যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘নতুন আলোচনা রিকনসিলিয়েশন’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের রাজনীতিতে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা পুনর্মিলনের বিষয়টি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক বিরোধ ও সংঘাতের পর টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় রিকনসিলিয়েশন গুরুত্বপূর্ণ-এমন মত থাকলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় তা কতটা সম্ভব, এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ক্ষমা না চাওয়া এবং ফিরে আসার বিষয়ে নানা হুমকি-ধমকি দেওয়ার ঘটনা এতে বড় বাধা। পাশাপাশি এ প্রশ্নে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও দ্বিধাবিভক্তি রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-দায় ও দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া, অপরাধের বিচার এবং জবাবদিহির মধ্য দিয়ে কি ‘রিকনসিলিয়েশনের’ পথ তৈরি হবে? নাকি তার আগে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন? বিশ্লেষকদের মতে, রিকনসিলিয়েশনের প্রয়োজন আছে। তবে তারা দেশে এখনো সেই পরিস্থিতি বা সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন না। বরং যাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত, তারাই উলটো প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের আস্ফালন করছে বলেও মনে করেন তারা।
ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তির রাজনৈতিকভাবে সমঝোতার সম্ভাবনা আমি দেখি না। কারণ, তারা পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদী শক্তি। তবে তারা যদি নিজেদের ভুল ও অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং প্রকাশ্যে দেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চায়-তাহলে তাদের মধ্যে যারা গুরুতর অপকর্মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয়, তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয়, স্বাভাবিকভাবেই তারা তা করবে না। কারণ, আজ পর্যন্ত তারা কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেনি এবং তাদের অন্যায়ের ভুল স্বীকার বা ক্ষমাও চায়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, রিকনসিলিয়েশনের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কারণ, একটি বিভক্ত জাতি, যারা পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত এবং একে-অপরকে নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত; সেই জাতি বেশি দূর এগোতে পারে না। বরং এই অশুভ প্রতিযোগিতা ও প্রচেষ্টা জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে। আমরা একটি শাসনযোগ্য রাষ্ট্রে পরিণত হতে চাই। তাই রিকনসিলিয়েশনের কোনো বিকল্প নেই। এটা করতে হবে। কিন্তু কীভাবে করতে হবে, সেটিই প্রশ্ন।’ তিনি বলেন, রিকনসিলিয়েশন তখনই হয়, যখন সবাই খোলামনে সামনে এগিয়ে আসে, নিজেদের দোষ স্বীকার করে এবং অনুশোচনা ব্যক্ত করে। অতীতে যেসব ভুলত্রুটি ও অন্যায় হয়েছে, সেগুলো অনুধাবন করে ভবিষ্যতে যেন সেগুলোর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে লক্ষ্যে সবাইকে সামনে এগোতে হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমি তার কোনো লক্ষণ দেখছি না। তিনি আরও বলেন, ‘যারা অন্যায় করেছে, লুটপাট করেছে-তাদের মধ্যে এখনো সেই উপলব্ধি দেখা যাচ্ছে না যে ওই অধ্যায়ের ইতি ঘটিয়ে নতুন করে ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করতে হবে। এটি না হলে রিকনসিলিয়েশন সম্ভব নয়। বরং এখনো আমরা প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের আস্ফালন দেখতে পাচ্ছি। এর মধ্যে কোনোভাবেই সমঝোতা, সম্প্রীতি কিংবা সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের লক্ষণ নেই।
লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় রিকনসিলিয়েশন কঠিন। কিন্তু এটিই প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর ক্ষেত্রে যেমন অপারেশন কঠিন হলেও প্রয়োজন হয়, তেমনই এটিও কঠিন হলেও প্রয়োজন। কারণ, রিকনসিলিয়েশন না হলে আমরা প্রতিশোধের চক্রেই পড়ে থাকব। তিনি আরও বলেন, প্রতিশোধের চক্রে থাকলে অর্থনৈতিকভাবে আমাদের সমৃদ্ধি কখনোই সম্ভব নয়। কারণ, এক দল ক্ষমতায় আসবে, আরেক দল টাকাপয়সা সব নিয়ে পালিয়ে যাবে-এভাবে চলতে থাকলে ২০ কোটি মানুষ মিলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ এখনো তাদের ভুল স্বীকার বা অনুতাপ প্রকাশ করেনি। এটা তাদের আরেকটি ভুল। তবে যারা এখন ক্ষমতায় আছেন, বিজয়ী পক্ষ হিসাবে তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে রিকনসিলিয়েশনের একটি প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। রাষ্ট্রপতি এই উদ্যোগ নিতে পারেন। কিংবা সংসদও এ উদ্যোগ নিতে পারে। তবে উদ্যোগটা নেওয়া দরকার। এতে জনগণের কাছে সরকারের আন্তরিকতারও প্রতিফলন ঘটবে।
সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এ ‘রিকশনসিলিয়েশন’-এর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। সেখানে বক্তারা বলেন, অপরাধের বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনই সমাজের বিভাজন কাটিয়ে উঠতে ‘রিকনসিলিয়েশন’ প্রয়োজন। তবে এজন্য আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিচার হতে হবে। যৌথ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধীদের অনুশোচনা ও শাস্তি ছাড়া ‘রিকনসিলিয়েশন’ হবে না।
ওই কনভারসেশনে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আগে ফ্যাসিস্টদের বিচার, এরপর রিকনসিলিয়েশন হবে। সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের আইনি পরিণতি থেকে আড়াল করার প্রচেষ্টার কারণেই বিশ্বব্যাপী রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হচ্ছে।
বাংলাদেশে রিকনসিলিয়েশন বিষয়টি আলোচনায় আসার পর বিশ্লেষকদের কেউ কেউ দক্ষিণ আফ্রিকা ও রুয়ান্ডার অভিজ্ঞতা সামনে আনছেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রায়েলের মাধ্যমে নাৎসি নেতৃত্বের বিচারের উদাহরণও আলোচনায় আসছে। সমকালীন বিশ্বে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন। বর্ণবাদী শাসনামলে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্য উদ্ঘাটন, ভুক্তভোগীদের কথা তুলে ধরা এবং নির্দিষ্ট শর্তে ক্ষমার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে দেশটি অতীতের সংঘাত মোকাবিলার চেষ্টা করেছে।
নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এ প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক রূপ দেয়। ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘প্রতিশোধ নিলে আমরা কীভাবে ওদের চেয়ে ভালো হলাম।’ তবে দক্ষিণ আফ্রিকার মডেলকে কেবল ‘ক্ষমা করে দেওয়া’ হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। সত্য প্রকাশ, দায় স্বীকার, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং জবাবদিহি-সবই ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে রুয়ান্ডায় ১৯৯৪ সালের গণহত্যার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং দেশীয় পর্যায়ে গাকাকা আদালতসহ বিভিন্ন বিচারিক প্রক্রিয়া চালু হয়। অর্থাৎ পুনর্মিলনের পাশাপাশি অপরাধের বিচার ও দায় নির্ধারণও চলেছে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রায়ালে নাৎসি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার অনুষ্ঠিত হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকা ও রুয়ান্ডা ছাড়াও সিয়েরা লিওন, ঘানা, কেনিয়া, পেরু, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, নেপাল, শ্রীলংকা, ব্রাজিল, তিউনিসিয়াসহ প্রায় ৪০টি দেশে এ ধরনের কমিশন গঠিত হয়েছে। তবে এসব দেশের অভিজ্ঞতা এক নয়; কোথাও ক্ষমা ও পুনর্মিলনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কোথাও বিচার ও জবাবদিহি ছিল প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশেও এ ক্ষেত্রে অপরাধ স্বীকার, বিচার, ক্ষতিপূরণ, ক্ষমা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। এগুলো না হলে তা ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মঙ্গলবার পিআইডিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রিকনসিলিয়েশন নিয়ে সরকারের ভাবনার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান কৌশলী জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ক্রমাগত হুমকির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সরকারের দিক থেকে ‘রিকনসিলিয়েশন’-এর আলাপ করা কঠিন। তাছাড়া আওয়ামী লীগই তা চাচ্ছে না, রিকনসিলিয়েশন তাদের চাইতে হবে। মৌলিক শর্ত নিশ্চিত করা হলে সেই আলাপ শুরু হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
রিকনসিলিয়েশনে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোই সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার বলে মনে করা হয়। বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবে ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও নির্বাচনের ইশতেহারেও ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল। বিএনপির বড় একটি অংশ রিকনসিলিয়েশনের পক্ষে বলেও জানা যায়। কিন্তু পালিয়ে যাওয়া মন্ত্রী, এমপি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সরকারের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা ‘বয়ান’ তৈরি এবং শেখ হাসিনার ক্রমাগত হুমকির কারণে ওই অংশটি এখন আর কথা বলছে না। তাছাড়া সরকার চাইলেও বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি রিকনসিলিয়েশনের ঘোরতর বিরোধী।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, এখন পর্যন্ত রিকনসিলিয়েশনের কোনো বাস্তবতা তৈরি হয়নি। এখানে তাদেরই দায়িত্ব বেশি, যারা দেশে গণহত্যা চালিয়েছে। আওয়ামী লীগ যদি নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত না হয়, আইনের কাছে আত্মসমর্পণ না করে এবং দেশের বাইরে বসে ষড়যন্ত্র তৎপরতা চালায়; তাহলে এ দেশের জনগণ তা মেনে নেবে না। আর জনগণ না মানলে বিএনপিও তা মেনে নেবে না। তিনি বলেন, ‘রিকনসিলিয়েশন’ গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দ। এর জন্য অনুতপ্ত হতে হয়, ক্ষমা চাইতে হয় এবং আইনের মুখোমুখি হতে হয়। তারা আগে এসব প্রক্রিয়া শুরু করুক। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেদিকে যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার যুগান্তরকে বলেন, যারা অপরাধ করেছে, সেই আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত তাদের অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চায়নি। তারা এ বিষয়ে কোনো ধরনের প্রস্তাবও দেয়নি। ফলে রিকনসিলিয়েশন নিয়ে এর বেশি কিছু বলার নেই।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয় নারী শক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন যুগান্তরকে বলেন, রিকনসিলিয়েশনের দিকে অবশ্যই যাওয়া উচিত। কিন্তু যারা অপরাধ করেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দল হিসাবে আওয়ামী লীগের দায় ও জবাবদিহির বিষয়টিও আলোচনায় আসতে হবে। কারণ, আওয়ামী লীগের পরিচয় ব্যবহার করে অনেকে বিভিন্ন অপকর্ম করেছে। দল হিসাবে এখনো আওয়ামী লীগ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে স্বীকার করে না। বরং তারা আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে আখ্যায়িত করে। তিনি বলেন, তবে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মী, যারা কোনো ধরনের হত্যাকাণ্ড বা অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, সেই সমর্থকগোষ্ঠী কোথায় যাবে-সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের জন্য রিকনসিলিয়েশনের সুযোগ থাকা উচিত। তবে তাদের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে স্বীকার করতে হবে।
২০২৪ সালের আগস্টের পরও রিকনসিলিয়েশন নিয়ে রাজনীতিতে আলোচনা ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তখন ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ট্রুথ জাস্টিস কমিশন অথবা ট্রুথ রিকনসিলিয়েশন কমিশনের খুব দরকার আছে। এটা সম্ভবত আমাদের দেশে ১৯৭২ সাল থেকে থাকলেই ভালো হতো। আমরা সবকিছুই খুব কনফরমেশনালভাবে (ঐকমত্যের ভিত্তিতে) নিষ্পত্তি করতে চাই।
তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি অপরাধের দায় স্বীকার করেনি, অনুশোচনাও জানায়নি। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে দলটির নীতিনির্ধারণী মহলের কেউ ক্ষমা চাওয়া, ভুল স্বীকার করা এবং ‘রিকনসিলিয়েশন’ নিয়ে কোনো কথা বলেননি। কিন্তু দলের মধ্যকার একটি অংশ মনে করে, রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে হলে আওয়ামী লীগকে অতীত কর্মকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জনগণের কাছে যেতে হবে।
প্রথম আলো
‘তেল-কয়লার চেয়ে ব্যয় কম, সৌরবিদ্যুতে জোর’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ২০২৪ সালে পাবনার ভবানীপুরে চালু হয় ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। পদ্মার ধু ধু বালুচরে ৪০০ একর জমির ওপর কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। দিনের বেলা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে সৌরবিদ্যুৎ।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহসংকটে যখন দেশের জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, খরচ বেড়ে গেছে, তখন পদ্মার চরের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র মানুষকে বিদ্যুৎ দিচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন হচ্ছে না, পরিবেশদূষণও হচ্ছে না। দামও তুলনামূলক কম।
ভবানীপুরের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি করেছে প্যারামাউন্ট গ্রুপ। ২০২১ সালে তাদের সঙ্গে করা ২০ বছরের ক্রয়চুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ছে সাড়ে ১১ সেন্ট, যা এখন প্রায় ১৩ টাকা। ওদিকে ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিটে ব্যয় ২৮ টাকার বেশি। কয়লাবিদ্যুতের খরচ প্রতি ইউনিট ১৫ টাকার আশপাশে। কয়লায় পরিবেশদূষণের ঝুঁকিও আছে।
অন্যদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল দরপত্র ছাড়াই। তখন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের সরঞ্জামের দামও বেশি ছিল। ফলে বিদ্যুতের দাম বেশি পড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দরপত্র ডেকে প্রতি ইউনিট ৮ টাকার কম দরে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি করা গেছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, কয়লা ও তেলের চেয়ে এই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী।
সৌরবিদ্যুতের এত সুবিধার পরও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ভর করে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যথেষ্ট জোর দেওয়া হয়নি। বিপাকে পড়ে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে কিছুটা জোর দেওয়া হয় সৌরবিদ্যুৎ খাতে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মোট ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি হয়, যার অধিকাংশই ছিল জাবীশ্ম জ্বালানিভিত্তিক। সব মিলিয়ে এখন বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৩৪৭ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর, পানি ও বায়ু) ১৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৮৯ মেগাওয়াট। গ্রিডে যুক্ত মোট বিদ্যুতের মাত্র ৪ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য খাত থেকে। পিডিবির তথ্য বলছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
অবশ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য বলছে, অনেক কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গ্রিডে দেয়। ফলে বর্তমানে গ্রিডে যুক্ত আছে ১ হাজার ৪৯২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। অবশ্য এটি ধরে হিসাব করলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ৫ শতাংশ।
২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের কথা ছিল। তা সম্ভব হয়নি। এরপর ২০২৫ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়। সেটাও হয়নি। কারণ, এ খাতে বিনিয়োগ কম হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল সময়ে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার (বর্তমান মূল্যে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগ হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে।
নতুন বিএনপি সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। এ খাতকে নানা সুবিধা দিচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আগামী গ্রীষ্মের আগে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেই ছাদবিদ্যুতে জোর দেওয়া হয়েছে। এতে অন্তত গত গ্রীষ্মের মতো ভোগান্তি হবে না। ছাদের পাশাপাশি সরকারি জমিতে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দেশি–বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ আছে। ইতিমধ্যে বাগেরহাটের রামপালে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্ধারিত জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন করেছে সরকার।
সংকটে পড়ে সৌরবিদ্যুতে জোর
আওয়ামী লীগ সরকার বিদেশি গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভর করে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করেছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমতে থাকে। ডলারের দাম বাড়ে এবং দেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে।
তখন বিদ্যুৎকেন্দ্র অনেক থাকলেও মানুষকে লোডশেডিংয়ে ভুগতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করতে সম্মতিপত্র দেওয়া হয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রথমে বিনিয়োগকারীকে সম্মতিপত্র দেয় সরকার। এরপর হয় বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে যে ৩৭ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মতি দেওয়া হয়, সেগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাতিল করা হয়। ওই সময় যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মতিপত্র দিয়েছিল দরপত্র ছাড়া। ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর বিশেষ ক্ষমতা আইন রহিত করেন আদালত। তাই ওই কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি করার সুযোগ নেই।
২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর ৩১টি কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে পিডিবি জানায়, তাদের কাছ থেকে কোনো বিদ্যুৎ কিনবে না। এরপর ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে সরকারি সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ১৫টি কোম্পানি উচ্চ আদালতে ১১টি রিট দায়ের করে। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার কয়েক দফা দরপত্র ডেকে গত ২৫ জানুয়ারি ৭টি ও ২৯ জানুয়ারি ৪টি—মোট ১১টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি করে। সেগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ৮১৮ মেগাওয়াট।
নতুন বিএনপি সরকার আসার পর এখন পর্যন্ত ১০টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে দরপত্র জমার সময় একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। ফলে কয়টা দরপত্র জমা পড়েছে, কারা আগ্রহ দেখিয়েছে, তা জানা যায়নি।
কালের কণ্ঠ
‘ভয় ধরিয়েছে বিশ্বব্যাংক, সতর্ক থাকার পক্ষে সবাই’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি কঠিন সংকট পার করছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা।
কর্মসংস্থান কমছে। দারিদ্র্য বাড়ছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ। বিদ্যুৎ-জ্বালানি ঘাটতিতে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। রাজস্ব আয়ও বাড়ছে না কাঙ্ক্ষিত হারে। রপ্তানি খাতে পতনের ধাক্কা লেগেছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটা ‘মুমূর্ষু’ অবস্থায় চলছে।
সদ্য প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নিয়ে এ রকম চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন ঘিরে এখন সর্বত্র এই আলোচনা। রীতিমতো ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের ভয় ধরিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি। অর্থনীতির প্রধান প্রায় সব সূচকই যদি এত নাজুক অবস্থায় থাকে, তাহলে সামনের পরিস্থিতি কী হতে পারে? কিভাবে এই নাজুক অবস্থা থেকে সরকার ঘুরে দাঁড়াবে? অর্থনীতিকে সামনে এগোনোর ‘বিগ পুশ’ বা বড় ধাক্কা কে দেবে? কোন নীতি নেওয়া হলে ব্যবসাবান্ধব হবে? এমন সব আলোচনা চলছে সবার মধ্যে। ব্যবসায়ী-অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সহজ-উদার অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ কৌশল দরকার, যাতে ব্যবসায়ীরা আস্থা পান।
সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন করতে হবে। তাহলেই অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরবে। তখন সরকারও স্বস্তিতে থাকতে পারবে। সরকারের সতর্ক হয়ে কার্যকর, সহজ ও উদার ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করা দরকার।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও বিকেএমইর সাবেক প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টের সঙ্গে খুব বেশি দ্বিমত নেই। হয়তো প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু মোটাদাগে সংস্থাটি দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে যে তথ্যগুলো দিয়েছে, সরকার যদি তা আমলে নিয়ে কাজ করে তাহলে দেশের জন্য ভালোই হবে। আমাদের এখন বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান বাড়াতে গ্যাস-বিদ্যুতে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। নতুন গ্যাসক্ষেত্রগুলো কাজে লাগাতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে নীতি-কৌশলের সংস্কার লাগবে। যেখানে গ্যাস-বিদ্যুৎ বেশি জরুরি নয়; ওই সব খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উৎসাহ দিতে হবে।’
বিশ্বব্যাংক ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হতাশাজনক হার তুলে ধরে বলেছে এটি ৩.৪ শতাংশে নেমেছে। একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ২.২ শতাংশের ঘরে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যা ছিল ৫.৮ শতাংশ। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে এটিই সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। বিশ্বব্যাংক বলছে এই প্রবৃদ্ধি কমার বড় কারণ বিনিয়োগের সংকোচন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০.৫ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০.৭ শতাংশ কমেছে। একই সময় পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪.৮ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপির বাস্তবায়নও রেকর্ড নিচু পর্যায়ে নেমেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে অনেক কারখানা সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে। উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। অনেকে কর্মী ছাঁটাই করেছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। এ বিষয়ে তিনি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিস্থিতি হতাশাজনক। সবাই আশা করেছিল, রাজনৈতিক সরকার এলে আস্থা ফিরবে। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। বেসরকারি খাত চাঙ্গা হবে। এফডিআই আসবে। কিন্তু সাড়া নেই। আসলে পুরো প্রশাসন না সাজিয়ে আর সংস্কার না করে এর সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। যে কারণে আস্থা ফেরেনি। শ্রীলঙ্কা-নেপাল পারছে। আমরা পারছি না। সরকারকে সেবা দিতে হবে। ব্যবসায় খরচ কমাতে হবে। খরচ আসলে কমেনি। বরং তা যদি আরো বেড়ে যায় তাহলে কেন সবাই বিনিয়োগ করবে? দুর্নীতি-ঘুষ বেড়ে গেলে বিনিয়োগ হবে না। এখন এমন অবস্থা, যে লাউ সেই কদু। তার পরও আশা করি সুযোগ আছে।’
আমেরিকান চেম্বার অ্যামচেমের সাবেক প্রেসিডেন্ট সৈয়দ এরশাদ আহমেদ গতকাল বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি বলব ইনভেস্টমন্টে ক্লাইমেট একেবারেই অনুকূলে নেই। আগে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে হবে। আপনি যদি আবারও আন্দোলনের হুমকি দেন, তাহলে অর্থনীতির কী হবে? আগে অর্থনীতিটাকে দাঁড়াতে দেন। সবাই মিলে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখেন। সবকিছু স্বাভাবিক থাকতে দিন। আগে অর্থনীতি ঠিক করেন, পরে মারামারি-কাটাকাটি যা ইচ্ছা করেন। অর্থনীতি যদি ঠিক না হয়, তাহলে এসব করে কী লাভ হবে? ব্যবসা না থাকলে আপনি কার কাছ থেকে ট্যাক্স নেবেন? তাই ঠাণ্ডা মাথায় সরকারকে পরিকল্পনা নিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের গ্যারান্টি দিতে হবে, সবকিছু স্মোথ চলছে। সব স্বাভাবিক আছে। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অবকাঠামো ঠিক রাখতে হবে, বিদ্যুৎ জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। বন্দরকে কার্যকর রাখতে হবে, যাতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ে। বিদেশি বিনিয়োগ শুধু পুঁজি আনে না। এটি প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান বাড়ায়। এগুলো ঠিক করতে হবে সবার আগে।’
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘আন্দোলনের মধ্যেই এনসিটির দায়িত্ব পাচ্ছে ডিপি ওয়ার্ল্ড’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মৌলিক তথ্য গোপন রেখে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে। গত ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনার খসড়া চুক্তি অনুমোদন করে। গতকাল বুধবার জানা গেল, চট্টগ্রাম বন্দরের সর্ববৃহৎ এই টার্মিনাল পরিচালনার কাজটি ডিপি ওয়ার্ল্ডই পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার ঢাকায় চূড়ান্ত চুক্তি হচ্ছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশ (সাবেক বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) আজ বিকেলে ‘কনসেশন’ বা ‘পরিচালনার অধিকার’ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ইসা করিমসহ ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।
বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার বিরুদ্ধে বন্দরের শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যেই সরকার চুক্তিটি করতে যাচ্ছে। এনসিটি নিয়ে চুক্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দর অচল করার ঘোষণা দিয়েছে একাধিক শ্রমিক সংগঠন। এর মধ্যে বিএনপিপন্থি এবং জামায়াত সমর্থিত শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।
জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ১৫ বছর এনসিটি পরিচালনা করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। কিন্তু তারা মোট কত বিনিয়োগ করবে, নতুন কী যন্ত্রপাতি সংযুক্ত করবে, প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাবদ বন্দর কত টাকা ফি পাবে, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করলে বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে– গুরুত্বপূর্ণ এসব বিষয়ে কথা বলতে চাইছে না বন্দর কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বন্দরের পর্ষদে থাকা দুই সদস্য এ ব্যাপারে সমকালকে কিছু জানাতে পারেনি।
জানতে চাইলে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সমকালকে বলেন, ‘দেশি-বিদেশি ও বহুজাতিক তিনটি পক্ষ প্রস্তাব জমা দিলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানিকেই গত ১ সেপ্টেম্বর সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। এখন হবে চূড়ান্ত চুক্তি। দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই সরকার এই চুক্তি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এর বেশি কিছু এখন বলা যাবে না।’
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সমকালকে বলেন, ‘দেশ তো শুধু মন্ত্রীর নয়, আমাদেরও। চুক্তির আগে দেশের ১৬ কোটি মানুষ কেন জানবে না বিদেশি প্রতিষ্ঠান এনে আমাদের কী লাভ হচ্ছে? কত টাকা নতুন বিনিয়োগ করছে তারা? চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করলে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে?’ তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে এনসিটি পরিচালনার বিষয়ে এসব মৌলিক তথ্য দেশবাসীকে জানানো উচিত।
চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান চুক্তি উপলক্ষে এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন। গতকাল বিকেলে তাঁকে ফোন করা হলেও তিনি কল ‘রিসিভ’ করেননি। প্রসঙ্গ জানিয়ে খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি। বন্দরের দুজন বোর্ড মেম্বারের কাছ থেকে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তারা ‘কিছু জানেন না’ বলে মন্তব্য করেন। এ ব্যাপারে কথা বলতে ‘বিধিনিষেধ রয়েছে’ বলেও জানান তারা।
ইত্তেফাক
‘১৪ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আনা হচ্ছে’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার প্রতিবেদন। খবরে বলা হয়, ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসিতে (ইআরপিএলসি) প্রক্রিয়াকরণের জন্য ২০২৭ সালে সৌদি আরব ও আবুধাবি থেকে ১৪ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সৌদি আরামকো ও আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (এডনক) থেকে জিটুজি ভিত্তিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এ তেল আমদানি করবে। বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) সৌদি আরবের সৌদি আরামকো এবং আবুধাবির এডনক থেকে ক্রুড অয়েল আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এ আমদানির অর্থায়নের উত্স হিসেবে আন্তর্জাতিক ইসলামিক বাণিজ্য অর্থায়ন সংস্থার (আইটিএফসি) ঋণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিপিসি জিটুজি চুক্তির আওতায় দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরামকো ও এডনক থেকে ক্রুড অয়েল আমদানি করে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াজাত করে আসছে। ইআরপিএলসির পুরোনো প্ল্যান্টে ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল’ ও ‘মারবান ক্রুড অয়েল’ প্রক্রিয়াকরণ তুলনামূলকভাবে বেশি উপযোগী ও আর্থিকভাবে লাভজনক বলে বৈঠকে জানানো হয়। এছাড়া চাহিদা অনুযায়ী অন্য কোনো দেশ বা সরবরাহকারীর কাছ থেকে এসব ক্রুড অয়েল পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। এ কারণে রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন ও জনস্বার্থে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ক্রুড অয়েল আমদানির প্রস্তাব করা হয়।
অন্যদিকে, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জিটুজি প্রক্রিয়ায় পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আমদানির নীতিগত অনুমোদনের জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আরেকটি প্রস্তাব বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। কমিটি প্রস্তাবটি নীতিগত অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে। এছাড়া ২০২৭ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিপিসির পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে দরপত্র প্রস্তুত ও দাখিলের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ২১ দিন করার প্রস্তাবও অনুমোদন পেয়েছে।
অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের পর অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে মোট আটটি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে। বৈঠক শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, বৈঠকে ‘আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড’ কর্তৃক স্থাপিত ‘আশুগঞ্জ ৪০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল (ইস্ট)’ বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুত্ ক্রয়ে সংশোধিত ট্যারিফ হার নির্ধারণের একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতি কিলোওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুতের ট্যারিফ হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩.৭ মার্কিন সেন্ট (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪.৫৪৩৬ টাকা)। বৈঠকে ‘চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটার গেজ রেলপথকে ডুয়েল গেজ রেলপথে রূপান্তর’ শীর্ষক প্রকল্পের নির্মাণ ও সুপারভিশন কাজের জন্য পরামর্শক নিয়োগের একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় বিএডিসির মাধ্যমে মরক্কোর ওসিপি নিউট্রিক্রপস এসএ থেকে ৪০ হাহার মেট্রিক টন ডিএপি সার আমদানির একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রতি মেট্রিক টন ৮৬৬ ডলার দরে বাংলাদেশি মুদ্রায় এতে ব্যয় হবে ৪২৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
বৈঠকে ‘হাওর এলাকায় উড়াল সড়ক ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জে একটি প্যাকেজ কাজ বাস্তবায়নে ঠিকাদার নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জেরি বিভিন্ন সড়ক-সেতু-কালভার্ট পুনঃনির্মাণ ও পুনর্বাসনে একটি প্যাকেজের পূর্ত কাজ বাস্তবাস্তবায়নে ঠিকাদার নিয়োগের একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে বিভিন্ন সুবিধাসহ ১ হাজার ২০০ শয্যাবিশিষ্ট ১১ তলা (১-বেসমেন্ট) রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্লিনিক্যাল ফ্যাকাল্টি ভবন নির্মাণের একটি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্যান্যের মধ্যে বৈঠকে সুনামগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার এবং বিভিন্ন বিভাগের চিকিত্সা সরঞ্জামাদি ক্রয়ে পৃথক দুটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয় ‘রামপালে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাগেরহাটের রামপালে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমসহ (বিইএসএস) ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের অন্যতম বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হবে। ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৫০২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে দুই হাজার ১২৭ কোটি টাকা পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট ফান্ড থেকে এবং ৩৭৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বিপিডিবির নিজস্ব অর্থায়ন থেকে দেয়া হবে।
প্রকল্পটির অন্যতম আকর্ষণ হলো, সৌরবিদ্যুতের সাথে ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা যুক্ত থাকবে। দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করে প্রয়োজনের সময়ে ব্যবহার করা যাবে। ফলে সূর্যের আলো না থাকা কিংবা উৎপাদন কমে যাওয়ার সময় সৌরবিদ্যুতের সরবরাহ কিছুটা স্থিতিশীল রাখার সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্পের প্রস্তাবিত বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ছয় টাকা ১৮ পয়সা।
৬৮৫ একর জমিতে সৌর কেন্দ্র
বিপিডিবি ২০১২ সালে রামপালে মোট এক হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে। জমিটি এ ও বি- দুই ব্লকে বিভক্ত। ব্লক-এতে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি লিমিটেডের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। ব্লক-বি বিপিডিবির অধীনে।
ব্লক বি’র মোট ৯১৮ দশমিক ৫০ একর জমির একটি অংশ গ্রিনবেল্ট, বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ ও লেকের জন্য নির্ধারিত। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় এ ব্লকের ৬৮৫ একর জমি ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য উপযুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রকল্প এলাকায় ভূমি উন্নয়ন ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজের বড় অংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ফলে নতুন করে বড় ধরনের ভূমি উন্নয়ন ব্যয় প্রয়োজন হবে না। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় তুলনামূলক কম রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিপিডিবির হিসাবে, প্রতি মেগাওয়াট স্থাপনে প্রকল্প ব্যয় প্রায় পাঁচ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
যৌথ উদ্যোগ থেকে সরকারি প্রকল্প
প্রাথমিকভাবে রামপালের এ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। তবে ২০১০ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে নেয়া কার্যক্রম এবং পরবর্তী সময়ে আইনটি বাতিল হওয়ায় ওই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।
পরবর্তী সময়ে অবকাঠামো বিনিয়োগ সহায়তা কোম্পানি (আইআইএফসি) ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করে। সমীক্ষায় ৬৮৫ একর জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াটের গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশও করা হয়েছে, যাতে বিদ্যুতের দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখা যায়।
আজকের পত্রিকা
‘এলপিজি বিক্রিতে কারসাজি’—এটি দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সিলিন্ডারজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়িয়ে নির্ধারণ করলেও তা মানছেন না বিক্রেতারা। তাঁরা আগের মতোই অতিরিক্ত দামে গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। ব্যবসায়ীদের এই অতিমুনাফায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্রেতারা।
কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দামবৃদ্ধি এবং বিইআরসির দাম বাড়িয়ে নতুন দাম করার পরও তা কার্যকর না হওয়ায় ক্রেতারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। তাঁরা বলছেন, বিইআরসির দুর্বল তদারকির কারণেই বিভিন্ন স্তরের বিক্রেতারা মিলেমিশে কারসাজি করে ক্রেতাদের পকেট কাটছে।
আমদানি পর্যাপ্ত থাকলেও এলপি গ্যাসের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি শুরু হয়েছে গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে। সরকার তদারকি শুরু করেছে ২০ সেপ্টেম্বরের পর। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসিও লাইসেন্সধারী কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে। কোম্পানিগুলো এলপি গ্যাসের সংকট নেই বলে জানিয়েছে। এরপরও সংকট কাটেনি। তবে কারা এই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও মূল্যবৃদ্ধির কারসাজির সঙ্গে জড়িত তা এখনো শনাক্ত হয়নি বলে জানা গেছে।
সেপ্টেম্বরে ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডারের বিইআরসির বেঁধে দেওয়া দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু সংকটের অজুহাতে বিক্রি করা হয় ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। কোম্পানিগুলো সংকটের জন্য দায়ী করে ডিলার, পরিবেশক ও বিক্রেতাদের। আর এসব স্তরের ব্যবসায়ীরা দায়ী করেন কোম্পানিগুলোর সরবরাহ কমানোকে। সংকট কাটাতে ও ক্রেতাকে দামে লাগাম টানতে ৪ অক্টোবর বিইআরসি এলপি গ্যাসের দাম কেজিতে ২১ টাকা বাড়ায়। এতে ১২ কেজি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম আগের চেয়ে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়। কিন্তু খুচরা পর্যায়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কোথাও এই দাম মানা হচ্ছে না। গ্রাহকদের স্থানভেদে ও কোম্পানিভেদে কিনতে হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।
গ্রাহকেরা বলছেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এলপি গ্যাসের দাম খুচরা পর্যায়ে কেজিতে অন্তত ৭৬ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন পরিমাণের গ্যাসের সিলিন্ডার থাকলেও সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ১২ কেজির সিলিন্ডার। চলতি মাসে বিইআরসি এলপিজির দাম বাড়ানোর পর সংকট কিছুটা কমলেও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামেই বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গত দুই দিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১২ কেজির একটি এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে এখনো ২ হাজার টাকার বেশি লাগছে। কোথাও কোথাও আগের মতোই ২ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
দেশ রূপান্তর
দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম বারবার সিদ্ধান্ত বদলে ‘অস্বস্তি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে সরকারি চাকরির বাজার এমনিতেই তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ। প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ সরকারি চাকরির জন্য পরীক্ষায় অংশ নেন। দীর্ঘ প্রস্তুতি, একাধিক ধাপের পরীক্ষা এবং বছরের পর বছর অপেক্ষার পর যখন নিয়োগের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছান, তখন কোনো সিদ্ধান্তে চাকরি হারানো কিংবা নিয়োগের নিয়ম হঠাৎ বদলে যাওয়ার আশঙ্কা চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে তৈরি করে চরম অনিশ্চয়তা। এমন বাস্তবতায় বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র আট মাসের মধ্যে চাকরি ও নিয়োগসংক্রান্ত একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কে পড়েছে। কোনো সিদ্ধান্তে আন্দোলন হয়েছে, কোনোটি নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। শেষ পর্যন্ত আন্দোলন বা সমালোচনার মুখে সরকারকে অবস্থান বদলাতেও হয়েছে।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চাকরি নিয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে বিসিএসে পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া প্রার্থীদের একটি অংশকে গেজেট থেকে বাদ দেওয়া, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে পুলিশ ভেরিফিকেশনে প্রার্থী বাদ দেওয়া, সরকারি চাকরির পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কাঠামো পরিবর্তনের চিন্তা এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়ার উদ্যোগ। এসব ঘটনায় চাকরিপ্রার্থী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাজীবন শেষ হলেও পড়াশোনার হাত থেকে রেহাই মেলে না চাকরিপ্রার্থীদের। দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে চাকরির বাজারে নিজেদের দক্ষতা পরীক্ষার লড়াইয়ে নামতে হয়। আগে প্রতিযোগিতা ছিল শ্রেণিকক্ষের সহপাঠীদের সঙ্গে, পরে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন চাকরি ও বিসিএসে তাদের প্রতিযোগিতা করতে হয় পুরো দেশের লাখ লাখ প্রার্থীর সঙ্গে। বিসিএসের ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া বেশ কঠিন। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক যেকোনো একটি ধাপ থেকে বাদ পড়া মানে নতুন করে পুরো জার্নি শুরু করা। একজন প্রার্থীকে একই সঙ্গে তিনটি ধাপে উত্তীর্ণ হতে হয়।
নিয়ম অনুযায়ী তিনটি ধাপে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের চাকরি পাওয়ার কথা থাকলেও এখানে যুক্ত হয় চতুর্থ ধাপ; যেখানে একজন প্রার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে না, তাকে চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করতে হয় নিয়তির ওপর। এই ধাপের নাম ভ্যারিফিকেশন। সর্বশেষ বিসিএসসের গেজেট প্রকাশ হলে বিষয়টি ফের সামনে আসে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশে উত্তীর্ণ, কেউ কেউ ফলাফলে ছিলেন নিজ বিষয়ের শীর্ষে। অথচ দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে দেখা যায় গেজেটে ১ নম্বর বাদ দিয়ে ২ নম্বর দিয়ে শুরু হয়। স্বপ্ন ভেঙে খানখান হয়ে যায়। চারদিকে বয়ে যায় সমালোচনার ঝড়। চাকরিতে দলীয়করণ ও ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানি বন্ধের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেন শিক্ষার্থীরা।
বাদ পড়া কয়েকজন রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না থাকার দাবি করে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের কেউ কেউ নিজ নিজ বিষয়ে মেধাক্রমে শীর্ষস্থানেও ছিলেন। ফলে পিএসসির সুপারিশের পরও কেন তাদের নিয়োগ দেওয়া হলো না এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চাকরিপ্রার্থীদের অনেকে বলেছেন, পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও যদি ভেরিফিকেশনের নামে নিয়োগ আটকে যায়, তাহলে প্রার্থীদের কাছে পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রহসন মনে হয়। বিশেষ করে বাদ দেওয়ার কারণ প্রকাশ না করায় বিষয়টি আরও অস্পষ্ট হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে।
জানা যায়, ৪৯তম (বিশেষ) বিসিএসে পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া ৬৬৮ জনের মধ্যে ৬১১ জনকে নিয়োগ দিয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বাদ পড়েন ৫৭ জন। বাদ পড়া আরও ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে সোমবার (৫ অক্টোবর ২০২৬) রাতে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এর আগে গত ২ অক্টোবর পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন সোমবার জারির প্রক্রিয়া চলছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
‘মোদিকে কী বার্তা ঢাকার’—এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশের কী বার্তা দিলেন ঢাকায় নিযুক্ত হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে মঙ্গলবার দিল্লিতে দিনেশ ত্রিবেদীর সাক্ষাতের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে এ প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বার্তার মধ্যে অন্যতম ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের জন্য ‘উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে’ বাংলাদেশের কতিপয় শর্তের বিষয়টি। এসব শর্তের মধ্যে আছে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার ইস্যু। গ্যারান্টি ক্লজসহ গঙ্গার পানিবণ্টনের নতুন চুক্তি চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বাণিজ্য, জ্বালানিসহ সব ক্ষেত্রে সহযোগিতায় ‘উইন উইন’ পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ বেশ কয়েকটি ইস্যুতে ভারতের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের আশ্বাস চায় বাংলাদেশ।
ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্র জানায়, বার্তার অনেকগুলো সরাসরি রাজনৈতিক পর্যায়কে অবহিত করার লক্ষ্যে ত্রিবেদী নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ত্রিবেদী দিল্লিতে ভারতের সেনাপ্রধানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বৈঠক করেছেন। দিল্লি যাওয়ার আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করে ঢাকার প্রত্যাশার বিষয়গুলো অবহিত হয়েছেন ত্রিবেদী। নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রমতে, বাংলাদেশের বার্তার প্রধান বিষয় হলো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আস্থা ফেরাতে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা। বিশেষ কওে শেখ হাসিনাকে ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত তিনি যেন ভারতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন, সে বিষয়ে দিল্লির তরফে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা অবশ্যই কামনা করে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ওসমান হাদি হত্যার আসামিদেরও ফেরত চায় ঢাকা। অন্যদিকে গঙ্গার পানিবন্টন বিষয়ে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করাও ঢাকার অন্যতম চাওয়া। পাশাপাশি নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের দেওয়া আটটি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার শর্তও ঢাকার রয়েছে। এ ছাড়া সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ বাণিজ্য, জ্বালানি, ভিসা সহজীকরণ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ‘উইন উইন’ সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।
ঢাকার একজন কর্মকর্তা গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বছরের মধ্যেই ভারত সফরে যাবেন বলে আশা করছি। তবে এ সফরের শর্ত হলো, তিনি যেন জনগণকে দেখানোর মতো কোনো অর্জন নিয়ে দেশে ফিরতে পারেন। তিনি গত আগস্টে ভারত গেলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। ফলে তাড়াহুড়া না করে প্রধানমন্ত্রী এমন একটি সফর করতে চাইছেন, যাতে একটি অসাধারণ সফর হয়।’
ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, ভারতের সঙ্গে ন্যায্যতা ও সমতাভিত্তিক একটি সুসম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে চেষ্টা করছে বাংলাদেশ সরকার। দিল্লিরও এ ব্যাপারে আগ্রহ আছে। ফলে ভিতরে ভিতরে দুই দেশের মধ্যে অনেক ধরনের যোগাযোগ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের প্রস্তাব মোতাবেক বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিদল দিল্লিতে পাঠানো হয়েছে। আজ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভারতের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপে বাংলাদেশ অনেকটা সন্তুষ্ট। গত ২৯ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতারা দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারত তা করতে দেয়নি। তা ছাড়া, সম্প্রতি শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটি ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেটি করতেও ভারত অনুমতি দেয়নি। বৈঠকে অংশ নিতে যেসব নেতা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দিল্লি গিয়েছিলেন, তাঁদের ওই অঞ্চলে বিমানযোগে ফেরত যাওয়ার অনুমতিও দেয়নি ভারত। কারণ বিমানে যেতে হলে বৈধ ডকুমেন্ট প্রয়োজন হয়। সবাইকে তাই ট্রেনযোগে ফিরতে হয়েছে। এসব কিছু প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য সহায়ক ও ইতিবাচক দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোদির সঙ্গে বৈঠকে দিনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় বঙ্গোপসাগরীয় কনভারসেশনে শেখ হাসিনার বিষয়ে মন্তব্যের দিক নিয়ে আলোচনা করে থাকতে পারেন। কনভারসেশনের একটি সেশনে ত্রিবেদী মন্তব্য করেন যে শেখ হাসিনা ভারতীয় কোনো বিমানে দিল্লি যাননি। তিনি দিল্লি যাবেন সেটিও তিনি জানতেন না। বরং শেখ হাসিনা অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন বলে টিভির স্ক্রলে দেখা যাচ্ছিল। ওই অবস্থায় তিনি যখন দিল্লিতে চলে যান, তখন তাঁকে অবতরণ করার অনুমতি দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ঠিক কোন দেশে শেখ হাসিনা যেতে চাইছিলেন ত্রিবেদী তার উল্লেখ করেননি। তবে ঢাকার কূটনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে, সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে শেখ হাসিনার আশ্রয়ের বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।
মোদি ও ত্রিবেদীর একান্ত বৈঠক: বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেছেন। গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন একান্ত সাক্ষাতের একটি ছবি প্রকাশ করলেও এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত কিছু বলেনি। হাইকমিশনার ভারতের সেনাপ্রধান ধীরাজ শেঠের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ বৈঠকের আলোকচিত্র সেনা বিভাগ থেকে প্রকাশ করা হয় এবং তাতে লেখা হয়, ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সহায়তা নিয়ে কথা হয়েছে। দিল্লির সূত্র জানায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন শর্তের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছেন। এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক, ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক গড়তে চায়। সম্পর্কের ভিত্তি হলো জনতার কল্যাণ।’ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে মুখপাত্র বলেন, ‘আগেও বলেছি, আমরা আইন ও বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেব।’
