কক্সবাজারের হোপ হসপিটাল গত ৫ই অক্টোবর সোমবার থেকে ৯ই অক্টোবর শুক্রবার পর্যন্ত ৫ দিনব্যাপী ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ গাইনোকোলজি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স (ফিগো) ও ফিস্টুলা ফাউন্ডেশন-ইউএসএ এর সহযোগিতায় প্রসবজনিত ফিস্টুলা সার্জারি কর্মশালা সম্পন্ন করেছে। কর্মশালায় ১৮ জন ফিস্টুলা রোগী শনাক্ত করা হয় এবং তাদের মধ্যে ১৪ জন ফিস্টুলা রোগীর অপারেশন করা হয়। কর্মশালায় প্রশিক্ষক ছিলেন তাঞ্জানিয়ার সিসিবিআরটি হসপিটাল এর ফিগো সনদপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ ফিস্টুলা সার্জন ডা. পিটার মাজিগে ও ডা. জেমস চাপা এবং বাংলাদেশের একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ ফিস্টুলা সার্জন অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার। ফেলো হিসেবে ছিলেন হোপ হসপিটালের ডা. নৃন্ময় বিশ্বাস ও ডা. ফারহানা মুন্নী এবং মামস ইনস্টিটিউট অফ ফিস্টুলা অ্যান্ড উইমেন্স হেলথের ডা. ফাহমিদা জাবিন ও ডা. তাহসিন ইসলাম। বিশ্বব্যাপী সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে চিকিৎসা না পাওয়া বিপুল সংখ্যক ফিস্টুলা রোগীর জন্য যোগ্য সার্জনের সংখ্যা বৃদ্ধি করাই হল এই কর্মশালার প্রধান লক্ষ্য।
দেশের ফিস্টুলা সার্জনদের দক্ষতা উন্নয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানসম্মত পরিচর্যা মাধ্যমে নিরাপদে ও কার্যকরভাবে প্রসবজনিত ফিস্টুলা সার্জারি করার প্রশিক্ষণ দেয়া এই কর্মশালার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। স্থানীয় ডাক্তার এবং প্রশিক্ষণার্থীদের সাধারণ থেকে জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়, শ্রেণিবিন্যাস এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রতিকার করার পদ্ধতি শেখানো হয়েছে। পাশাপাশি অস্ত্রোপচারের পূর্ববর্তী স্ক্রিনিং, পরবর্তী পরিচর্যা এবং সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণ সহ রোগীর সার্বিক সহায়তার উপর জোর দেয়া হয়।
ডা. জেমস চাপা বলেন, কক্সবাজারের হোপ হাসপাতালে আয়োজিত ফিস্টুলা সার্জারি বিষয়ক কর্মশালাটি বাংলাদেশে ফিস্টুলা চিকিৎসা সেবাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। প্রশিক্ষক এবং স্থানীয় সার্জনদের মধ্যকার এই যৌথ কার্যক্রম দক্ষতা হস্তান্তর, পরামর্শদান এবং উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির সাথে পরিচিত হওয়ার মূল্যবান সুযোগ করে দিয়েছে।
প্রসবজনিত ফিস্টুলা হলো মূত্রাশয় এবং/অথবা মলদ্বারের মধ্যে একটা ক্ষত/গর্ত যার ফলে অনবরত প্রস্রাব/পায়খানা নির্গত হয়। যদি কোন কারণে গর্ভবতী মায়েদের বাচ্চা প্রসবে বাধাগ্রস্ত হয় অথবা অতিরিক্ত বিলম্ব হয়, তাহলে প্রজনন অঙ্গের বিভিন্ন স্থানে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, পেশী নষ্ট হয়ে যায়, এবং অনেক সময় পেশী পচে যায়। পচনযুক্ত সেই সব পেশী বাচ্চা প্রসবের ৫-৭ দিন পরে খসে পড়ে এবং সেখানে ছিদ্র সৃষ্টি হয়। এর ফলে তখন প্রস্রাবের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে পায়খানার ওপরও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে প্রসব জনিত ফিস্টুলা বলে। ফিস্টুলায় আক্রান্ত হওয়ায় অনবরত মূত্র এবং মল ঝরার কারণে শরীর থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। ফিস্টুলা আক্রান্ত মায়েরা শারীরিকভাবে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে অক্ষম। প্রায় সব ক্ষেত্রে তাদের স্বামী তাদের পরিত্যাগ করে, এমনকি উনারা বাবা/মা বা অন্যান্য নিকট আত্বীয়দের কাছেও আশ্রয় পান না। সমাজের প্রত্যেক স্তরেই তারা নিগৃহীত হন। একজন ফিস্টুলা রোগীর যে ধরনের মানসিক বিষন্নতা, উদ্ব্যেগ এবং অশান্তি অনুভব করেন সেটা খুবই ভয়াবহ।
প্রসবজনিত ফিস্টুলার প্রকোপ ঊনবিংশ শতাব্দীতে পশ্চিম দেশগুলিতে অনেক ছিলো, তবে উন্নতমানের প্রসূতি সেবার কারণে এটি উন্নত বিশ্বে আজকাল দেখা যায় না। উন্নয়নশীল দেশে যেখানে মাতৃস্বাস্থ্য পিছিয়ে রয়েছে সেখানে প্রসবজনিত ফিস্টুলা দেখা যায়। এই মহিলারা প্রায়শঃ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর যারা গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাস করেন এবং যাদের ভালো স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ নাই। আর্থিক অসুবিধা, ভাল যোগাযোগ ব্যাবস্থার অভাব, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ইত্যাদি কারণে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করার অন্তরায় হয়ে থাকে। প্রায়শঃ তাদের গর্ভধারণ এবং বাচ্চা প্রসবের জন্য গ্রামীণ দাই-মা অথবা পরিবারের সদস্যদের সাহায্য নেয়া হয়। তাই তাদের গর্ভস্থ শিশুর আকার, অবস্থান এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে কোন পূর্ববর্তী ধারণা না থাকায় ডেলিভারি যে বাধাগ্রস্ত হতে পারে বা সিজারিয়ান এর প্রয়োজন হতে পারে কিন্তু এ ব্যাপারে কোন পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয় না। ফল স্বরূপ অনেকের প্রসবজনিত ফিস্টুলা দেখা যায়।
বাংলাদেশে ২০১৬ সালের এক সমীক্ষায় অনুমান করা হয় যে, দেশে প্রায় ১৯ হাজার ৭৫৫ ফিস্টুলা আক্রান্ত মহিলা আছেন এবং প্রতি বছর প্রায় ১,০০০ থেকে ১,২০০ মহিলা নতুনভাবে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত হন। পাশাপাশি প্রতিবছর প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত মহিলা সার্জারির সুযোগ পাচ্ছেন। এই ধরনের ফিস্টুলা আক্রান্ত মহিলাদের অনেকেই কয়েক দশকধরে এই সমস্যায় ভুগছেন। ফিস্টুলা অপারেশন জটিল এবং একমাত্র দক্ষ সার্জনরাই এই অপারেশন করতে পারেন। বাংলাদেশে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন চিকিৎসক আছেন, যারা ফিস্টুলা অপারেশন এ ট্রেনিং প্রাপ্ত এবং দক্ষ।
হোপ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রসবজনিত ফিস্টূলা নির্মুলে ২০১১ সাল থেকে নিরলসভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। হোপ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে ফিস্টূলা অস্ত্রোপচারের শীর্ষস্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান, যেটি এখন পর্যন্ত প্রায় ১২০০টি ফিস্টূলা অস্ত্রোপচার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সম্পন্ন করেছে। হোপ ফাউন্ডেশনের একটি ফিস্টূলা নিবেদিত টিম এবং একটি ফিগো উচ্চস্তরের প্রশিক্ষিত অস্ত্রোপচার টিম রয়েছে। হোপ ফাউন্ডেশন ফিস্টূলা আক্রান্ত রোগীর অস্ত্রোপচারের পরে দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সামাজিক পুনর্বাসনেরও ব্যবস্থা করে থাকে। ডা. সায়েবা আক্তার বলেন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমেই হোপ ফিস্টুলাকে প্রতিরোধ করছে। দেশকে ফিস্টুলামুক্ত করার ক্ষেত্রে হোপের অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি।
ফিস্টুলা অপারেশন করে ভুক্তভোগী মায়েদের সুস্থ করার পাশাপাশি আমাদেরকে অবশ্যই প্রতিরোধের দিকেও নজর দিতে হবে। এই লক্ষ্যে মানসম্মত মাতৃত্ব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে সার্বজনীনভাবে। সকল মায়েদের একজন দক্ষ মিডওয়াইফ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে যাতে করে সবাই গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসবোত্তর সেবা পান। বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পরিমান মিডওয়াইফ প্রশিক্ষিত করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের কাজের ব্যবস্থা করলেই একমাত্র সার্বজনীন মাতৃস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। বাংলাদেশ সরকার মাতৃস্বাস্থ্যে অসাধারণ অগ্রগতি সাধন করেছে এবং এই কৃতিত্বের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এখন সরকারি, বেসরকারি সংস্থাসহ সবার সহযোগিতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় দেশের সমস্ত ফিস্টুলা রোগীকে চিকিৎসার আওতায় এনে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে ফিস্টুলা মুক্ত করা সময়ের দাবি। ফিস্টুলা বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশকে ফিস্টুলা মুক্ত করতে হলে দেশের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থার কারিকুলামে ফিস্টুলাকে পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং দেশে ফিস্টুলা চিকিৎসার বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক।
হোপ হসপিটালে প্রসবজনিত ফিস্টুলা সার্জারি কর্মশালা সম্পন্ন-
বছরে দেশে নতুন করে ১২০০ রোগী আক্রান্ত হচ্ছেন
স্টাফ রিপোর্টার
শরীর ও মন
১ ঘন্টা আগে
১১ অক্টোবর (রবিবার), ২০২৬, ৭ঃ১৬ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
