পাগলা মসজিদের দানবাক্সে পাওয়া গেছে ৯ কন্টেইনার স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা

পাগলা মসজিদের দানবাক্সে পাওয়া গেছে ৯ কন্টেইনার স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা

ফন্ট সাইজ:

দীর্ঘ ৬ বছর ৭ মাস পর কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্সে পাওয়া স্বর্ণালংকার পরিমাপ করা হয়েছে। একইসঙ্গে গণনা করা হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় মসজিদ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন এই স্বর্ণালংকার পরিমাপ ও বৈদেশিক মুদ্রা গণনা কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ সময় জেলা পরিষদ প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান, স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালক (উপ-সচিব) জেবুন নাহার শাম্মী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) জেসমিন আক্তার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ওয়াদিয়া শাবাব, সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শরিফুল হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ, এসআরবি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের উপস্থিতিতে স্বর্ণালংকার পরিমাপ ও বৈদেশিক মুদ্রা গণনার কাজ করা হয়।

জেলার ১০ জন স্বর্ণশিল্পী কারিগর স্বর্ণালংকারের শ্রেণিবিন্যাস ও পরিমাপের কাজ করেন। এ ছাড়া রূপালী ব্যাংকের ৬ জন কর্মকর্তা বৈদেশিক মুদ্রার শ্রেণিবিন্যাস ও গণনার কাজ করেন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদের তত্ত্বাবধানে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. কামরুল হাসান মারুফ, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সূফি সাজ্জাদ আল ফোজায়েল, রূপালী ব্যাংকের এজিএম মোহাম্মদ আলী হারেছী এবং বিএসটিআই নরসিংদী আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (মেট্রোলজি) মোহাম্মদ শফিকুল আলম এ কার্যক্রম তদারকি করেন। স্বর্ণালংকার পরিমাপ শেষ হয় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। কন্টেইনারগুলোতে মোট ১২ কেজি ১৭৪ গ্রাম স্বর্ণ এবং ১২ কেজি ৬৯০ গ্রাম রুপা পাওয়া গেছে। এখন এসব নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে।

এর আগে সর্বশেষ ২০২০ সালের ১১ই মার্চ পাগলা মসজিদের দানসিন্দুকে দান হিসেবে পাওয়া স্বর্ণালংকার ও রুপা এক কোটি ১৫ লাখ ৪ হাজার ৯০০ টাকায় নিলামে বিক্রি করা হয়েছিল। তখনকার নিলামে প্রায় ৩ বছর ধরে দানসিন্দুকে জমা হওয়া ৪১৫ ভরি এক আনা স্বর্ণালংকার ও ১৮৪ ভরি রুপা পাওয়া গিয়েছিল। এ ছাড়া তখন পাগলা মসজিদের দানসিন্দুকে দান হিসেবে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রাগুলো বিক্রি করে এক লাখ ২৭ হাজার ৬৫১ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। এরপর থেকে এই সময়ে পাগলা মসজিদের দানবাক্সে পাওয়া যায় ৯ কন্টেইনার স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রা। এগুলো ট্রেজারিতে জমা রাখা হয়েছিল। স্বর্ণালংকার পরিমাপ ও বৈদেশিক মুদ্রা গণনা কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানান, পাগলা মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সে আসা দর্শনার্থীগণ দানের সিন্দুকগুলোতে টাকার পাশাপাশি স্বর্ণ, রুপার গয়নাসহ বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা দান করে থাকেন।

দানবাক্সগুলো পরিপূর্ণ হয়ে গেলে তখন তা খোলা হয়। সেসময় দানবাক্সে পাওয়া টাকাগুলো গণনা করা হয় এবং স্বর্ণ, রুপার গয়নাসহ বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা একসঙ্গে কন্টেইনারে ভরে সিলগালা করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ট্রেজারি শাখাতে জমা করা হয়। ট্রেজারিতে জমা করা কন্টেইনারগুলো খুলে ক্যারেট অনুযায়ী আলাদা করে ওজন নির্ধারণ করে স্বর্ণ, রুপার বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হবে এবং পরবর্তীতে পত্রিকায় প্রকাশের মাধ্যমে এগুলো নিলাম করা হবে। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রাগুলো দেশভিত্তিক আলাদা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ বিনিময় হার মোতাবেক নগদায়ন করা হবে। জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, পাগলা মসজিদের ৮টি ব্যাংক হিসাবে বর্তমানে ১৩১ কোটি ৮৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮১০ টাকা জমা রয়েছে। ২০২০ সালের ১১ই মার্চের পর থেকে অদ্যাবধি মোট ১৮ বার পাগলা মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের দানবাক্স খোলা হয়েছে এবং এই সময়ে স্বর্ণালংকার ও বৈদেশিক মুদ্রার ৯টি মাঝারি আকারের প্লাস্টিকের কন্টেইনার ও ৬টি খাম ট্রেজারিতে জমা রাখা হয়েছিল। এগুলোর পরিমাপ ও গণনার জন্য খোলা হয়েছে।

কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে পাগলা মসজিদ প্রতিষ্ঠিত। শুরুতে মাত্র ১০ শতাংশ ভূমির উপর পাগলা মসজিদটি গড়ে উঠেছিল। সময়ের বিবর্তনে আজ এ মসজিদের পরিধি যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে এর খ্যাতি ও ঐতিহাসিক মূল্যও। বর্তমানে সম্প্রসারিত পাগলা মসজিদ এলাকায় মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি অত্যাধুনিক ধর্মীয় কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পাগলা মসজিদে মুসল্লিদের ব্যাপক সমাগমকে ঘিরে পুরাতন অবকাঠামো ভেঙে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পাগলা মসজিদে মানুষ টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ফল-ফলাদি, কোরআন শরীফ ইত্যাদি দান করেন। এর মধ্যে টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার মসজিদের দানসিন্দুকগুলোতে জমা পড়ে। অন্যদিকে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ফল-ফলাদি, কোরআন শরীফ ইত্যাদি নিলামঘরে জমা দিতে হয়। নিলামঘরে প্রতিদিন এসব নিলামে বিক্রি করে দেয়া হয়। এসব টাকা ব্যাংকে জমা করা হয়। উজান-ভাটির কিশোরগঞ্জ জেলা জুড়ে রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক মসজিদ। রয়েছে মসজিদ স্থাপত্যের সোনালী ঐতিহ্য। তবে পাগলা মসজিদ বর্তমানে দেশ-বিদেশে কিশোরগঞ্জের পরিচিতি স্মারক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন যত যাচ্ছে পাগলা মসজিদের খ্যাতি ও জৌলুস ততই যেন বাড়ছে। স্বভাবতই ঐতিহাসিক এই মসজিদকে নিয়ে জেলার ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলেই গর্ববোধ করেন।