বাংলাদেশের জন্য কি খুলছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার?

সুইজারল্যান্ডের চিকিৎসক সংকট

বাংলাদেশের জন্য কি খুলছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার?

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বের অন্যতম উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত সুইজারল্যান্ড আজ একটি নীতিগত বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দেশটি ক্রমবর্ধমান চিকিৎসক সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে কঠোর ভর্তি ও বাছাই ব্যবস্থার কারণে প্রতিবছর শত শত সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী মেডিকেল শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ছে। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে: চিকিৎসকের অভাব পূরণে দেশটিকে ক্রমশ বিদেশি ডাক্তারদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অবসর গ্রহণের সময় ঘনিয়ে আসায় সুইজারল্যান্ডে চিকিৎসকের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে কর্মরত চিকিৎসকদের ৪৩ শতাংশ বিদেশে প্রশিক্ষিত।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশটির চিকিৎসক সমাজ দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে। গড়ে একজন সুইস চিকিৎসকের বয়স এখন প্রায় ৫০ বছর, এবং প্রতি চারজন চিকিৎসকের একজনের বয়স ৬০ বছরের বেশি। অর্থাৎ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অবসরে যাওয়ার একটি বড় ঢেউ দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও বিপর্যস্ত করার আশঙ্কা রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন চিকিৎসকের এত চাহিদা, তখন কেন পর্যাপ্ত নতুন চিকিৎসক তৈরি করা যাচ্ছে না?

সমস্যার মূল রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোয়। সুইজারল্যান্ডের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিকেলে ভর্তি ও প্রথম বর্ষের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। অনেক শিক্ষার্থী প্রথম বছরেই বাদ পড়ে যায়, অনেকে বিষয় পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়, আবার অনেকে বিদেশে পাড়ি জমায়। ফলে দেশটির নিজস্ব মানবসম্পদ তৈরির সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম রয়ে গেছে। একই সময়ে জনসংখ্যার গড় আয়ু বাড়ছে, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবার চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বা জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) ব্যবস্থা। সুইস মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক চিকিৎসকের ঘাটতি এতটাই প্রকট যে অনেক ক্লিনিক নতুন রোগী গ্রহণই করতে পারছে না। অথচ স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি শক্তিশালী রাখতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেয়ে দক্ষ পারিবারিক চিকিৎসকের প্রয়োজন বেশি।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রতি বছর সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে হাজার হাজার চিকিৎসক তৈরি করছে। দেশের চিকিৎসা শিক্ষা দক্ষিণ এশিয়ায় ইতোমধ্যে একটি শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আমাদের অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। ইউরোপের স্বাস্থ্যখাতে যে জনবল সংকট তৈরি হচ্ছে, তা যদি বাংলাদেশ দূরদর্শিতার সঙ্গে মূল্যায়ন করে, তাহলে আগামী দশকে দক্ষ চিকিৎসক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা অসম্ভব নয়।

তবে শুধু এমবিবিএস ডিগ্রি থাকলেই চলবে না। সুইজারল্যান্ডে কাজ করতে হলে জার্মান, ফরাসি বা ইতালীয় ভাষায় দক্ষতা, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, গবেষণামুখী শিক্ষা এবং কঠোর লাইসেন্সিং মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। সরকার, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলো যৌথভাবে পরিকল্পনা নিলে এ ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

একই সঙ্গে আমাদের সতর্কও থাকতে হবে। বাংলাদেশ নিজেও চিকিৎসক সংকটমুক্ত নয়। রাজধানী ও বড় শহরগুলোর তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় এখনো চিকিৎসকের ঘাটতি প্রকট। তাই বিদেশে চিকিৎসক পাঠানোর নীতি এমন হতে হবে, যাতে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। চিকিৎসা শিক্ষা সম্প্রসারণ, বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে একই সঙ্গে দেশীয় চাহিদা ও আন্তর্জাতিক সুযোগ উভয়কেই সামাল দিতে হবে।

সুইজারল্যান্ডের বর্তমান বাস্তবতা একটি বড় শিক্ষা দেয়: শুধু উন্নত অর্থনীতি থাকলেই স্বাস্থ্যখাতের মানবসম্পদ সংকট সমাধান হয় না। পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি জনশক্তি উন্নয়নই এর একমাত্র পথ। আর সেই সংকট যখন ইউরোপের দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতও।

বিশ্ব যখন দক্ষ চিকিৎসক খুঁজছে, তখন বাংলাদেশ কি নিজেকে সেই বৈশ্বিক চাহিদার নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে? সময়ই তার উত্তর দেবে।

লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখেন।
ই-মেইল: [email protected]