কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির উপদেষ্টা ও সাবেক কার্যকরী সদস্য প্রকৌশলী ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে পাবনা-৫ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী এই নেতা এখন বিএনপি’র সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের রাজশাহী বিভাগীয় আহ্বায়ক! আওয়ামী লীগের পদে থাকা অবস্থায় তিনি কীভাবে বিএনপি’র সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেলেন— এ নিয়ে পাবনায় শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। ক্ষুব্ধ স্থানীয় বিএনপি নেতারাও। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি। গত শনিবার পাবনা জেলা পরিষদে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত উত্তরবঙ্গীয় মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ড. ইসমাইল হোসেন। তার এই রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন ঘিরেই নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত।
দলীয় সূত্র ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন ইসমাইল। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-৫ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে প্রচার-প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি দলীয় মনোনয়ন ফরমও সংগ্রহ করেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। বর্তমানে তিনি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের ৩ নম্বর সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক এডভোকেট সাবিত ফয়সাল রিজভীও তার আওয়ামী লীগের দলীয় পরিচয় নিশ্চিত করেছেন। আওয়ামী লীগের এমন একজন পদধারী নেতা কীভাবে বিএনপি’র সহযোগী সংগঠনের বিভাগীয় দায়িত্ব পেলেন, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা। জেলা বিএনপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক নূর মোহাম্মদ মাসুম বগা বলেন, গত ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ বিএনপি’র নেতাকর্মীদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। দলে আওয়ামী লীগের লোকজনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। এরপরও ইসমাইল কীভাবে এই দলে এলেন, আমার জানা নেই। জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবিএম ফজলুর রহমান বলেন, সমাজে এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী মানুষ সব সময় ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে সুবিধা নিতে চায়। তাদের কোনো আদর্শিক অবস্থান থাকে না। জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশী একজন ব্যক্তি বিএনপি’র সহযোগী সংগঠনের বিভাগীয় পদে কীভাবে আসীন হলেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সাংবাদিকরা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শুরুতে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন ইসমাইল।
এ সময় তিনি মামলার হুমকিও দেন। পরে তিনি বলেন, আমার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কারও নেই। আমি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তার দাবি, কে বা কারা পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সদস্যের তালিকায় আমার নাম দিয়েছিল। বিষয়টি জানার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। ২০২৩ সালের পর থেকে আমি আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে নেই। তবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। জেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব এডভোকেট মাসুদ খন্দকার সাংবাদিকদের বলেন, ইসমাইলকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তার রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কেও অবগত নই। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এদিকে বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরে এসেছে বলে জানিয়েছেন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত। তিনি বলেন, ইসমাইলের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় আমাদের জানা ছিল না। বিষয়টি একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তার রাজনৈতিক পরিচয় এবং মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা প্রমাণিত হলে মুক্তিযোদ্ধা দলে এটিই হবে তার শেষ দায়িত্ব। ঢাকায় পৌঁছেই তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা ও পদ বাতিলের নোটিশ দেয়া হবে। আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা থেকে বিএনপি’র সহযোগী সংগঠনের বিভাগীয় আহ্বায়ক— এই পদপ্রাপ্তির পেছনে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ঘোষিত পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
