বরিশালে দালালের দৌরাত্ম্যে প্রতারিত গ্রামাঞ্চলের রোগীরা

ফন্ট সাইজ:

বরিশাল নগরীতে রোগী ভাগিয়ে নেয়ার দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য এখন চরমে। প্রতিদিন এদের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হচ্ছে চিকিৎসার জন্য গ্রাম থেকে শহরে আসা সহজ সরল রোগীরা। এসব রোগীদের টার্গেট করে কৌশলে বিভিন্ন ল্যাব ও চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে চক্রের বিরুদ্ধে। চিকিৎসাসেবার নামে এমন প্রতারণায় নিঃস্ব হচ্ছেন অনেক অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনেরা। মাঝে মধ্যে প্রশাসনের অভিযানে ২/৪ জন আটক হলেও আদালত থেকে ছাড়া পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে তারা। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হলো প্রশাসন বা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এ ধরনের দালাল চক্রের কথা স্বীকার করছেন, কিন্তু এদের রোধ করতে পারছেন না। অভিযোগ আছে, নগরীর রুপাতলী, নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল ও লঞ্চঘাটকে কেন্দ্র করে সক্রিয় রয়েছে রোগী ভাগিয়ে নেয়ার একটি চক্র। বাস থামার সঙ্গে সঙ্গেই রোগীদের ঘিরে ধরেন কিছু অটোরিকশাচালক। তাদের সঙ্গে আলাপের একপর্যায়ে রোগী কোন চিকিৎসককে দেখাবেন, তা জানতে চাওয়া হয়। রোগী চিকিৎসকের নাম বললে শুরু হয় পরিকল্পিত বিভ্রান্তি। রোগীকে বলা হয়-‘ওই ডাক্তার আজ ঢাকায় গেছেন, তার মায়ের অপারেশন।’ এরপর চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়ার কথা বলে একটি নম্বরে ফোন করা হয়। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে নিজেকে চিকিৎসকের পরিচিত বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে অন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

রোগী বুঝতেই পারেন না, তিনি চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শ পাচ্ছেন, নাকি একটি পরিকল্পিত রোগী ভাগানোর ফাঁদে পড়ছেন। পরে কথিত পরামর্শ অনুসরণ করে নির্দিষ্ট ল্যাব বা চিকিৎসাকেন্দ্রে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার এমন অভিযোগও রয়েছে, সরল রোগী কোনো প্রখ্যাত চিকিৎসকের কাছে যাবেন। রিকশাচালক তাকে একই নামের অন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন। ডায়াগনস্টিক পরীক্ষায়ও চলে নানা প্রতারণা। রোগীকে কৌশলে নিম্নমানের ডায়াগনস্টিকে নিয়ে পকেট ফতুর করার অসংখ্য অভিযোগ আছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, এসব এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি রিকশা বা অটোরিকশা থামতে দেখলেই রোগীদের কাছে ছুটে যান। তাদের বলা হয়, কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসক এইমাত্র চলে গেছেন কিংবা আজ চেম্বারে নেই। এভাবে রোগীদের বিভ্রান্ত করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বগুড়া রোডের অপসোনিন মোড় এলাকায় অবস্থিত সাউথ ইবনে সিনা নামের একটি ল্যাবের বিরুদ্ধেও দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ ও রোগী ভাগিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ল্যাবটির মালিক শাওন মোল্লাকে প্রায়ই দালালদের সঙ্গে দেখা যায় এবং তিনি তাদের কার্যক্রম তদারকি করেন। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে প্রতিষ্ঠানটি একাধিকবার সিলগালা করার অভিযোগও রয়েছে। সিলগালা ও জরিমানার পর কোনো প্রতিষ্ঠান কীভাবে আবার কার্যক্রম চালায়, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক রেফায়েত আহমেদ বলেন, দালাল নির্মূলে পুলিশ প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা থাকলে এ সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। যেসব ল্যাবের লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। ল্যাব মালিকদের সংগঠন সহযোগিতা করলে অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করা সহজ হবে বলেও তিনি জানান। ল্যাব ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি কে এম শহিদুল্লা বলেন, নথুল্লাবাদ, রুপাতলী ও লঞ্চঘাট দালালদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তার অভিযোগ, এসব এলাকা থেকে গ্রামাঞ্চলের রোগীরা দালালদের খপ্পরে পড়ে নিম্নমানের ও নামসর্বস্ব ল্যাবে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। প্রশাসন সক্রিয় হলে এ তৎপরতা অনেকাংশে বন্ধ করা সম্ভব।