উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শেড নির্মাণ, শৌচাগার, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ। এসব কাজে প্রতি বছর ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও’র মাধ্যমে বাস্তবায়িত এসব প্রকল্পে দরপত্র আহ্বান করা হলেও কাজ পাওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা কতোটা স্বচ্ছ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে ঘুরে ফিরে কাজ যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় এনজিও’র কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের যোগসাজশের অভিযোগও সামনে এসেছে। স্থানীয় ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, দরপত্র জমা দেয়ার আগেই প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর দর জানার সুযোগ পাচ্ছে একটি চক্র।
পরে সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে পছন্দের ঠিকাদারি বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অন্যদের তুলনায় সামান্য কমবেশি দর দিয়ে কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে। এতে দরপত্রে অংশ নেয়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ছে। বাইরে থেকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র মনে হলেও ভেতরে ভেতরে কাজের ভাগ-বাটোয়ারা নির্ধারিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট এনজিও’র প্রকিউরমেন্ট কর্মকর্তা, প্রকৌশলী এবং কাজের পরিমাপ, বিল প্রস্তুত ও অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ। সূত্রগুলোর দাবি, ঠিকাদার নির্বাচন থেকে শুরু করে কাজের মান যাচাই এবং বিল ছাড়ের বিভিন্ন পর্যায়ে এসব কর্মকর্তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপন সমঝোতা গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো প্রকল্পের দরপত্র আহ্বানের পর কারা কতো দর প্রস্তাব করেছে, সে তথ্য আগাম জেনে যাওয়ার সুযোগ পেলে পছন্দের প্রতিষ্ঠান সহজেই কৌশল নির্ধারণ করতে পারে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দর সম্পর্কে ধারণা নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দরের কাছাকাছি প্রস্তাব দিয়ে কাজ পাওয়ার পথ তৈরি করা হয়।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগের আলোচনায় এনজিও ফোরাম, জাগরণী সংস্থা, কেয়ার, এড্রা বাংলাদেশ, ওয়ার্ল্ড ভিশন, দুঃস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র (ডিএসকে) ও ভার্কের মতো সংস্থার নাম এসেছে। এসব সংস্থার বিভিন্ন প্রকল্পে ক্রয়, সরবরাহ ও নির্মাণকাজের দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীদের কেউ কেউ। শুধু কাজ পাওয়ার প্রক্রিয়াই নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করা কিংবা কাজের পরিমাণ ও বাস্তব অবস্থার মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে প্রকল্পের অর্থের যথাযথ ব্যবহার ব্যাহত হতে পারে।
অভিযোগের আরেকটি দিক হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এনজিও’র দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়ায় অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো সমান সুযোগ পাচ্ছে না বলে দাবি করা হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তা নিজে কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে ঠিকাদারি বা সরবরাহ ব্যবসায় যুক্ত থাকলে স্বার্থের সংঘাত তৈরির আশঙ্কা থাকে। এমন পরিস্থিতি আছে কি না, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যবসা, প্রতিষ্ঠানের মালিকানা এবং দরপত্র মূল্যায়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবিক সংকট মোকাবিলা এবং ক্যাম্পের অবকাঠামো উন্নয়নে দাতা সংস্থার অর্থের যথাযথ ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ অর্থের অপব্যবহার হলে একদিকে প্রকল্পের মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, অন্যদিকে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন। এ বিষয়ে রোহিঙ্গা ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, যেসব এনজিও’র বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
