জাপানে কামরুল হাসান লিপুর প্রথম একক প্রদর্শনী

জাপানে কামরুল হাসান লিপুর প্রথম একক প্রদর্শনী

ফন্ট সাইজ:

জাপানে দীর্ঘ বসবাস। কিন্তু ক্যানভাসজুড়ে এখনো বাংলাদেশ। শাপলা, নারীমুখ, শাড়ির নকশা, লাল-সবুজের পতাকা কিংবা পুরান ঢাকার ছাদে ঘুড়ি ওড়ানোর স্মৃতি—রং আর রেখায় বারবার শিকড়ের কাছে ফিরে যান চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান লিপু। তাঁর শিল্পকর্মে ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে মিশেছে বাংলার প্রকৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও মানুষের অন্তর্জগত। সেই শিল্পভাবনারই প্রতিফলন ঘটেছে জাপানের ইয়োকোহামায় তাঁর প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনীতে।

‘ডট: দ্য বিগিনিং অব এভরিথিং’ (বিন্দু থেকে সৃষ্টি) শিরোনামে ইয়োকোহামার গ্যালারি শিমিজুতে শুরু হয়েছে এই প্রদর্শনী। মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় এর উদ্বোধন হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন জাপানের মাৎসুদো সিটি কাউন্সিলর মির কাজুএ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাপানি চিত্রশিল্পী ও ইয়োকোহামা পোর্ট ইন্ডিপেনডেন্ট প্রদর্শনীর উপদেষ্টা আসানো ইয়াসুনোরি, পেপার কাটিং শিল্পী মিতা চিকাকো এবং গ্যালারি শিমিজুর প্রতিনিধি শিমিজু কাজুএ। আগামী ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ আয়োজন। এতে স্থান পেয়েছে শিল্পীর ৪১টি চিত্রকর্ম।

একটি বিন্দু থেকে রেখা, রেখা থেকে আকার—এভাবেই বিস্তৃত হয় দৃশ্যমান জগৎ। প্রদর্শনীর শিরোনামে শিল্পের সেই মৌলিক সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার কথাই তুলে ধরেছেন লিপু। শৈশবের আঁকাআঁকি থেকে দীর্ঘ শিল্পচর্চা, বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা এবং জাপানে বসবাসের অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর ক্যানভাসে তৈরি হয়েছে নিজস্ব এক চিত্রভাষা।
শিল্পীর কাজের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ নারীমুখ। শাড়ির ভাঁজ, অলংকার, খোঁপার ফুল ও চোখের অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠেছে বাংলার চেনা জীবন। তবে এসব ছবি কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়; এর মধ্যে রয়েছে নারীর আত্মমর্যাদা, সংবেদনশীলতা ও মানসিক দৃঢ়তার ইঙ্গিত। কখনো সরাসরি তাকিয়ে থাকা চোখ, কখনো নীরব কিংবা ধ্যানমগ্ন অবয়ব দর্শককে নিয়ে যায় মানুষের অন্তর্জগতের কাছে।

‘দ্য বেদে গার্ল’, ‘মাধবী’, ‘মৃণালিনী’ ও ‘বিয়ন্ড দ্য ব্লু’ শিরোনামের কাজগুলোতে নারীর অবয়ব ঘিরে শিল্পীর নানা অনুসন্ধান উঠে এসেছে। ‘দ্য শাড়ি অব স্টোরিজ’ চিত্রকর্মে নারী, ময়ূর, পাখি ও ফুলের বিন্যাসে শাড়ি হয়ে উঠেছে স্মৃতি ও গল্পের বাহন। লোকজ অলংকরণ এবং রিকশাচিত্রের বর্ণিলতার অনুষঙ্গও নিজস্ব রীতিতে ব্যবহার করেছেন তিনি।
শাপলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্পীর শৈশবের স্মৃতি। আট বছর বয়সে একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় মাত্র তিনটি রঙিন পেনসিল নিয়ে শাপলা আঁকতে শুরু করেছিলেন লিপু। পরে অন্যদের কাছ থেকে পেনসিল ধার করে ছবিতে যোগ করেন আরও রং। সেই ছবির জন্য পেয়েছিলেন তৃতীয় পুরস্কার। শিল্পীর ভাষ্যে উঠে আসা এই অভিজ্ঞতা ‘বিন্দু থেকে সৃষ্টি’ ভাবনাকে দিয়েছে ব্যক্তিগত মাত্রা। শাপলা তাই তাঁর কাছে শুধু প্রকৃতির ফুল নয়, শিল্পযাত্রার শুরুর স্মারকও।
‘এক্সুবের্যান্স অব ওয়াটার লিলিজ’ ও ‘অ্যাওয়েটিং ব্লুম’ চিত্রকর্মে ফুল, কুঁড়ি ও রঙের বিন্যাসে ফুটে উঠেছে জীবন ও সম্ভাবনার অনুভব। অন্যদিকে ‘চাইল্ডহুড বিয়ন্ড দ্য কাইট স্ট্রিং’-এ পুরান ঢাকার ছাদ ও ঘুড়ির স্মৃতি এবং ‘দ্য ফ্ল্যাগ অব ইনডিপেনডেন্স’-এ লাল-সবুজের উপস্থিতি ব্যক্তিগত অনুভূতিকে যুক্ত করেছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে।
অ্যাক্রিলিক, তেলরং ও মিশ্রমাধ্যমে আঁকা এসব কাজে কখনো দৃশ্যমান অবয়ব স্পষ্ট, কখনো তা বিমূর্ততার দিকে ধাবিত। রঙের স্তর, মুক্তরেখা, আঁচড় ও পৃষ্ঠের বৈচিত্র্যময় ব্যবহারে বিষয় ও অনুভূতির ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ ঘটিয়েছেন শিল্পী।

২০১২ সালে টোকিওর তোয়ো ইনস্টিটিউট অব আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন থেকে চিত্রকলায় অ্যাডভান্সড ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন কামরুল হাসান লিপু। জাপানে শিল্পশিক্ষা ও দীর্ঘদিনের বসবাস তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করেছে। দুই দেশের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ, প্রকৃতি ও লোকজ সংস্কৃতিকে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা রয়েছে তাঁর কাজে।
এর আগে বিভিন্ন যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন লিপু। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৬ সালের চতুর্দশ ইয়োকোহামা পোর্ট ইন্ডিপেনডেন্ট প্রদর্শনী এবং ২৯তম সেয়া আর্ট এক্সিবিশন। সেয়া আর্ট এক্সিবিশনে তিনি আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে অংশ নেন।

চিত্রকলার পাশাপাশি জাপানে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত রয়েছেন তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কাহাল আর্ট গ্রুপ বাংলাদেশ ও জাপানের শিল্পীদের মধ্যে সংযোগ তৈরিতে কাজ করছে। কাহাল গ্যালারির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শন, বাংলাদেশের নকশিকাঁথা ও লোকশিল্প তুলে ধরা এবং জাতীয় দিবস উপলক্ষে সাংস্কৃতিক আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
ইয়োকোহামার এই একক প্রদর্শনীতে তাই শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত শিল্পযাত্রা নয়, প্রবাসে থেকেও শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার এক নিরন্তর প্রচেষ্টাও দৃশ্যমান। বিন্দু থেকে রেখা, রেখা থেকে ছবির বিস্তার—আর সেই ছবির ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে খুঁজে ফেরার গল্পই যেন কামরুল হাসান লিপুর ‘বিন্দু থেকে সৃষ্টি’।