কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। সেচের বিদ্যুৎ অনিশ্চিত হলে কৃষকের ব্যয় বাড়ে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ গেলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে জেনারেটর চালাতে হয়, যার খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হয়। বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট এভাবেই মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। এর স্থায়ী সমাধানে নির্ভরযোগ্য সরবরাহের পাশাপাশি প্রয়োজন অপচয় নিয়ন্ত্রণ, দেশীয় সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ। জ্বালানি নিরাপত্তার অর্থ হলো মানুষ ও উৎপাদন খাতের জন্য সহনীয় ব্যয়ে নিয়মিত শক্তির ব্যবস্থা করা। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ সেই ব্যবস্থার একটি অংশ। জ্বালানির জোগান, সঞ্চালন লাইন, আর্থিক সক্ষমতা ও দক্ষ পরিচালনা একসঙ্গে নিশ্চিত না হলে স্থাপিত ক্ষমতা বাড়িয়েও সংকট কাটে না। এখন নীতির সাফল্য মাপতে হবে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয় এবং গ্রাহকের সেবাপ্রাপ্তি দিয়ে।
সংকটের মূলে যে অসংগতি
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের জুলাই ২০২৬-এর জ্বালানিভিত্তিক হিসাবে তালিকাভুক্ত স্থাপিত ক্ষমতা ২৭ হাজার ৫১৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ক্ষমতার অংশ প্রায় ৪৪ শতাংশ, কয়লার ২৪ শতাংশ এবং ফার্নেস অয়েলের ২৩ শতাংশ। একই তালিকায় সৌরবিদ্যুৎ ৫৩৫, বায়ুবিদ্যুৎ ৬০ এবং জলবিদ্যুৎ ২৩০ মেগাওয়াট। এটি বোর্ডের সংশ্লিষ্ট তালিকার হিসাব; দেশের সব ছাদভিত্তিক ও অফগ্রিড সৌরব্যবস্থা এতে অন্তর্ভুক্ত ধরে নেওয়া যাবে না। তবে এই তথ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় জ্বালানির বৈচিত্র্য বাড়ানোর প্রয়োজন স্পষ্ট করে। দেশীয় গ্যাসের সরবরাহে সীমাবদ্ধতা থাকলে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর চাপ বাড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি কিংবা ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটলে একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে বেশি অর্থ লাগে। পরিবহন ও বিমার খরচও সেই ব্যয়ে যুক্ত হয়। আমদানির বিল বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ সচল রাখা এবং সরকারি ভর্তুকি সামলানো একসঙ্গে কঠিন হয়ে পড়ে।
সংকটের সাম্প্রতিক মাত্রা বোঝা যায় ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর হিসাবে। পেট্রোবাংলার দৈনিক তথ্য উদ্ধৃত করে ইউএনবি জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ ছিল দৈনিক ২ হাজার ৬১৯ মিলিয়ন ঘনফুট; দেশীয় ক্ষেত্র থেকে ১ হাজার ৬০৩ এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ১ হাজার ১৬ মিলিয়ন ঘনফুট। আনুমানিক চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ধরলে ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ১৮১ থেকে ১ হাজার ৩৮১ মিলিয়ন ঘনফুট, অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৩১-৩৫ শতাংশ। এটি নির্দিষ্ট দিনের চিত্র; বার্ষিক গড় নয়।
আমদানিনির্ভরতার প্রবণতাও উদ্বেগজনক। আইইইএফএর মে ২০২৬-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রাথমিক জ্বালানিতে আমদানির অংশ ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। একই গবেষণায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধির কথা এসেছে; গ্রিডভিত্তিক উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ছিল মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। স্থাপিত ক্ষমতার অংশ ও প্রকৃত উৎপাদনের অংশ পৃথক সূচক, তাই এদের সরাসরি তুলনা করা যাবে না।
শিল্পে এর প্রভাবও দৃশ্যমান। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর রয়টার্স প্রতিবেদনে বিকেএমইএর জরিপ উদ্ধৃত করে বলা হয়, জরিপভুক্ত নিট পোশাক কারখানার ৫৫ শতাংশ আগস্টের শেষ দিক থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ক্রয়াদেশ বাতিল বা কমার অভিজ্ঞতা জানিয়েছে; ৭৮ শতাংশ আংশিক উৎপাদন বন্ধ করেছে। এই হার জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের, গোটা শিল্পের নয়। একই প্রতিবেদনে এশিয়ার স্পট এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন বিটিইউতে প্রায় ৩০ ডলারে ওঠার তথ্য আসে।
অন্যদিকে, কেন্দ্র স্থাপনের উবপরংরড়হং-এর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ ও বিদ্যুতের চাহিদার বাস্তবসম্মত সমন্বয় প্রয়োজন। কিছু চুক্তিতে কেন্দ্রের উৎপাদন কম হলেও সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য অর্থ দিতে হয়। প্রতিটি চুক্তির দায়, ব্যবহারযোগ্য ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা ছাড়া নতুন কেন্দ্র অনুমোদন করলে আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। চুক্তির শর্ত প্রকাশ এবং আইনসম্মত পুনর্বিন্যাস তাই সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আর্থিক চাপের পেছনে কেন্দ্র ব্যবহারের দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। আইইইএফএর মে ২০২৬-এর বিশ্লেষণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রিজার্ভ মার্জিন ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ বলা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ২৫ শতাংশের কম লোড ফ্যাক্টরে চালিত গ্যাসকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১৬ দশমিক ৮৫ টাকা প্রতি ইউনিট, যেখানে প্রায় ৭৫ শতাংশ লোড ফ্যাক্টরে তা প্রায় ৬ টাকা। তাই জ্বালানি বরাদ্দে দক্ষ কেন্দ্রকে অগ্রাধিকার এবং অপ্রয়োজনীয় নতুন ক্ষমতা সীমিত করা ব্যয় কমানোর কার্যকর পথ হতে পারে। সঞ্চালন ও বিতরণে কারিগরি ক্ষতি, অবৈধ সংযোগ, ত্রুটিপূর্ণ মিটার এবং বিল আদায়ের দুর্বলতাও ব্যয় বাড়ায়। তবে সব সিস্টেম লসকে চুরি বলা সঠিক নয়। কোন ক্ষতি প্রযুক্তিগত এবং কোনটি অনিয়মজনিত, তা আলাদা করে নিরীক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি মজুতদারি ও অবৈধ বিক্রি ঠেকাতে প্রকৃত ব্যবসায়িক মজুত এবং বাজারে সংকট সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রাখা মজুতের পার্থক্য নির্ণয় জরুরি।
প্রথম নব্বই দিনে সরবরাহে আস্থা ফেরানো
তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের জন্য বিদ্যমান সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে একটি সময়সীমাবদ্ধ সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ, বিপিসি, পেট্রোবাংলা, বিতরণ প্রতিষ্ঠান এবং জেলা প্রশাসন এতে কাজ করবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসির স্বাধীন ভূমিকা বজায় রাখতে হবে। নতুন স্থায়ী দপ্তরের ব্যয় বাড়ানোর আগে এই সমন্বয় কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
প্রথম কাজ হবে ডিপো ও বিক্রয়কেন্দ্রের মজুত, সরবরাহ এবং বিক্রির হিসাব নিয়মিত মিলিয়ে দেখা। জনসাধারণের জন্য সরবরাহ পরিস্থিতির নির্ভরযোগ্য সারসংক্ষেপ প্রকাশ করতে হবে, যাতে গুজব থেকে আতঙ্কে জ্বালানি কেনার প্রবণতা কমে। পাম্পে মূল্যতালিকা ও রসিদ বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করা এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে তথ্যের নিরাপত্তা ও দুর্বল ইন্টারনেট এলাকায় বিকল্প ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
এলএনজি সরবরাহে টার্মিনাল বিকল হওয়া ও প্রতিকূল আবহাওয়ার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের মজুত, নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং বিকল্প সরবরাহ পরিকল্পনা প্রয়োজন। দর ও উৎসের বৈচিত্র্য রেখে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও স্পট ক্রয়ের ভারসাম্য করতে হবে। এতে সাময়িক বিঘ্নের প্রভাব কমানো যাবে; পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও চাহিদা সাশ্রয় দীর্ঘমেয়াদে আমদানির চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
সরবরাহ ঘাটতির সময় সীমিত মেয়াদে ক্রয় নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কৃষি, পণ্য পরিবহন, হাসপাতাল ও জরুরি সেবার প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অনিয়মের শাস্তি বিদ্যমান আইন ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দিতে হবে। নির্বিচারে সরবরাহ বন্ধ করলে সাধারণ গ্রাহক ও উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়; অভিযানের লক্ষ্য হওয়া উচিত অপরাধী এবং অনিয়মের উৎস। উচ্চ ক্ষতির গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিতরণ এলাকায় ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা শুরু করা দরকার। মিটার বদল, লিকেজ মেরামত, অবৈধ সংযোগ অপসারণ এবং বিল আদায়কে একই কর্মসূচিতে আনতে হবে। প্রথম নব্বই দিনে কোথায় কত ক্ষতি শনাক্ত হলো এবং তার কতটা কমানো গেল, তার সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করলে জনগণ বাস্তব অগ্রগতি দেখতে পাবে।
সাশ্রয়কে উৎপাদনের অংশ করা
বিদ্যুতের একটি ইউনিট অপচয় রোধ মানে সেই ইউনিট উৎপাদনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও ব্যয় সাশ্রয়। সরকারি ভবন, বিপণিবিতান ও শিল্পকারখানায় দক্ষ আলো, মোটর, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ দিয়ে কাজ শুরু করা যায়। শিল্পে বয়লার ও বাষ্প ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং বর্জ্যতাপ পুনর্ব্যবহারেও গুরুত্ব দিতে হবে। সাশ্রয়ের ফল মাপতে উৎপাদনের প্রতি একক পণ্যে কত শক্তি লাগছে, সেই হিসাব রাখতে হবে। পিক আওয়ারে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমাতে গ্রাহককে তথ্য ও উপযুক্ত প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। দোকান বা অফিসের সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হলে প্রকৃত সাশ্রয়, কর্মসংস্থান ও ব্যবসার ওপর প্রভাব পর্যালোচনা করতে হবে। নিম্ন আয়ের পরিবারের ন্যূনতম ব্যবহার এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে মূল্য সংস্কার করতে হবে। অপচয় ও অনিয়মের বোঝা গ্রাহকের ওপর চাপালে সংস্কারের প্রতি আস্থা নষ্ট হবে। সাশ্রয়ের লক্ষ্য পরিমাপযোগ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো সময়ে চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াট হলে চাহিদা ব্যবস্থাপনায় ৫ শতাংশ কমানো মানে ৭৫০ মেগাওয়াট চাপ হ্রাস। এটি পরিকল্পনার উদাহরণ, অর্জিত সাশ্রয়ের দাবি নয়। স্বেচ্ছায় শিল্পের কাজের সময় সমন্বয় ও উপযুক্ত সময়ভিত্তিক মূল্যপ্রণোদনা প্রয়োগ করে ব্যয়বহুল পিক উৎপাদন কমানো সম্ভব কি না, পরীক্ষামূলকভাবে মাপতে হবে।
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিল্পকারখানা, গুদাম, সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের উপযুক্ত ছাদ অগ্রাধিকার পেতে পারে। কৃষিজমির ওপর চাপ কমিয়ে দিনের চাহিদার একটি অংশ মেটানোর সুযোগ রয়েছে এখানে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বাধ্যতামূলক করার আগে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, ছায়া, ছাদের ব্যবহার এবং গ্রিডে সংযোগের সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। নেট মিটারিংয়ে অনুমোদনের সময় কমানো, মানসম্মত যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করা এবং বিক্রয়োত্তর সেবা গড়ে তোলা জরুরি। ছোট উদ্যোক্তার জন্য সহজ অর্থায়ন এবং তৃতীয় পক্ষের বিনিয়োগে বিদ্যুৎ কেনার স্বচ্ছ চুক্তি থাকলে প্রাথমিক খরচের বাধা কমবে।
সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সময় ও আবহাওয়াভেদে বদলায়। তাই সন্ধ্যার চাহিদা, গ্রিডের ভারসাম্য ও প্রয়োজনীয় ব্যাকআপের পরিকল্পনা ছাড়া শুধু প্যানেল বসালেই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত হবে না। যেখানে অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক, সেখানে ব্যাটারি ও চাহিদা ব্যবস্থাপনা যুক্ত করতে হবে। একইভাবে উপকূলীয় বায়ুবিদ্যুতের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বাতাসের তথ্য ও ঝড়সহনশীল নকশার ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা উচিত। কৃষিতে সৌরসেচের সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনাও যুক্ত করতে হবে। সমবায় বা সেবাভিত্তিক ব্যবস্থায় কৃষক পাম্প কেনার বদলে সেচসেবা কিনতে পারেন। মৌসুমের বাইরে গ্রিডে বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ প্রকল্পের আয় বাড়াতে পারে। তবে সস্তা শক্তির কারণে ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলন ঠেকাতে মিটার, সেচের সময়সূচি ও স্থানীয় পানির প্রাপ্যতার সীমা রাখতে হবে। এতে জ্বালানি সাশ্রয়ের সুফল কৃষি ও পানিসম্পদ উভয় ক্ষেত্রে স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
বর্জ্য ও জলবিদ্যুতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা
পৌরবর্জ্য, গোবর ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। ভেজা জৈববর্জ্য ও গোবর থেকে বায়োগ্যাস এবং প্রক্রিয়াজাত অবশিষ্টাংশ থেকে জৈবসার উৎপাদন স্থানীয়ভাবে উপযোগী হতে পারে। তবে সব বর্জ্য একই প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা যায় না। পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ আগে আলাদা করতে হবে; কৃষিজ অবশিষ্টাংশের পশুখাদ্য ও মাটির উর্বরতায় ভূমিকা বিবেচনা করতে হবে।
প্রথমেই সব জেলায় একই আকারের কেন্দ্র স্থাপনের বদলে নির্বাচিত কয়েকটি এলাকায় পরীক্ষামূলক প্রকল্প নেওয়া যুক্তিসংগত। বর্জ্য সংগ্রহ, উৎসে পৃথকীকরণ, পরিবহন ব্যয়, নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ ও সারের বাজার যাচাই করতে হবে। প্রকল্পের প্রকৃত খরচ ও ফল প্রকাশের পর সফল মডেল সম্প্রসারণ করা যাবে।
কাপ্তাইয়ের ২ ৩০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন ও পরিচালনার উন্নতি অগ্রাধিকার পেতে পারে। কিন্তু উৎপাদন পানির প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল। বড় সম্প্রসারণের লক্ষ্য ঘোষণার আগে জলপ্রবাহ, পরিবেশ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও জীবিকার প্রভাব নিয়ে স্বাধীন সমীক্ষা প্রয়োজন। নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ কেনার সুযোগও মূল্য, মৌসুমি সরবরাহ, সঞ্চালন পথ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সম্মতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।
রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও অর্থায়ন
পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সঙ্গে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা যুক্ত। তবে ইউরোপীয় কমিশনের বর্তমান তালিকায় কার্বন সীমান্ত সমন্বয় ব্যবস্থা বা সিবিএএম সিমেন্ট, লোহা ও ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সার, বিদ্যুৎ এবং হাইড্রোজেনের নির্দিষ্ট পণ্যে প্রযোজ্য। তৈরি পোশাক এই তালিকায় নেই। ফলে পোশাক রপ্তানিতে নির্দিষ্ট সিবিএএম কর আরোপের পূর্বাভাসকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না। তবু কারখানার শক্তি ব্যবহার ও নির্গমনের নির্ভরযোগ্য হিসাব রাখা এবং পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে উৎপাদন দক্ষতা বাড়তে পারে এবং ক্রেতার পরিবেশসংক্রান্ত শর্ত পূরণ সহজ হয়। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিতে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য, বিদ্যুতের উৎস যাচাই এবং গ্রিড ব্যবহারের স্পষ্ট নিয়ম রাখতে হবে।
অর্থায়নে উন্নয়ন সহযোগীর স্বল্পসুদের ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ, সবুজ বন্ড এবং উপযুক্ত সম্পদভিত্তিক সবুজ সুকুক ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রতিটি প্রকল্পে অর্থের ব্যবহার, আয়, ঝুঁকি ও পরিবেশগত ফলের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। সামাজিক ওয়াকফের অর্থে মাদ্রাসা, বিদ্যালয় ও দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্রে সৌরব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগও বিবেচনা করা যায়, যদি ওয়াকফের শর্ত ও সুশাসন নিশ্চিত থাকে।
জ্বালানি আমদানিতে নতুন কর বসিয়ে তহবিল গঠনের আগে মূল্যস্ফীতি ও শিল্পের ব্যয়ে তার প্রভাব পরীক্ষা করা দরকার। স্বচ্ছ ব্যয় পর্যালোচনায় পাওয়া সাশ্রয়ের একটি অংশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য পথ হতে পারে। বিনিয়োগের টাকা এবং ভবিষ্যতের সাশ্রয় একই সময়ে আসে না; তাই প্রতিটি প্রকল্পের নগদ প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার দায় হিসাব করতে হবে।
সমন্বিত সংস্কারের সম্ভাব্য সুফলের একটি পরিমাপ রয়েছে আইইইএফএর ডিসেম্বর ২০২৪-এর গবেষণায়। শিল্পের ক্যাপ্টিভ উৎপাদননির্ভর চাহিদার অর্ধেক নির্ভরযোগ্য গ্রিডে আনা, ৩ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য ক্ষমতা যোগ, সঞ্চালন ও বিতরণ ক্ষতি ৮ শতাংশে নামানো এবং লোডশেডিংকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মাত্রার ৫ শতাংশে সীমিত করার সম্মিলিত দৃশ্যপটে বছরে প্রায় ১৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি কমানোর সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। এটি শর্তসাপেক্ষ গবেষণা-অনুমান। বর্তমান দাম, চাহিদা ও বিনিয়োগ ব্যয় দিয়ে তা পুনর্মূল্যায়ন করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা দরকার।
বাস্তবায়নের দায় নির্দিষ্ট হোক
প্রথম তিন মাসে সরবরাহের তথ্য, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং উচ্চ ক্ষতির এলাকায় নিরীক্ষা দৃশ্যমান করতে হবে। পরবর্তী এক বছরে উপযুক্ত সরকারি ও শিল্পভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, দক্ষ যন্ত্রপাতি এবং নির্বাচিত বর্জ্যভিত্তিক প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তিন থেকে পাঁচ বছরে গ্রিড উন্নয়ন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য ও নবায়নযোগ্য উৎপাদনকে সমন্বিত পরিকল্পনায় আনতে হবে। প্রতিটি কর্মসূচির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, বাজেট, সময়সীমা এবং ফল মাপার সূচক প্রকাশ করা প্রয়োজন। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে পরিবেশগত সুরক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনায় অকার্যকর প্রকল্প সংশোধন কিংবা বন্ধ করার সুযোগ রাখতে হবে।
সাফল্যের হিসাবে অন্তত পাঁচটি সূচক নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত: গ্যাসের ঘাটতি, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়, প্রতি ইউনিটের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়, সিস্টেম লস এবং নবায়নযোগ্য উৎসের প্রকৃত উৎপাদন। প্রথমে ভিত্তিবছরের তথ্য নির্ধারণ করে ত্রৈমাসিক অগ্রগতি দেখাতে হবে। কোনো প্রকল্পে সাশ্রয় বাড়লেও সেবার মান বা পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার নকশা সংশোধন প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত নির্ভরযোগ্য ও সহনীয় ব্যয়ের সেবা। কৃষক যেন সময়মতো সেচ দিতে পারেন, উদ্যোক্তা যেন উৎপাদনের খরচ অনুমান করতে পারেন এবং পরিবার যেন প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পায়। এই ফল নিশ্চিত করতে সরবরাহের স্বচ্ছতা, অপচয় রোধ ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিনিয়োগকে একই পরিকল্পনায় নিতে হবে। জ্বালানি সংকট কাটানোর অগ্রগতি তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন তার সুফল মানুষের বিল, ব্যবসার উৎপাদন এবং রাষ্ট্রের ব্যয়ে দেখা যাবে।
লেখক: ফিন্যান্স ও বিনিয়োগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক, কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব।
