কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে গত দুই মাসে প্রায় ৫০০ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে চলমান এ ভাঙনে গত এক বছরে দুই ইউনিয়নের প্রায় ২ হাজার বিঘা আবাদি জমি হারিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পানচাষিরা। জমির সঙ্গে তাদের স্বপ্ন, জীবিকা ও পুঁজি হারিয়ে অনেক পরিবার এখন দিশাহারা। ভাঙন অব্যাহত থাকায় দেশের পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী কুচিয়ামোড়া পানবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
সরজমিন দেখা গেছে, ভেড়ামারা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের মাধবপুর, লিসেনদিয়া, রায়টা ও আরকান্দি এলাকায় পদ্মার তীর জুড়ে তীব্র ভাঙন চলছে। একইভাবে জুনিয়াদহ ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশেও নদীভাঙনে আবাদি জমি বিলীন হচ্ছে। এক সময় যেসব জমিতে পানবরজসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হতো, সেসব জমির বড় অংশ এখন নদীর বুকে। ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটছে নদী তীরবর্তী কৃষকদের। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, গত এক বছরে বাহাদুরপুর ও জুনিয়াদহ ইউনিয়নের আরকান্দি, মাধবপুর, রায়টা, লিসেনদিয়া ও জুনিয়াদহ এলাকায় প্রায় ২ হাজার বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। এসব জমির অধিকাংশেই চাষ হতো পান। এ অঞ্চলের অর্থকরী ফসল পানকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী কুচিয়ামোড়া পানবাজার। পানবরজ হারিয়ে উৎপাদন কমে গেলে বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নদীর পানি কমার পর ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন ও তাগাদা দিয়েও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিদিনই নতুন নতুন জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। কুচিয়ামোড়া এলাকার পানচাষি ও ব্যবসায়ী নেতা আসলাম হোসেন বলেন, প্রতিদিন ৯ থেকে ১০ বিঘা করে জমি নদীতে চলে যাচ্ছে। পাউবো একেবারে নির্বিকার। আমরা গণহারে আবেদন জানিয়েছিলাম, কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসন কয়েকদিন আগে ক্ষতিগ্রস্ত ৩২০ জন পানচাষির তালিকা সংগ্রহ করেছে। এসব চাষি গত এক বছরে প্রায় ৩০ হাজার পিলি পানবরজ হারিয়েছেন। এত বড় ক্ষতিপূরণ দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। জমি ও পানবরজ হারিয়ে অনেক কৃষক ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের খরচ চালানো নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
ভেড়ামারা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহমুদা সুলতানা বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত দুই ইউনিয়নের প্রায় ৩২০ জন কৃষকের তালিকা তৈরি করে জেলায় পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশা করছেন তারা। তবে ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রস্তাবিত প্রকল্প এখনো অনুমোদন পায়নি। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা বলেন, ভেড়ামারার ওই অঞ্চলে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন হচ্ছে। এর মধ্যে তিন কিলোমিটার অত্যন্ত গুরুতর, যা জরুরি সহায়তা দিয়ে রোধ করা অসম্ভব। আমরা প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। প্রকল্প পাস হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিরুল আরাফাত বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ইতিমধ্যে কয়েকবার পরিদর্শন করা হয়েছে। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জোর তাগাদা দেয়া হয়েছে। কৃষি অফিসের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পানচাষি ও কৃষকদের তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেয়া হবে। তবে জমি ও পানবরজ হারানো কৃষকদের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি নদীভাঙন থামানো। প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় প্রতিদিনই তাদের আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া হলে কৃষকদের জীবিকার পাশাপাশি কুচিয়ামোড়া পানবাজারকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বড় সংকটে পড়তে পারে।
