউরোপজুড়ে আন্দোলনের বিষয়গুলো দেশভেদে আলাদা হলেও সামাজিক অভিজ্ঞতার মধ্যে গভীর মিল রয়েছে। তরুণরা দেখতে পাচ্ছে—
উচ্চশিক্ষা শেষ করেও স্থায়ী কর্মসংস্থান নেই। ভাড়া ও বাড়ির দাম আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি। খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। সরকারি স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য সেবা দুর্বল হচ্ছে।

রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারছে না। নাগরিকদের কণ্ঠস্বর সংসদ, দল ও প্রশাসনের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাস্তায় বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। অর্থাৎ বর্তমান ক্ষোভ একক কোনো নীতির বিরুদ্ধে নয়। এটি একটি জীবন-সংকট—যেখানে তরুণরা শিক্ষা, কাজ, বাসস্থান, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত বোধ করছে।

এই অভিজ্ঞতা শ্রেণিগতও। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পরও স্বনির্ভর হতে পারছে না। নিম্নআয়ের মানুষ বাড়িভাড়া, খাদ্য ও জ্বালানির ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। শহরগুলো বিনিয়োগ, পর্যটন ও সম্পদ-সঞ্চয়ের কেন্দ্রে পরিণত হলেও সাধারণ নাগরিকের বসবাসের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। ইউরোপ নাগরিক অধিকার ও সুযোগের প্রশ্নে অনেক ক্ষেত্রেই যে পিছিয়ে যাচ্ছে, আন্দোলন তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে।

ফ্রান্স: শিক্ষা-সংকট থেকে গণতন্ত্রের পরীক্ষা
ফ্রান্সের আন্দোলনের সূচনা শিক্ষাব্যবস্থা ও সরকারি সেবার সংকটকে কেন্দ্র করে হলেও তা দ্রুত বৃহত্তর রাষ্ট্রবিরোধী ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ ক্লাস, শিক্ষকের অনুপস্থিতি, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ, অস্বচ্ছ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ব্যবস্থা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজেট-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে।

তরুণদের অভিযোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই যে তারা কেবল একটি নির্দিষ্ট সংস্কার চাইছে না; তারা রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। একটি উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যদি শিক্ষার্থীদের শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ ও মানসম্মত শিক্ষার নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তাহলে তার কল্যাণরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব—এ প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

দমন কি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে?
সরকারের কঠোর প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আংশিক বিক্ষোভ নিষিদ্ধকরণ, কিছু এলাকায় কারফিউ, গ্রেপ্তার, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান এবং অন্যান্য দমনমূলক ব্যবস্থা সরকারকে সাময়িকভাবে রাস্তার নিয়ন্ত্রণ দিতে পারে; কিন্তু রাজনৈতিক অসন্তোষের কারণ দূর করে না।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকরনু “শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে” সরকারের দৃঢ়তার কথা বলেছেন। কিন্তু গণতন্ত্রে শৃঙ্খলা কেবল রাস্তায় নীরবতা ফিরিয়ে আনার নাম নয়। প্রকৃত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয় যখন নাগরিকরা মনে করেন যে প্রতিষ্ঠানগুলো ন্যায়সংগত, জবাবদিহিমূলক এবং তাদের কথা শোনে।

যদি রাষ্ট্র বিক্ষোভকে কেবল নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে দেখে, তাহলে সামাজিক অসন্তোষকে রাজনৈতিক সংলাপের বদলে পুলিশি সমস্যায় পরিণত করা হয়। এতে দুটি বিপদ সৃষ্টি হয়:

এক) শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীরা রাষ্ট্রের প্রতি আরও অবিশ্বাসী হয়ে পড়ে। দুই) আন্দোলনের ভেতরে সহিংস অংশ শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায়।

কিন্তু একটি গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি তার বিরোধী কণ্ঠ কতটা দমন করতে পারে, তা নয়; বরং বিরোধী কণ্ঠকে কতটা নিরাপদে প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে—তাতে। তরুণ সেটাই দেখতে ও প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে আন্দোলনের মাধ্যমে।

পুলিশি সহিংসতা ও রাষ্ট্রের বৈধতা
বিক্ষোভ দমনে পুলিশি শক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার রাষ্ট্রের বৈধতাকে দুর্বল করে। বিশেষত যখন নাবালক শিক্ষার্থী আহত হয়, স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির শিকার হয় বা গণগ্রেপ্তার হয়, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা, বৈধতা এবং স্বাধীন তদন্ত অপরিহার্য।

রাষ্ট্র যদি পুলিশের আঘাত, ভুল সিদ্ধান্ত বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায় স্বীকার না করে, তাহলে নাগরিকদের কাছে একটি বার্তা যায়—আইন সবার জন্য সমান নয়। এই ধারণা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

পদত্যাগের নাটক ও রাজনৈতিক দায়
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের প্রস্তাব এবং তা গ্রহণ না করার ঘটনাটি সরকারের অভ্যন্তরীণ চাপ ও দায়বোধের সংকটকে প্রকাশ করে। কোনো মন্ত্রী যদি বলেন যে তিনি পরিস্থিতির জন্য দায়ী, কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই দায় গ্রহণ বা কার্যকরভাবে নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রশাসনিক জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে।

কারণ, গণতন্ত্রে দায়বদ্ধতা দুই ধরনের: এক) প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা। সিদ্ধান্ত, প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার জন্য কর্মকর্তার জবাবদিহি। দুই) রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা। নীতিগত ব্যর্থতার জন্য মন্ত্রী ও সরকারের জবাবদিহি।

শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ বা পদত্যাগের প্রস্তাব সমস্যার সমাধান করে না। প্রয়োজন হলো—কেন সংকট তৈরি হলো, কেন সরকার আগে সতর্ক সংকেত বুঝতে পারল না, কেন পুলিশ প্রস্তুত ছিল না, কেন তরুণদের অভিযোগ দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকল—এসব প্রশ্নের প্রকাশ্য তদন্ত ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা।

দোষারোপের রাজনীতি: বাম না ডান?
ফরাসি সরকার ও ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো বিক্ষোভের জন্য উগ্র বামপন্থী দল ও আন্দোলনকে দায়ী করছে। অন্যদিকে বামপন্থীরা সরকারের নীতি, পুলিশি দমন ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতাকে সংকটের কারণ হিসেবে তুলে ধরছে।

দোষারোপের এই রাজনীতি সাধারণত তিনটি উদ্দেশ্য পূরণ করে: এক) সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা আড়াল করা। দুই) আন্দোলনের সামাজিক কারণকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা। তিন) জনমতকে মূল দাবি থেকে সরিয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে নেওয়া।

কিন্তু তরুণদের ক্ষোভ কেবল কোনো একটি দলের সংগঠিত প্রচারের ফল নয়। রাজনৈতিক দলগুলো অবশ্যই আন্দোলনকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু তারা শূন্য থেকে অসন্তোষ তৈরি করে না। অসন্তোষের সামাজিক ভিত্তি থাকে—বেকারত্ব, আবাসন, অবমূল্যায়ন, বৈষম্য, অনিশ্চয়তা ও প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি।

এখানে মূলধারার দলগুলোর দায় হলো আন্দোলনকে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ না করে তার সামাজিক কারণ স্বীকার করা। যে দল কেবল প্রতিপক্ষকে দোষারোপ করে, কিন্তু তরুণদের বাস্তব জীবন নিয়ে কথা বলে না, সে সাময়িকভাবে রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে; দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক আস্থা হারায়।

ইউরোপের আবাসন সংকট: নাগরিকত্বের নতুন পরীক্ষা
স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালির আন্দোলনের কেন্দ্রে আবাসন সংকট রয়েছে। গত এক দশকে বাড়িভাড়া ও সম্পত্তির মূল্য ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বিনিয়োগ তহবিল, বিদেশি ক্রেতা, স্বল্পমেয়াদি পর্যটন ভাড়া এবং নগর-রূপান্তর সাধারণ মানুষের আবাসনের সুযোগ সংকুচিত করেছে।

এটি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি নাগরিকত্বের প্রশ্ন। একজন মানুষ যদি নিজের শহরে বাস করতে না পারেন, তাহলে তিনি শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিলেও সামাজিকভাবে বহিষ্কৃত হয়ে পড়েন। তরুণরা কাজের জন্য শহরে আসে, কিন্তু ভাড়া দিতে না পেরে দূরবর্তী এলাকায় যেতে বাধ্য হয়। পরিবার গঠন বিলম্বিত হয়, শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয় এবং সামাজিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়।

স্পেনে এক বৃদ্ধার উচ্ছেদ ও মৃত্যুর ঘটনা তাই একটি প্রতীকী রাজনৈতিক মুহূর্তে পরিণত হয়েছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে আবাসন বাজার যখন মুনাফা-নির্ভর হয়ে ওঠে, তখন মানুষের দীর্ঘদিনের বসবাস, সামাজিক সম্পর্ক ও বয়স—কোনোটিই বাজারের কাছে নিরাপত্তা দেয় না।

গণতন্ত্র যদি নাগরিককে ভোট দেওয়ার অধিকার দেয়, কিন্তু নিরাপদে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত না করে, তাহলে রাজনৈতিক সমতা ও সামাজিক অসমতার মধ্যে একটি বিপজ্জনক ব্যবধান তৈরি হয়।

পর্তুগাল ও ইতালি: কাজ আছে, কিন্তু জীবন নেই
পর্তুগাল ও ইতালির বিক্ষোভে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি ও ভাড়ার প্রশ্ন সামনে এসেছে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও অনিশ্চিত কাজ, কম আয় ও বাড়তি ব্যয়ের চাপ দেখা যাচ্ছে। একটি পিএইচডি অর্জনের পরও যদি একজন তরুণ গবেষক নিজের বাসাভাড়া বহন করতে না পারেন, তাহলে সমাজের উন্নয়ন মডেল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এই সংকটকে বলা যায় প্রত্যাশা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব। তরুণদের বলা হয়েছে—শিক্ষা গ্রহণ করো, দক্ষ হও, কঠোর পরিশ্রম করো, ভবিষ্যৎ তৈরি করো। কিন্তু শিক্ষার পরও যদি কর্মসংস্থান অনিশ্চিত থাকে এবং আয় বাড়ির ভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে না পারে, তাহলে প্রচলিত সামাজিক চুক্তি ভেঙে যায়।

ইতালিতে বিক্ষোভের সহিংসতা নিন্দনীয়। দোকানপাটে ভাঙচুর, লুটপাট এবং পুলিশের ওপর আক্রমণ কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বৈধতা বাড়ায় না। একইভাবে সরকারেরও বোঝা দরকার—সহিংসতার নিন্দা করলেই জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি ও আয়ের সংকটের উত্তর দেওয়া হয় না।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে হবে: এক) সহিংসতা ও সম্পত্তি ধ্বংস প্রতিরোধ করা। দুই) সহিংসতার পেছনে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষোভের সমাধান করা।

শুধু প্রথম কাজটি করলে রাষ্ট্র কঠোর হতে পারে, কিন্তু ন্যায়সংগত হয় না।

আলবেনিয়া: গণতন্ত্রের ভেতরে দুর্নীতির ক্ষত
আলবেনিয়ায় শিক্ষার মান, কর্মসংস্থানের অভাব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ইউরোপীয় গণতন্ত্রের আরেকটি মাত্রা সামনে আনে। এখানে সমস্যা শুধু মূল্যবৃদ্ধি বা আবাসন নয়; রাষ্ট্রের সম্পদ ও সিদ্ধান্ত কার স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে—এ প্রশ্ন কেন্দ্রে রয়েছে।

বিলাসবহুল রিসর্ট প্রকল্পের সঙ্গে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম যুক্ত হওয়ায় সাধারণ নাগরিকের সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে। কোনো প্রকল্প আইনসম্মত হলেও যদি জনগণের কাছে তা অস্বচ্ছ, পক্ষপাতদুষ্ট বা ভূমি-বঞ্চনার সঙ্গে যুক্ত বলে মনে হয়, তাহলে তার গণতান্ত্রিক বৈধতা দুর্বল হয়।

গণতন্ত্রে উন্নয়ন প্রকল্পের বৈধতা শুধু বিনিয়োগের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। প্রয়োজন: ভূমি অধিগ্রহণে স্বচ্ছতা। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সম্মতি ও ক্ষতিপূরণ। পরিবেশগত মূল্যায়ন। স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ। স্বাধীন বিচারিক ও সংসদীয় নজরদারি। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ।

এসব না থাকলে উন্নয়ন মানুষের চোখে উন্নতি নয়, বরং রাজনৈতিক দখলদারিত্ব হিসেবে প্রতিভাত হতে পারে।

ইউরোপীয় গণতন্ত্রের পাঁচটি প্রধান সংকেত

প্রথম সংকেত: প্রতিনিধিত্বের সংকট। তরুণরা মনে করছে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ভাষা, জীবন ও ভবিষ্যৎ বুঝতে পারছে না। দলগুলো ভোটের সময় তরুণদের গুরুত্ব দিলেও নীতি প্রণয়নে তাদের অভিজ্ঞতা অগ্রাধিকার পায় না। এই প্রতিনিধিত্বের সংকট নির্বাচনী অংশগ্রহণের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রভাবিত করছে। তরুণরা দলীয় সদস্যপদ বা প্রচলিত সংগঠনের বদলে আন্দোলন, অনলাইন নেটওয়ার্ক, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও রাস্তার রাজনীতিতে নিজেদের প্রকাশ করছে।

দ্বিতীয় সংকেত: গণতন্ত্রের সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে। গণতন্ত্র কেবল সংবিধান, সংসদ ও নির্বাচন দিয়ে টিকে থাকে না। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিশ্বাস। যখন তরুণরা উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের পরও নিরাপদ জীবন পায় না, তখন গণতন্ত্রের সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হয়। মানুষ তখন মনে করতে পারে—রাজনৈতিক স্বাধীনতা আছে, কিন্তু জীবন পরিচালনার বাস্তব স্বাধীনতা নেই।

তৃতীয় সংকেত: জরুরি শাসনের স্বাভাবিকীকরণ। বিক্ষোভের জবাবে আংশিক নিষেধাজ্ঞা, কারফিউ, গণগ্রেপ্তার ও শক্তি প্রয়োগ ব্যবহৃত হলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে জরুরি ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক প্রশাসনিক পদ্ধতিতে পরিণত করতে পারে। জরুরি ক্ষমতা কখনো কখনো প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু তা হতে হবে: আইনসম্মত। সময়সীমাবদ্ধ। প্রয়োজনীয়। আনুপাতিক। বিচারিক পর্যালোচনাযোগ্য। সংসদীয় ও জনসম্মুখে জবাবদিহিমূলক।

চতুর্থ সংকেত: চরমপন্থার জন্য রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। মূলধারার দলগুলো যখন তরুণদের বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে ব্যর্থ হয়, তখন চরম ডান ও চরম বাম উভয় ধারাই সুযোগ পায়। চরম ডানপন্থীরা অভিবাসন, সীমান্ত, জাতীয় পরিচয় ও আইনশৃঙ্খলাকে প্রধান ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করে। চরম বামপন্থীরা বৈষম্য, পুঁজিবাদ, পুলিশি দমন ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে সামনে আনে। এই দুই মেরুর উত্থান গণতন্ত্রের জন্য দ্বিমুখী ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ ক্ষুব্ধ নাগরিকরা দ্রুত, সরল ও কঠোর সমাধানের প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট হতে পারেন। কিন্তু জটিল সামাজিক সমস্যার জন্য সরল শত্রু-চিহ্নিতকরণ দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদকে দুর্বল করে।

পঞ্চম সংকেত: রাস্তাই নতুন গণতান্ত্রিক মঞ্চ। সংসদ, দল ও নির্বাচনের পাশাপাশি রাস্তা এখন রাজনৈতিক বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এর অর্থ এই নয় যে নির্বাচন অপ্রয়োজনীয়। বরং এর অর্থ হলো নির্বাচনী গণতন্ত্রের সঙ্গে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিবাদী গণতন্ত্রের সংযোগ দুর্বল হয়েছে। যদি সংসদ নাগরিকদের কথা যথেষ্ট না শোনে, তাহলে রাস্তাই রাজনৈতিক দাবি প্রকাশের প্রধান স্থান হয়। কিন্তু রাস্তায় রাজনীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সংঘর্ষ বাড়তে পারে। তাই প্রয়োজন হলো—প্রতিবাদকে অপরাধ না বানিয়ে তাকে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপে রূপান্তর করা।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বহিরাগত হস্তক্ষেপ
ফ্রান্সের আন্দোলন নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য দেখায় যে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট দ্রুত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ হয়ে উঠতে পারে। অভিবাসীদের দোষারোপ করে সংকট ব্যাখ্যা করা সহজ; কিন্তু তার জন্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।

প্রমাণ ছাড়া অভিবাসী, সংখ্যালঘু বা বিদেশিদের দায়ী করা সামাজিক বিভাজন বাড়ায় এবং প্রকৃত কারণকে আড়াল করে। বেকারত্ব, আবাসন সংকট, মূল্যস্ফীতি বা সরকারি সেবার ব্যর্থতা যদি কাঠামোগত কারণে তৈরি হয়, তাহলে তা অভিবাসীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ছাড়া কিছু নয়।

এ ধরনের বক্তব্য গণতন্ত্রকে দুটি পথে ক্ষতিগ্রস্ত করে: এক) নাগরিক ক্ষোভকে বাস্তব নীতি সংস্কার থেকে দূরে সরিয়ে পরিচয়-রাজনীতিতে নিয়ে যায়। দুই) সংখ্যালঘু ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষকে স্বাভাবিক করে তোলে।

গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক বিতর্ক, আতঙ্ক-নির্ভর প্রচার নয়।

বাংলাদেশ ও ইউরোপ: তুলনার সতর্কতা
বাংলাদেশ ও ইউরোপের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতি এক নয়। তাই ইউরোপীয় বিক্ষোভকে সরলভাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি বলা ঠিক হবে না। কিন্তু কিছু সাধারণ শিক্ষা অবশ্যই আছে।

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যেও বেকারত্ব, শিক্ষার মান, দক্ষতার ঘাটতি, বাসস্থানের ব্যয়, আয়ের অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন রয়েছে। যদি এসব সমস্যা দীর্ঘদিন উপেক্ষিত হয়, তাহলে ক্ষোভ বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পেতে পারে। যেমনটি হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। এজন্য বাংলাদেশের সামনে পাঁচটি শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে:

১. তরুণদের শুধু ভোটার নয়, নীতিনির্ধারণের অংশীদার করতে হবে। যুবকদের নিয়ে নীতি গ্রহণ করলেই হবে না; তাদের সরাসরি নীতি আলোচনায় যুক্ত করতে হবে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন ও নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তরুণদের অংশগ্রহণ জরুরি।

২. বিক্ষোভকে কেবল আইনশৃঙ্খলা হিসেবে দেখা যাবে না। বিক্ষোভে সহিংসতা থাকলে আইন প্রয়োগ করা অবশ্যই দরকার। কিন্তু সব আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র, শত্রুতা বা রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে দেখলে মূল সামাজিক কারণ অমীমাংসিত থেকে যায়।

৩. পুলিশি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তি প্রয়োগের স্বাধীন তদন্ত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের বৈধতা কমায়।

৪. শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু ডিগ্রি প্রদান নয়, মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষতা, শিল্প-সংযোগ, উদ্যোক্তা সহায়তা ও নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

৫. আবাসনকে সামাজিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নগর উন্নয়ন যদি কেবল জমি, বাণিজ্যিক প্রকল্প ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক হয়, তবে সাধারণ মানুষের বসবাসের অধিকার সংকুচিত হবে। দ্রব্যমূল্য, বাজার পরিস্থিতি, ভাড়ার উল্লম্ফন, নিম্নআয়ের আবাসন, গণপরিবহন ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা জরুরি।

গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ রাস্তায় নির্ধারিত হচ্ছে
ইউরোপজুড়ে তরুণদের আন্দোলন গণতন্ত্রের পতনের সরল প্রমাণ নয়। বরং এটি গণতন্ত্রের ভেতরে জমে থাকা গভীর অসন্তোষের প্রকাশ। মানুষ এখনও রাজনীতিতে বিশ্বাস করতে চায় বলেই রাস্তায় নামছে। তারা রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করছে না; বরং রাষ্ট্রকে তার প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান জানাচ্ছে।

কিন্তু সেই আহ্বানের জবাব যদি হয় শুধু গ্রেপ্তার, কারফিউ, পুলিশি দমন ও রাজনৈতিক দোষারোপ, তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও কমবে। তরুণরা তখন সংসদ ও দল থেকে দূরে সরে চরমপন্থী শক্তি, ষড়যন্ত্রমূলক বয়ান বা রাজনৈতিক নৈরাশ্যের দিকে ঝুঁকতে পারে।

ইউরোপের বর্তমান আন্দোলন তাই তিনটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: এক) গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; সামাজিক ন্যায় ও নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও। দুই) আইনশৃঙ্খলা রক্ষা জরুরি, কিন্তু দমন কখনো রাজনৈতিক সংলাপের বিকল্প নয়। তিন) তরুণদের ক্ষোভকে প্রতিনিধিত্ব, সংস্কার ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে গ্রহণ না করলে চরমপন্থা শক্তিশালী হবে।

গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা তখনই হয়, যখন রাষ্ট্র তার সমর্থকদের নয়, অসন্তুষ্ট নাগরিকদেরও কথা শোনে। ইউরোপের রাস্তায় আজ যে প্রশ্ন উঠেছে, তা শুধু ইউরোপের নয়, সারা বিশ্বের সংক্ষুব্ধ মানুষের দাবি-দাওয়ার প্রতিধ্বনি: রাষ্ট্র কি নাগরিকদের শাসন করবে, নাকি নাগরিকদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে পুনর্গঠন করবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই ইউরোপের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এবং বিশ্বব্যাপী গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে।

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।