দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে বাংলাদেশ: সরকারি প্রস্তুতি ও টেকসই ভবিষ্যৎ

আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস ১৩ই অক্টোবর-

দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে বাংলাদেশ: সরকারি প্রস্তুতি ও টেকসই ভবিষ্যৎ

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশ তার অনন্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ বদ্বীপ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা (জিবিএম) নদী অববাহিকায় অবস্থিত হওয়ায় দেশটি নিয়মিত বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা, নগর প্লাবন, খরা ও লবণাক্ততাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। স্বাভাবিক ও চরম বন্যার বছরে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রতি বছরই প্লাবিত হয়, যা মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ কৃষি উৎপাদন, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা ও জীবিকার নিরাপত্তাকে ক্রমশ ঝুঁকির মুখে ফেলছে। নদীভাঙন ও উপকূলীয় ক্ষয়ের কারণে বহু মানুষ বসতভিটা ও কৃষিজমি হারাচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে (GED, 2018)|

এই বহুমাত্রিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ঐতিহ্যগত ত্রাণনির্ভর ব্যবস্থা থেকে সরে এসে পরিকল্পিত, আইনভিত্তিক ও পূর্বপ্রস্তুতিকেন্দ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলেছে। এ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২ এবং দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি (Standing Orders on Disaster [SOD], 2019)। আইনটি দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, জরুরি সাড়াদান এবং পুনরুদ্ধারের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে, SOD 2019, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্ব এবং সমন্বয়প্রক্রিয়া নির্ধারণ করছে (GoB, 2012; (MoDMR, 2019)। জাতীয় পর্যায় থেকে আরম্ভ করে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত এই কাঠামোর কার্যকর বাস্তবায়ন দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি এবং দুর্যোগকালীন সাড়াদানকে আরও সুসংহত করছে। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত মহড়া, প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে ঝুঁকির তথ্য হালনাগাদ করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ২০২১-২০২৫ (National Plan for Disaster Management [NPDM]) বাংলাদেশের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দলিল। এটি জাতিসংঘের সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্ক ফর ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন ২০১৫-২০৩০-এর চারটি অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ: দুর্যোগ ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা বৃদ্ধি, ঝুঁকি শাসন শক্তিশালী করা, সহনশীলতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ এবং পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে ‘বিল্ড ব্যাক বেটার’ নীতি অনুসরণ (MoDMR, 2020; UNDRR, 2015)। পরিকল্পনাটিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ, নারী ও যুবসমাজের অংশগ্রহণের গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে। তবে নীতিগত অঙ্গীকারকে কার্যকর ফলাফলে রূপ দিতে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়, জবাবদিহি ও সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। পরিকল্পনার লক্ষ্য অর্জনে নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং ঝুঁকির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যক্রম সংশোধন করাও প্রয়োজন।

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (Cyclone Preparedness Programme [CPP])। বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কর্মসূচি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর, অনুসন্ধান ও উদ্ধার এবং প্রাথমিক সহায়তা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীরা স্থানীয় মানুষের কাছে দুর্যোগসংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ স্থানে যেতে সহায়তা করেন। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস, স্থানীয় পর্যায়ে আস্থা, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী এবং আশ্রয়কেন্দ্রের সমন্বয় প্রাণহানি কমানোর কার্যকর উপায়। তবে আশ্রয়কেন্দ্রে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা এবং পর্যাপ্ত পানি, খাদ্য ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দুর্যোগের সময় নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা উন্নত করা দরকার।

জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, লবণাক্ততা ও জীবিকার সংকট বহু মানুষকে নিজ বসতি ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য করছে। নগরাঞ্চলে এই অভিবাসনের চাপ আবাসন, কর্মসংস্থান, পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় সরকার ২০২১ সালে জাতীয় অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা কৌশলপত্র গ্রহণ করেছে (MoDMR, 2021)| এর লক্ষ্য বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার সুরক্ষা এবং সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন, স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়া কিংবা পরিকল্পিত পুনর্বাসনের মাধ্যমে টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা। এ কৌশল কার্যকর করতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করা, জীবিকার সুযোগ বাড়ানো এবং পুনর্বাসনের সঙ্গে ভূমি, আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা যুক্ত করা প্রয়োজন। বাস্তুচ্যুত মানুষের দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও বদ্বীপের টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ (Bangladesh Delta Plan 2100 [BDP, 2100]) একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে অনুমোদিত এই শতবর্ষী পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো একটি নিরাপদ, জলবায়ু-সহনশীল ও সমৃদ্ধ বদ্বীপ গড়ে তোলা। এতে বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা, পানির নিরাপত্তা, সমন্বিত নদী ও মোহনা ব্যবস্থাপনা, জলাভূমি ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক শাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে (GED, 2018)। পরিকল্পনাটির অভিযোজনযোগ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পরিবর্তিত জলবায়ু, পানিপ্রবাহ ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত হালনাগাদের সুযোগ দিয়েছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রকল্পের যথাযথ অগ্রাধিকার নির্ধারণ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সহযোগিতার ওপর। উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ, জলাভূমি ও নদীর স্বাভাবিক গতিশীলতা রক্ষা করাও জরুরি।

দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও দক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, নদীতীর সংরক্ষণ, উপকূলীয় বনায়ন, বহুমুখী বাঁধ এবং গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বাজেট বরাদ্দের কার্যকারিতা মূল্যায়নে শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, ব্যয়ের স্বচ্ছতা, প্রকল্পের মান এবং উপকারভোগীদের কাছে সুফল পৌঁছানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা জরুরি। স্থানীয় সরকার ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যাপ্ত অর্থ, প্রশিক্ষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি ও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার আরও কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয় এবং প্রকল্পের নিয়মিত নিরীক্ষা নিশ্চিত করা দরকার, যাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রকৃত চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়।
উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাস্তবায়ন ও স্থানীয় শাসনের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। SOD 2019-এ দায়িত্ব ও সমন্বয়ের কাঠামো নির্ধারিত থাকলেও সব ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সক্ষমতা সমান নয়। অর্থের অভাব, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা স্থানীয় পর্যায়ের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। পাশাপাশি, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে ত্রাণ ও অভিযোজন সুবিধা বণ্টনে বৈষম্য তৈরি হয়। এসব সমস্যা সমাধানে স্বচ্ছ উপকারভোগী (কারা প্রকৃত সহায়তা পাওয়ার উপযুক্ত, তা নির্ধারণের বিষয়টি স্পষ্ট করে) নির্বাচন, সামাজিক নিরীক্ষা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন জরুরি। একই সঙ্গে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং সহায়তা বণ্টনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে উদ্যোগগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা বাড়বে।

ভবিষ্যতের দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রকৃতিনির্ভর সমাধান (Nature-based Solutions [NbS]), আগাম পদক্ষেপ (Anticipatory Action) এবং প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হবে। উপকূলীয় বনায়ন, জলাভূমি সংরক্ষণ, পরিবেশসম্মত নদী ও মোহনা ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জ্ঞানের প্রয়োগ প্রাকৃতিক প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে পারে। দুর্যোগের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে আগাম অর্থসহায়তা, খাদ্য ও জরুরি সেবা পৌঁছে দেওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ এবং ভৌগোলিক তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি মানচিত্র ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী শনাক্তকরণ, আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থান নির্ধারণ এবং উদ্ধার কার্যক্রম পরিকল্পনায় সহায়তা করতে পারে। তবে এসব প্রযুক্তির সুফল নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য উপাত্ত, দক্ষ জনবল এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময় অপরিহার্য। প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি তথ্যের সহজলভ্যতা ও স্থানীয় পর্যায়ে তার ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং একটি নিরাপদ, মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, জরুরি সাড়াদান, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গৃহীত উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ভূমিকম্প মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে সমন্বয় জোরদার, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনা, দেশব্যাপী খাল খনন ও পুনঃখনন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। পাশাপাশি, ২০২৬ সালে অনুমোদিত ‘আর্লি ওয়ার্নিংস ফর অল’ জাতীয় রোডম্যাপ বহুমুখী দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সময়মতো পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে (BSS, 2026; WMO, 2026)| এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের ওপর। বিশেষ করে, ৩১ দফা কর্মসূচির উন্নয়ন ও সুশাসনবিষয়ক অঙ্গীকারকে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সমন্বিত করা গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, জীবিকার নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু সহনশীলতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। সমন্বিত উদ্যোগ, জবাবদিহিমূলক শাসন ও জনসম্পৃক্ততার ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি নিরাপদ, দুর্যোগ-সহনশীল ও টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে—এটাই প্রত্যাশা।

অতএব, বাংলাদেশের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে আইনগত কাঠামো, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ন, নদীভাঙন ও বাস্তুচ্যুতির ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় আরও সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির উন্নয়ন ও সুশাসনবিষয়ক অঙ্গীকার এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণে গৃহীত উদ্যোগগুলোকে বিজ্ঞানভিত্তিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত সহায়তা বণ্টন, আর্থিক জবাবদিহি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি জিআইএস, রিমোট সেন্সিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর ব্যবহার এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধান দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারবে। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণনির্ভরতার পরিবর্তে প্রতিরোধ, পূর্বপ্রস্তুতি, অভিযোজন ও টেকসই পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া গেলে বাংলাদেশ একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে পারবে।
লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর জিওইন্টেলিজেন্স পলিসি সাপোর্ট।