নেতানিয়াহুর বিদায়ে সত্যি কী কোনো পরিবর্তন আসবে ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যে?

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

নেতানিয়াহুর বিদায়ে সত্যি কী কোনো পরিবর্তন আসবে ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যে?

ফন্ট সাইজ:

আগামী ২৭ তারিখ ইসরাইলে সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে হেরে গেলে বিদায় নিতে হবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নেতানিয়াহু বিদায় নিলেও ফিলিস্তিনিদের জন্য তা সামান্যই পরিবর্তন আনবে। কেননা যেই প্রধানমন্ত্রী হোক ইসরাইলিদের দীর্ঘদিনের যে রাষ্ট্রীয় নীতি তাতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। নির্বাচন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে একজোট হয়েছে দেশটির প্রধান চারটি বিরোধী রাজনৈতিক দল।

দলগুলো হলো- ইয়াশার পার্টি, দ্য ডেমোক্রেটস, ইসরাইল বেইতেনু এবং টুগেদার অ্যালায়েন্স। রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা থাকলেও দলগুলো জানিয়েছে, একটি ‘ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলকে টিকিয়ে রাখা ও শক্তিশালী করার’ লক্ষ্যেই তারা এক হয়েছে।

আসন্ন নির্বাচন ও গভীর অভ্যন্তরীণ সংকট: আগামী ২৭শে অক্টোবরের নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহুর জোটের সঙ্গে বিরোধী শিবিরের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার মতো অবস্থানে নেই। দুর্নীতি, নিরাপত্তা ব্যর্থতা, উগ্র-গোঁড়া ইহুদিদের সামরিক সেবা থেকে বিরত রাখা এবং আরব দলগুলোকে রাজনীতি থেকে বাদ দেয়ার চেষ্টার মতো নানা অভ্যন্তরীণ সংকটে ইসরাইল এখন বিভক্ত।

একই সঙ্গে গাজা ও লেবাননে আগ্রাসন এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতিস্থাপনকারীদের তা-বের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তীব্র চাপের মুখে রয়েছে দেশটি। বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন ইসরাইলের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে।

নেতানিয়াহু বিরোধী জোট আসলে কী?
গত ২৬শে সেপ্টেম্বর বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ নেতারা একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। এতে নির্বাচনের আগে একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণ না করা এবং নির্বাচনের পর সরকার গঠনে ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এই জোটে নেসেটের আনুষ্ঠানিক বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদের পাশাপাশি রয়েছেন ইয়াশার পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকোট, টুগেদার জোটের নেতা নাফতালি বেনেট, ইসরাইল বেইতেনুর প্রধান আভিগদোর লিবারম্যান এবং দ্য ডেমোক্রেটসের ইয়াইর গোলান। গাদি আইজেনকোটকে প্রধানমন্ত্রী পদের প্রধান সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

চ্যানেল ১২-এর জরিপ অনুযায়ী, ১২০ আসনের নেসেটে আইজেনকোটের ইয়াশার ২৩টি আসন পেয়ে শীর্ষে থাকতে পারে। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেতে পারে ২১ আসন। টুগেদার জোট ১৩ এবং ইসরাইল বেইতেনু ও ডেমোক্রেটস প্রত্যেকে ৯টি করে আসন পেতে পারে। এতে বিরোধী জোট পেতে পারে মোট ৫৪ আসন, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন থেকে সাতটি কম। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর জোট পেতে পারে ৪৯ আসন। ইসরাইলের নাগরিকত্ব থাকা ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব দলগুলো ১৩ আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

তবে বিরোধী শিবিরের নেতারা তাদের সঙ্গে জোট করার সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছেন।
‘বেশিরভাগই কট্টর ডানপন্থি’
লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে ইউনিভার্সিটির বিশ্লেষক সামের জাবের বলেন, নেতানিয়াহু শিবির ক্ষমতা হারালেও ফিলিস্তিন নীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আশা করা উচিত নয়।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান প্রায় অভিন্ন এবং তারা সবাই বসতি সম্প্রসারণ কাঠামো বজায় রাখার পক্ষে।
বিরোধী জোটের বেশিরভাগ নেতাই গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে চরম কট্টর অবস্থান নিয়েছেন। সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকোট ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে ‘অলীক কল্পনা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং তিনি বসতি শক্তিশালী করার পক্ষপাতী।

অন্যদিকে নাফতালি বেনেট নিজেকে নেতানিয়াহুর চেয়েও ‘বেশি ডানপন্থি’ দাবি করেন। তিনি ফিলিস্তিনিদের দেখামাত্র গুলির পক্ষে কথা বলেছেন এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ঘোর বিরোধী। লিবারম্যানের ইসরাইল বেইতেনু পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত করার দাবি জানায় এবং গাজায় পানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার পক্ষে। কেবল ডেমোক্রেটসের ইয়াইর গোলান দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কথা বললেও, তা হবে ফিলিস্তিনের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ও ইসরাইলি নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের শর্তে।

পিউ রিসার্চের জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ১৭ শতাংশ ইসরাইলি মনে করেন যে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস সম্ভব।
ক্ষতির মাত্রা কিছুটা কমানোর চেষ্টা
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নতুন সরকার এলে বর্তমান উগ্র সরকারের কিছু চরম পদক্ষেপ অন্তত কিছুটা ধীর বা স্থগিত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংকট বিষয়ক বিশ্লেষক আমজাদ ইরাকি বলেন, ফিলিস্তিনিদের কোনো মৌলিক পরিবর্তনের আশা করার সুযোগ নেই। তবে নেতানিয়াহুর বিদায়ে চরমপন্থি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা কিছুটা কমতে পারে এবং গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ বাড়তে পারে। এই মুহূর্তে প্রতিটি জীবন বাঁচানো এবং প্রতিটি ইঞ্চি ভূমি রক্ষা করাই ফিলিস্তিনিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।