অল্প অল্প জন্ডিস—গিলবার্টস সিনড্রোম নয়তো? দুশ্চিন্তার কিছু নেই!

অল্প অল্প জন্ডিস—গিলবার্টস সিনড্রোম নয়তো? দুশ্চিন্তার কিছু নেই!

ফন্ট সাইজ:

জন্ডিস শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। চোখ হলুদ দেখাচ্ছে, রক্ত পরীক্ষায় বিলিরুবিন একটু বেড়েছে—ব্যস, শুরু হয়ে যায় নানা দুশ্চিন্তা। কেউ ভাবেন লিভারে বড় কোনো রোগ হয়েছে, কেউ আবার হেপাটাইটিসের আশঙ্কায় ভীত হয়ে পড়েন। অথচ সব ধরনের জন্ডিস গুরুতর রোগের লক্ষণ নয়। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির শুধু বিলিরুবিন সামান্য বাড়ে, কিন্তু লিভারের অন্যান্য পরীক্ষাগুলো স্বাভাবিক থাকে, তাহলে একটি অপেক্ষাকৃত নিরীহ কারণ হতে পারে গিলবার্টস সিনড্রোম (Gilbert syndrome)। এটি একটি সাধারণ, বংশগত এবং ক্ষতিকর নয় এমন অবস্থা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর জন্য কোনো ওষুধ, বিশেষ চিকিৎসা বা অপারেশনের প্রয়োজন হয় না। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সামান্য জন্ডিসকে নিজে থেকেই গিলবার্টস সিনড্রোম ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ জন্ডিসের পেছনে অনেককারণ থাকতে পারে। সঠিক ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় কিছু রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেকারণটি নিশ্চিত করা জরুরি।

গিলবার্টস সিনড্রোম কী?
আমাদের রক্তে পুরোনো লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে গেলে বিলিরুবিন নামের একটি পদার্থ তৈরি হয়। লিভার এই বিলিরুবিনকে প্রক্রিয়াজাত করে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট এনজাইম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গিলবার্টস সিনড্রোমে জেনেটিক কারণে এই এনজাইমের কার্যকারিতা কিছুটা কম থাকে। ফলে বিশেষ করে unconjugated বা indirect bilirubin সামান্য বেড়ে যেতে পারে। এটি সাধারণত লিভারের ক্ষতি করে না এবং দীর্ঘমেয়াদে লিভার নষ্ট করে এমন রোগও নয়। অনেক মানুষ সারা জীবন গিলবার্টস সিনড্রোম নিয়ে থাকেন, কিন্তু কখনোই তা জানতে পারেন না। কারও ক্ষেত্রে অন্য কোনো কারণে রক্ত পরীক্ষা করতে গিয়ে ঘটনাচক্রে এটি ধরা পড়ে।
চোখ হলুদ কেন হয়?
রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা কিছুটা বেড়ে গেলে চোখের সাদা অংশে হলুদাভ ভাব দেখা দিতে পারে। কারও ক্ষেত্রে মুখেও হালকা হলুদাভ রং দেখা যায়। গিলবার্টস সিনড্রোমে এই হলুদভাব সাধারণত মৃদু ও ওঠানামা করে। কখনো দেখা যায়, আবার কিছুদিন পর স্বাভাবিক হয়ে যায়। বিশেষ করে কিছু পরিস্থিতিতে বিলিরুবিন বাড়তে পারে। যেমন—
. দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা উপবাস

. পানিশূন্যতা
. জ্বর বা কোনো অসুস্থতা
. অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম
. মানসিক চাপ
. ঘুমের ঘাটতি
. কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরিশ্রম বা দৈনন্দিন রুটিনের পরিবর্তন
তাই একজনের বিলিরুবিন একদিন স্বাভাবিক থাকলেও অন্য সময় সামান্য বেড়ে যেতে পারে।
শুধু বিলিরুবিন বাড়লেই কি গিলবার্টস সিনড্রোম?
না। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা।
রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। তাই শুধু একটি রিপোর্ট দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
গিলবার্টস সিনড্রোমের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায়—
১. মোট বিলিরুবিন সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
২. প্রধানত indirect bilirubin বৃদ্ধি পায়।
৩. ALT/SGPT, AST/SGOT, ALP ইত্যাদি লিভার এনজাইম সাধারণত স্বাভাবিক থাকে।
৪. রোগীর অন্য কোনো উল্লেখযোগ্য উপসর্গ থাকে না।
৫. জন্ডিস মৃদু এবং মাঝে মাঝে দেখা দেয়।
তবে রোগীর বয়স, উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফল বিবেচনা করেই চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন।
জন্ডিসের অন্য কারণগুলো কী?
জন্ডিসের কারণকে মোটামুটি তিনটি বড় ভাগে বিবেচনা করা যায়।
প্রথমত, লিভারের আগে (pre-hepatic) কোনো সমস্যা হলে রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়া বা hemolysis এর অন্যতম উদাহরণ।
দ্বিতীয়ত, লিভারের নিজস্ব রোগে জন্ডিস হতে পারে। যেমন ভাইরাল হেপাটাইটিস, ওষুধজনিত লিভার ইনজুরি, অ্যালকোহলজনিত লিভার রোগ, autoimmune hepatitis ইত্যাদি।

তৃতীয়ত, লিভার থেকে পিত্ত বের হওয়ার পথে বাধা (cholestasis বা biliary obstruction) সৃষ্টিহলেও জন্ডিস হতে পারে। পিত্তনালির পাথর, কিছু টিউমার বা অন্যান্য বাধাজনিত কারণে এমন হতে পারে।
তাই “বিলিরুবিন একটু বেড়েছে” বলেই এটিকে গিলবার্টস সিনড্রোম বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
গিলবার্টস সিনড্রোমে কি কোনো চিকিৎসা লাগে?
সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
এটি এমন কোনো রোগ নয় যার কারণে নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে বা লিভার টনিক গ্রহণ করতে হবে। অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তবে পর্যাপ্ত পানি পান করা, নিয়মিত খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত উপবাস এড়ানো এবং পর্যাপ্তবিশ্রাম নেওয়া উপকারী। কোনো বিশেষ খাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ—এমন সাধারণ নিয়মও নেই।
অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বা তথাকথিত “লিভার টনিক” নিজে থেকে গ্রহণ করা উচিত নয়।
কখন সতর্ক হতে হবে?
যদি শুধু সামান্য bilirubin বৃদ্ধি থাকে এবং অন্য সব পরীক্ষা স্বাভাবিক থাকে, তাহলে সাধারণত আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু নিচের কোনো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
জরুরি—
. জন্ডিস ক্রমাগত বাড়তে থাকা
. প্রস্রাব খুব গাঢ় হয়ে যাওয়া
. পায়খানা ফ্যাকাশে বা সাদা ধরনের হওয়া
. তীব্র পেটব্যথা
. জ্বরের সঙ্গে জন্ডিস
. বারবার বমি
. অতিরিক্ত দুর্বলতা
. ওজন কমে যাওয়া
. চুলকানি খুব বেশি হওয়া
. চোখ ও শরীরের হলুদভাব দীর্ঘদিন স্থায়ী হওয়া
বিশেষ করে জন্ডিসের সঙ্গে পেটব্যথা, জ্বর বা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া লিভার এনজাইম থাকলে শুধু গিলবার্টস সিনড্রোম ভেবে নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত নয়।
পরীক্ষার প্রয়োজন কতটুকু?
অনেক সময় একটি সাধারণ liver function test বা LFT থেকেই প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।

চিকিৎসক প্রয়োজনে পরীক্ষা করতে পারেন—
. Total bilirubin
. Direct bilirubin
. ALT/SGPT
. AST/SGOT
. Alkaline phosphatase
. অন্যান্য প্রয়োজনীয় লিভার ফাংশন পরীক্ষা
রোগীর ইতিহাস ও রিপোর্ট অনুযায়ী প্রয়োজনে CBC, hemolysis-এর পরীক্ষা, ভাইরাল হেপাটাইটিসের পরীক্ষা বা abdominal ultrasonography করা হতে পারে। সব রোগীর জন্য সব পরীক্ষা দরকার হয় না। চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরীক্ষা নির্বাচন করাই যুক্তিযুক্ত।

তাহলে কি দুশ্চিন্তার কিছু নেই?
গিলবার্টস সিনড্রোম সত্যিই থাকলে সাধারণত দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
এটি একটি benign condition—অর্থাৎ সাধারণত ক্ষতিকর নয়। এটি সাধারণত লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর বা ক্যান্সারে পরিণত হয় না। রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি:
“সামান্য জন্ডিস মানেই গিলবার্টস সিনড্রোম”—এটি সঠিক ধারণা নয়।
বরং বলা উচিত—
“সামান্য জন্ডিসের একটি নিরীহ কারণ গিলবার্টস সিনড্রোম হতে পারে; তবে নিশ্চিত হওয়ার আগে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো বিবেচনা করতে হবে।” অযথা ভয় নয়, আবার অবহেলাও নয় জন্ডিস নিয়ে মানুষের মধ্যে দুটি বিপরীত প্রবণতা দেখা যায়। কেউ সামান্য bilirubin বাড়লেই ভয় পেয়ে যান। আবার কেউ বছরের পর বছর জন্ডিস থাকলেও কোনো পরীক্ষা করান না।
দুটিই ঠিক নয়।
প্রথমে বোঝা দরকার কোন ধরনের bilirubin বেড়েছে এবং কেন বেড়েছে। যদি indirect bilirubin সামান্য বৃদ্ধি পায়, লিভারের অন্যান্য পরীক্ষা স্বাভাবিক থাকে এবং প্রয়োজনীয় মূল্যায়নের পর গিলবার্টস সিনড্রোমের সঙ্গে সামঞ্জস্য পাওয়া যায়, তাহলে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। অন্যদিকে bilirubin-এর সঙ্গে যদি অন্যান্য লিভার পরীক্ষাও অস্বাভাবিক হয়, অথবা জন্ডিসের সঙ্গে পেটব্যথা, জ্বর, চুলকানি, গাঢ় প্রস্রাব বা ফ্যাকাশে পায়খানা থাকে, তাহলে কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।

শেষ কথা
অল্প অল্প জন্ডিস দেখলেই ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আবার সব জন্ডিসকে গিলবার্টস সিনড্রোম বলে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। গিলবার্টস সিনড্রোম একটি সাধারণ ও সাধারণত ক্ষতিহীন অবস্থা, যেখানে বিশেষ করে indirect bilirubin সামান্য বাড়তে পারে এবং জন্ডিস ওঠানামা করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
তাই চোখ বা শরীর সামান্য হলুদ দেখালে আতঙ্কিত না হয়ে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা উচিত। কারণ জানা গেলে অযথা ভয় যেমন দূর হয়, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কোনো রোগ থাকলে তা দ্রুত শনাক্ত করাও সম্ভব হয়।
সুতরাং বার্তাটি খুব সহজ—
“সামান্য জন্ডিস মানেই ভয়ংকর রোগ নয়। গিলবার্টস সিনড্রোম হতে পারে। তবে নিশ্চিত না হয়ে ধরে নেওয়া নয়—সঠিক মূল্যায়ন করেই নিশ্চিন্ত হওয়া।”
লেখক
অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবদুল্লা আল ফারুক
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, হেপাটোলজি (লিভার) বিভাগ
চেম্বার: আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০
হটলাইন: ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯