বাংলাদেশ ‘নিরাপদ দেশ’, ইউরোপে আশ্রয়ের দরজা কি বন্ধ?

ইউরোপের চিঠি

বাংলাদেশ ‘নিরাপদ দেশ’, ইউরোপে আশ্রয়ের দরজা কি বন্ধ?

ফন্ট সাইজ:

ইউরোপের দরজায় বাংলাদেশিদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশকে নিরাপদ উৎসদেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, অন্যদিকে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ইউরোপের শ্রমবাজারে বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। আপাতদৃষ্টিতে দুটি সিদ্ধান্ত পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে। বাস্তবে এগুলো ইউরোপের অভিবাসননীতির দুটি ভিন্ন দিক । একদিকে অনিয়মিত অভিবাসন ও আশ্রয়ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো, অন্যদিকে ইউরোপের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী বৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করা।

বাংলাদেশিদের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্য গভীর। বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে ইউরোপে থাকার কথা ভাবছেন, তাদের বুঝতে হবে, ইউরোপের অভিবাসননীতি এখন আগের চেয়ে বেশি নিয়মকেন্দ্রিক। শুধু বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা আছে কিংবা ব্যক্তিগতভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন । এমন সাধারণ বক্তব্য দিয়ে আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা আগের মতো ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আবার বাংলাদেশকে নিরাপদ দেশ ঘোষণা করা হয়েছে বলেই প্রত্যেক বাংলাদেশির আশ্রয়ের আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে, এমন ধারণাও সঠিক নয়।

২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বিষয় ও অভিবাসনবিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বৈঠকের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বৈঠকে অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচার প্রতিরোধ, দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের ইউরোপে কর্মসংস্থান, বৈধ অভিবাসনের পথ সম্প্রসারণ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই দিনে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদলের আলোচনায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রতারণা প্রতিরোধের বিষয়ও উঠে এসেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপের এই নতুন বার্তা বাংলাদেশ কীভাবে গ্রহণ করবে? রাজনৈতিক আশ্রয়ের নামে অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি বৈধ শ্রম অভিবাসনের সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে কি না, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অভিবাসনচিত্র।

‘নিরাপদ দেশ’ ঘোষণার অর্থ কী? প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপদ উৎসদেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি শুধু ম্যাগনাস ব্রুনারের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও কাউন্সিল ইইউর প্রথম অভিন্ন নিরাপদ উৎসদেশের তালিকা অনুমোদন করে। সেই তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিসর, মরক্কো, তিউনিসিয়া, কলম্বিয়া ও কসোভোর নাম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ইউরোপীয় বিধান ১২ জুন ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।

এখানে ‘নিরাপদ উৎসদেশ’ বা Safe Country of Origin কথাটির আইনি অর্থ বোঝা জরুরি। এর অর্থ এই নয় যে, দেশটির প্রতিটি নাগরিক সব পরিস্থিতিতে নিরাপদ, অথবা সেখানে কারও ওপর রাজনৈতিক নিপীড়ন, নির্যাতন কিংবা বৈষম্যের ঘটনা ঘটতে পারে না। বরং সংশ্লিষ্ট দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয়, সেখানে নাগরিকদের ওপর নির্যাতন বা গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকি এমন পর্যায়ে নেই, যা দেশ ছেড়ে আসা প্রত্যেক নাগরিককে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা দেওয়ার যৌক্তিকতা তৈরি করে।

এই শ্রেণিবিন্যাসের ফলে তালিকাভুক্ত দেশের নাগরিকদের আশ্রয়ের আবেদন দ্রুততর পদ্ধতিতে বিবেচিত হতে পারে। আবেদনকারীর পক্ষে নিজের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা এবং কেন তাঁর ক্ষেত্রে নিজ দেশ নিরাপদ নয়, তা প্রমাণের গুরুত্বও বেড়ে যায়। ফলে বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন আরও কঠিন হতে পারে।

তবে এর অর্থ আবেদন করার অধিকার বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নয়। কোনো বাংলাদেশি যদি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় পরিচয়, জাতিগত পরিচয়, সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্যপদ কিংবা অন্য কোনো স্বীকৃত কারণে ব্যক্তিগতভাবে নিপীড়নের বাস্তব ঝুঁকিতে থাকেন, তাঁর আবেদন প্রযোজ্য আইনি মানদণ্ড অনুযায়ী বিবেচিত হওয়ার কথা। আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও উপস্থাপিত প্রমাণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেই নিরাপদ উৎসদেশের ধারণা এবং নিরাপদ তৃতীয় দেশের ধারণার মধ্যে পার্থক্য করেছে। প্রথমটি আবেদনকারীর নিজ দেশকে কেন্দ্র করে; দ্বিতীয়টি এমন একটি তৃতীয় দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে আবেদনকারী কার্যকর সুরক্ষা পেতে পারেন বলে বিবেচিত হতে পারেন। দুটি ধারণাকে এক করে দেখলে আইন ও বাস্তবতা উভয় ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তি তৈরি হবে।

সুতরাং বাংলাদেশকে নিরাপদ উৎসদেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা রাজনৈতিক আশ্রয়ের পথকে সংকুচিত করতে পারে, কিন্তু একে সব বাংলাদেশির জন্য আশ্রয়ের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।

ইউরোপের সিদ্ধান্তের পেছনে কী আছে? ইউরোপের অভিবাসননীতি বুঝতে হলে শুধু বাংলাদেশের দিকে তাকালে চলবে না। ইউরোপের ভেতরেও রাজনৈতিক চাপ, আবাসনসংকট, আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং জনমতের পরিবর্তন কাজ করছে। বিভিন্ন দেশে অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান সরকারগুলোকে অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে উৎসাহিত করেছে।

ইইউর নতুন অভিবাসন ও আশ্রয়ব্যবস্থার লক্ষ্য হচ্ছে আবেদন যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে আরও সমন্বিত করা, অযৌক্তিক বা দুর্বল ভিত্তির আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং যাদের থাকার আইনি অধিকার নেই, তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা কার্যকর করা। একই সঙ্গে যারা প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন অনুভব করেন, তাদের অধিকার রক্ষার কথাও বলা হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশি নাগরিকদের আশ্রয়ের আবেদনের ক্ষেত্রে ইইউজুড়ে স্বীকৃতির হার ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। নিরাপদ উৎসদেশের তালিকা প্রণয়নের পেছনে এই কম স্বীকৃতির হারও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করে। ইউরোপে আশ্রয়ের আবেদনকারীদের বড় অংশ যদি শেষ পর্যন্ত সুরক্ষা না পান, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাত্রা করে অর্থ, সময় ও জীবন বিপন্ন করার যৌক্তিকতা কোথায়?

তবে ৪ শতাংশের হিসাব দিয়ে প্রত্যেক আবেদনকারীর অভিজ্ঞতা বিচার করা যাবে না। স্বীকৃতির হার একটি সামগ্রিক পরিসংখ্যান; কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনার চূড়ান্ত রায় নয়। একজনের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়া এবং অন্য একজনের আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পেছনে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি থাকতে পারে।

এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত প্রমাণ, বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য, নিপীড়নের প্রকৃতি এবং নিজ দেশে কার্যকর সুরক্ষা পাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা।

আশ্রয়ের আবেদন বনাম অভিবাসন ব্যবসা: ইউরোপে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া কোনো অপরাধ নয়। আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন হলে আবেদন করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আশ্রয়ব্যবস্থাকে ইউরোপে প্রবেশের বিকল্প ভিসা হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা তৈরি হলে তার পরিণতি শুধু আবেদনকারীর ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো সম্প্রদায়ের ওপর এর প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশি অভিবাসীদের একটি অংশ ইউরোপে গেছেন শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা কিংবা পারিবারিক পুনর্মিলনের মাধ্যমে। অন্যদিকে অনেকে দালালের প্ররোচনায় বিপজ্জনক রুটে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। কেউ কেউ বৈধ ভিসায় প্রবেশের পর আশ্রয়ের আবেদন করেন। এসব পথের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা; তাই সবাইকে একইভাবে বিচার করা অন্যায়।

সমস্যা তৈরি হয় যখন অসাধু মধ্যস্থতাকারীরা আশ্রয় পাওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। কারও রাজনৈতিক নিপীড়নের বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকলেও তাকে সাজানো কাহিনি, জাল নথি কিংবা মনগড়া প্রমাণ দিয়ে আবেদন করতে উৎসাহিত করা হয়। এমন প্রতারণা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভবিষ্যৎ আইনি অবস্থানকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে এবং প্রকৃত নিপীড়নের শিকার মানুষের আবেদনকেও সন্দেহের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

ব্রিটেনে সমকামী পরিচয়ের ভিত্তিতে মিথ্যা আশ্রয়ের আবেদন তৈরিতে সহায়তার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের যে খবর আলোচনায় এসেছে, তার ক্ষেত্রেও অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। গ্রেপ্তার মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রয়েছে।

একই সঙ্গে ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়। ফলে ইইউর নিরাপদ উৎসদেশসংক্রান্ত বিধান ব্রিটেনে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। ব্রিটেনের নিজস্ব আশ্রয় ও অভিবাসন আইন রয়েছে। ইইউর সিদ্ধান্ত এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপকে একই আইনি কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

সাংবাদিক হিসেবে ইউরোপে দীর্ঘ সময় বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: অভিবাসনসংক্রান্ত আলোচনায় আবেগের চেয়ে তথ্য, আর গুজবের চেয়ে আইনের গুরুত্ব বেশি। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি যাচাই করা যেমন জরুরি, তেমনি কোনো দেশের অভিবাসীদের সামগ্রিকভাবে প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিপন্থী।

পাঁচ লাখ বাংলাদেশি, কিন্তু নতুন সুযোগ কোথায়? ঢাকায় সাম্প্রতিক বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি বৈধভাবে বসবাস করছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইউরোপে বাংলাদেশি অভিবাসীদের উপস্থিতি এবং দুই পক্ষের সম্পর্কের সম্ভাবনা তুলে ধরে। তবে এই সংখ্যা থেকে ইউরোপের শ্রমবাজারে নতুন কতজন বাংলাদেশি কর্মী প্রবেশ করতে পারবেন, তা নির্ধারণ করা যায় না।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে বৈধ শ্রম অভিবাসনের পথকে বাস্তব ও কার্যকর করা।

বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে Talent Partnership উদ্যোগের আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, কৃষি, টেক্সটাইল, জাহাজ নির্মাণ এবং হসপিটালিটি খাতের মতো ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীদের সুযোগ তৈরির আলোচনা নতুন নয়। এই অংশীদারত্বের প্রাথমিক উদ্যোগ ২০২৩ সালে শুরু হয় এবং ২০২৪ সালে এর অগ্রাধিকার নিয়ে আরও আলোচনা হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব আলোচনা কতটা বাস্তব কর্মসংস্থানে রূপ নেবে?

ইউরোপে শ্রমিকের চাহিদা থাকলেই বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানো সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, ভাষাদক্ষতা, পেশাগত সনদ, কাজের অনুমতি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসনবিধি পূরণ করতে হয়। একটি দেশে নির্মাণশ্রমিকের চাহিদা থাকলেও অন্য দেশে একই পেশার কর্মী নিয়োগের শর্ত ভিন্ন হতে পারে। ইউরোপের সব দেশের জন্য একক কোনো সাধারণ কর্মভিসা আছে—এমন ধারণাও ভুল।

বাংলাদেশের কর্মীদের দক্ষতা ইউরোপীয় মানদণ্ডে যাচাই করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষাশিক্ষা, সনদের গ্রহণযোগ্যতা এবং নিয়োগকর্তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ বাড়াতে হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। চাকরির প্রস্তাব, বেতন, আবাসন, কর্মঘণ্টা ও চুক্তির শর্ত সম্পর্কে কর্মীকে আগেই পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে।

বাংলাদেশি কর্মী যদি দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও ভাষা, সনদ বা নিয়োগপ্রক্রিয়ার জটিলতায় পিছিয়ে পড়েন, তাহলে বৈধ অভিবাসনের সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হবে।

প্রথমত, অভিবাসন খাত থেকে প্রতারণা দূর করতে হবে। সাম্প্রতিক বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ৫২টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের কথা জানানো হয়েছে। এটি অনিয়মের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু লাইসেন্স বাতিল যথেষ্ট নয়। প্রতারণার শিকার কর্মীরা কীভাবে ক্ষতিপূরণ পাবেন, বিদেশে আটকে পড়লে কীভাবে সহায়তা পাবেন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তারও জবাবদিহি প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। ইউরোপে চাকরির জন্য আবেদন করতে গিয়ে একজন কর্মী যেন জমি বিক্রি করে বা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে অনিশ্চিত পথে না নামেন। সরকারি তথ্যসেবা, যাচাইকৃত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, স্বচ্ছ আবেদনপ্রক্রিয়া এবং খরচের সীমা নির্ধারণে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক আশ্রয় এবং শ্রম অভিবাসনের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করতে হবে। কেউ কাজের জন্য ইউরোপে যেতে চাইলে তার জন্য উপযুক্ত বৈধ পথ খুঁজতে হবে। আর কেউ প্রকৃত নিপীড়নের শিকার হলে তাকে মিথ্যা কাহিনি সাজানোর পরামর্শ না দিয়ে আইনসম্মত সহায়তা দিতে হবে। এই দুই ধরনের প্রয়োজনকে এক করে দেখলে উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতি হবে।

সরকারের উচিত ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি কর্মীরা বৈধভাবে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পান। পাশাপাশি দেশে ফিরে আসা কর্মীদের দক্ষতা কাজে লাগানো, পুনর্বাসন এবং পুনরায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা দরকার।

ইউরোপের দরজা বন্ধ নয়, কিন্তু নিয়ম বদলেছে: ইউরোপে প্রায় এক দশক বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে আমার উপলব্ধি, অভিবাসনের বাস্তবতা দূর থেকে যতটা সরল মনে হয়, কাছে গেলে ততটাই জটিল। ইউরোপে বসবাসের সুযোগ মানেই স্থায়ী নিরাপত্তা নয়। আবার কঠোর অভিবাসননীতি মানেই সব বৈধ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।

বাংলাদেশকে নিরাপদ উৎসদেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা রাজনৈতিক আশ্রয়ের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এর ফলে আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, প্রমাণ এবং আইনি যুক্তির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। একই সময়ে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বৈধ অভিবাসনের সুযোগ তৈরির আলোচনা একটি সম্ভাবনার দরজাও খুলে রেখেছে।

এখন প্রয়োজন বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত। ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখানো দালালদের প্রতিশ্রুতির বদলে যাচাই করা তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে। রাজনৈতিক আশ্রয়কে চাকরির বিকল্প ভাবা যাবে না, আবার প্রকৃত নিপীড়নের শিকার মানুষের অধিকারও উপেক্ষা করা যাবে না।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ হলো—যারা দক্ষ, তাদের দক্ষতা অনুযায়ী বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা; যারা আশ্রয়ের প্রকৃত দাবিদার, তাদের জন্য ন্যায়সংগত আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা; আর যারা প্রতারণার শিকার, তাদের সুরক্ষা দেওয়া।

ইউরোপের বার্তাটি তাই এককথায় নেতিবাচক নয়, ইতিবাচকও নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা এবং একই সঙ্গে একটি সুযোগ। বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে দেশের অভিবাসনব্যবস্থাকে কতটা স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করা যায় তার ওপর।

ইউরোপের দরজায় পৌঁছানোই সাফল্য নয়; বৈধভাবে প্রবেশ, সম্মানের সঙ্গে কাজ এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ নিশ্চিত করাই প্রকৃত সাফল্য।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]