উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রসঙ্গে

ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ২২

উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রসঙ্গে

ফন্ট সাইজ:

ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ১৮১৩ সালের পূর্ব পর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকর্তারা স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার প্রায় অর্ধশতাব্দী পর, ১৮১৩ সালে, ব্রিটিশ সরকার ভারতে শিক্ষা প্রসারের জন্য, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট প্রণীত একটি আইনের অধীনে, কোম্পানিকে বছরে এক লক্ষ রুপি ব্যয় করার নির্দেশ দান করে। কিন্তু কোম্পানি নানা অজুহাতে পরবর্তী ১০ বছর পর্যন্ত এই তহবিল থেকে ভারতীয় শিক্ষাখাতে একটি কানাকড়িও খরচ করেনি। ইতিমধ্যে, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন ও কী ভাষায় পরিচালিত হতে পারে, তা নিয়ে ব্রিটিশ শাসক মহলে নানা তর্ক-বিতর্ক চলছিল। এমতাবস্থায়, ১৮৩৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, ব্রিটিশ রাজনীতিক ও ভারতে গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিল সদস্য থমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে (১৮০০-১৮৫৯) ভারতে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য ওকালতি করে ব্রিটিশ সরকারের কাছে পেশকৃত এক রিপোর্টে লেখেন, “এই মুহূর্তে আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করা প্রয়োজন যাতে ভারতে এমন একটি শ্রেণি তৈরি করা যায়, যে শ্রেণিটি আমাদের ও আমাদের শাসিত লক্ষ লক্ষ ভারতবাসীর ভেতর যোগাযোগ রক্ষায় দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারে- এমন একটি শ্রেণি, যার সদস্যরা রক্ত ও গাত্রবর্ণের দিক থেকে ভারতীয় হলেও রুচি, মতামত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে হবে ইংরেজ।”১৯৫
অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসকশ্রেণির সঙ্গে ভারতের জনগণের ভেতর থেকে একটি ‘ব্রাউন সাহিব’ সম্প্রদায় সৃষ্টি করতে হবে।
ম্যাকলে, একই সঙ্গে, ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নির্দেশিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাৎসরিক এক লক্ষ রুপির তহবিল থেকে আরবি/ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার জন্য আর একটি পয়সাও খরচ না করার জন্য সুপারিশ করেন। পরিবর্তে, ভারতবাসীদের ভেতর থেকে ‘ইংরেজ পণ্ডিত তৈরি করা সম্ভব’ বিবেচনায়, গোটা তহবিলটি কেবলমাত্র ‘ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাদানের জন্য ব্যয় করা উচিত’ বলে তিনি ওকালতি করেন।
ইতিপূর্বে, ১৮৩৩ সালের জুলাই মাসে, হাউস অব কমন্সে উত্থাপিত গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া বিলের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে, ভারতসহ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত অপরাপর উপনিবেশগুলোতে, সাম্রাজ্যের তরফে, ইউরোপীয় শিল্প-সাহিত্য, নৈতিকতা ও আইন-কানুন বিস্তারের দূরপ্রসারী রাজনৈতিক সুফল সম্পর্কে ম্যাকলে বলেন, “ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ ভারতীয়রা কখনো, কোনো দূর ভবিষ্যতে, স্থানীয় ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃত্ব দাবি করতে পারে। এমন দিন আদৌ কখনো আসবে কি-না, আমি জানি না। কিন্তু যদি কখনো আসে, আমি তা নিবারণ কিংবা বাধাগ্রস্ত করার পক্ষপাতী নই। [...] শাসনের মানদণ্ড আমাদের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। কোনো অননুমিত অঘটনের ফলে আমাদের সবচেয়ে অসাধারণ নীতি প্রকল্পগুলো বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। আমাদের সামরিক সামর্থ্য আমাদের বিজয়কে সর্বদা সমুন্নত না-ও রাখতে পারে। কিন্তু জগতে এমন কিছু বিজয় আছে, যা নিরন্তর অটুট থাকে। এমন ধরনের সাম্রাজ্য আছে, কোনো কারণেই যার পতন ঘটে না। [...] আমাদের শিল্পকলা ও নৈতিকতা, আমাদের সাহিত্য আর আমাদের আইন-কানুনের সাম্রাজ্যই হলো সেই অবিনশ্বর সাম্রাজ্য।”১৯৬
ইতিহাসের মনোযোগী পাঠকমাত্রই জানেন, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীসমূহের সম্ভাব্য শৃঙ্খল মুক্তির প্রেক্ষাপটে, মুক্ত উপনিবেশগুলোতে নিজেদের ভবিষ্যৎ স্বার্থ নির্বিঘ্ন রাখার জন্য, ঔপনিবেশিক ভাষা, শিক্ষা, শিল্প-সাহিত্য ও আইন চর্চা প্রসারের গুরুত্ব সংক্রান্ত ম্যাকলের এই অব্যর্থ কৌশল, ব্রিটিশ সরকার তো বটেই, ফ্রান্সসহ অন্যান্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করেছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহের তরফে এই কৌশলের কার্যকারিতা আজ অবধি অক্ষুণ্ন রয়েছে।
যা-ই হোক, ব্রিটিশ সরকারের কাছে ভারতীয় শিক্ষা সম্পর্কিত ম্যাকলের পূর্বোক্ত সুপারিশমালা পেশ করার পরের মাসেই, ১৮৩৫ সালের মার্চে, ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক এই মর্মে ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী এক ‘প্রস্তাব’ পেশ করেন যে, “ব্রিটিশ সরকারের মহান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ভারতের স্থানীয় জনগণের ভেতর ইউরোপীয় সাহিত্য ও বিজ্ঞানের প্রসার ঘটানো, [আর সেজন্য] ভারতে শিক্ষার জন্য বরাদ্দকৃত পুরো তহবিলটি শুধুমাত্র ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে ব্যয় করাই সর্বোত্তম ব্যবস্থা।”১৯৭
ব্রিটিশ সরকার বেন্টিংকের এই প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করেনি, কিন্তু বেন্টিংক-প্রশাসন বাস্তবে এই নীতিই চর্চা করেছে। এই প্রশাসন ১৮৩৭ সালে ভারতীয় রাজস্ব সম্পর্কিত কাজে এবং ১৮৩৮ সালে আদালতে ইতিপূর্বে প্রচলিত ফারসি ভাষাকে হটিয়ে দিয়ে প্রথমে ‘দেশীয় ভাষা’, যেমন উত্তর প্রদেশে উর্দু ও বাংলা প্রদেশে বাংলা, প্রতিষ্ঠা করে। উল্লেখ্য, ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বে শত শত বছর ধরে প্রধানত হিন্দু ও মুসলমান অধ্যুষিত এই অঞ্চলের শাসকগণ হিন্দু-আইনের জন্য সংস্কৃত ভাষায় লিখিত শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদি ও মুসলিম আইনের জন্য আরবি/ফারসি ভাষায় রচিত ইসলামী গ্রন্থাদির ওপর নির্ভর করতেন। ম্যাকলের সুপারিশের আলোকে বেন্টিংকের কোম্পানি-প্রশাসন সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষায় রচিত এইসব গ্রন্থের সরকারিভাবে মুদ্রণ ও প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়।
পরবর্তীকালে, ১৮৫৪ সালে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোর্ড অব কন্ট্রোলের প্রেসিডেন্ট ও ইংরেজ রাজনীতিক, চার্লস উড (১৮০০-১৮৮৫),‘ভারতের সাধারণ শিক্ষা’ সম্পর্কে ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসির (১৮১২-১৮৬০) কাছে পেশকৃত এক ‘ডেসপাচের’ মাধ্যমে, উচ্চশিক্ষা বিস্তারের জন্য ভারতবর্ষে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করেছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘স্বল্পসংখ্যক’ ভারতীয় শিক্ষার্থীর ভেতর ‘ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে’ উন্নত ইউরোপীয় জ্ঞান বিতরণের জন্য, আর ‘বহুসংখ্যক’ ভারতীয়দের জন্য ‘স্থানীয় ভাষায়’ শিক্ষা বিস্তারের ওকালতি করেছিলেন। পাশাপাশি, ম্যাকলের বিপরীতে, ‘বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষায় রচিত সাহিত্য শিক্ষাদানের’ পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কিছুসংখ্যক ভারতীয় শিক্ষার্থীকে উচ্চ শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে চার্লস উড বলেন, এই উচ্চশিক্ষা ভারতীয় তরুণদের ‘শুধু নৈতিক চরিত্রেরই উন্নয়ন সাধন করবে না, ভারতে ব্রিটিশ প্রশাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত বিশ্বস্ত কর্মচারীও জোগান দেবে।’১৯৮ তাছাড়া, তিনি আরও বলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে বিতাড়িত ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ভেতর ‘শ্রম ও পুঁজি বিনিয়োগের অসাধারণ সুফল সম্পর্কে সচেতন করবে’, ‘ভারতের বিশাল সম্পদ উন্নয়নে আমাদের তৎপরতা অনুসরণ করতে প্রাণীত করবে’ এবং সর্বোপরি, আমাদের উৎপাদকশ্রেণির জন্য অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল ও আমাদের সকল শ্রেণির ভোক্তাদের জন্য নানা দ্রব্যের অধিকতর জোগান নিশ্চিত করবে এবং আমাদের দেশে উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা বাড়াতে সাহায্য করবে।১৯৯
ওদিকে, “প্রাচ্য জ্ঞান ও শিক্ষা ভুলে ভরা থাকা সত্ত্বেও’, ‘ভারতের চিরায়ত ভাষাসমূহ যেমন ‘সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি সাহিত্য চর্চা’ জারি রাখার পক্ষে নিজের মত ব্যক্ত করে, চার্লস উড বলেন, “এই সব ভাষায় ধারণকৃত নানা বিষয়বস্তু ভারতীয় ইতিহাসকে জানা ও বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া, হিন্দু ও মুসলিম আইন গবেষণা, এমনকি স্থানীয় ভাষাসমূহের যথার্থ চর্চা ও উন্নয়নের জন্যও, সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষা সম্পর্কে অবহিত থাকা প্রয়োজন।”২০০
স্পষ্টতই, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে ম্যাকলের সুপারিশের মতো, উডের সুপারিশের লক্ষ্যও ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য প্রয়োজনীয় বশংবদ ভারতীয় কর্মচারী উৎপাদন করা। উড আরেকটু এগিয়ে, ব্রিটিশ উৎপাদকশ্রেণির জন্য কাঁচামাল ও ব্রিটিশ পণ্যের জন্য বাজার সম্প্রসারণের স্বার্থকেও শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
উইলিয়াম বেন্টিংকের আমলে ভারতীয় অফিস-আদালতে দেশি ভাষাসমূহ প্রবর্তন করা আপাতদৃষ্টিতে একটি জনস্বার্থপরায়ণ পদক্ষেপ ছিল বইকি, কিন্তু তা ছিল নিতান্তই সাময়িক, কেননা, উপনিবেশবাদের তরফে ভাষার ব্যাপারে এই গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করা অসম্ভব, যা অনতিবিলম্বেই ইতিহাসের সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়ে। সমসাময়িককালের পত্র-পত্রিকা থেকে দেখা যায়, “অফিস-আদালতে দেশি ভাষা চালুর যে নির্দেশ সরকার দিয়েছিল, তা মেনে চলার ব্যাপারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তেমন আগ্রহ দেখায়নি। সরকারের দিক থেকেও তদারকির বিশেষ কোনো ব্যবস্থা ছিল না।”২০১
ওদিকে, পরবর্তী ছয় বছরের মধ্যেই ভারতের পরবর্তী গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ ভারতীয় ঔপনিবেশিক প্রশাসনে ‘ইংরেজি শিক্ষিত ভারতীয়দের’ নিয়োগে অগ্রাধিকার ঘোষণা করেন। এই প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে উপনিবেশিত ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা চর্চাকে উৎসাহিত করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় গোটা ভারতবর্ষে ইংরেজিকে পরিপূর্ণভাবে ‘অফিশিয়াল ভাষা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা হয় এবং কোম্পানি শাসনের অবসানের মাধ্যমে ভারতবর্ষে পরিপূর্ণ ব্রিটিশ শাসন চালু হলে, ১৮৫৭ সালে, ইংরেজিকে আনুষ্ঠানিকভাবেই সারা ভারতবর্ষের ‘অফিশিয়াল ভাষা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ইংরেজিকে ভারতের ‘অফিশিয়াল ভাষা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পেছনে, অবশ্য, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহচর্য ও সহযোগিতায় বিকশিত হিন্দু ‘বাবু সম্প্রদায়ের’ একাংশের বরাবরই আগ্রহের কমতি ছিল না, যা তৎকালীন পত্র-পত্রিকায় মুদ্রিত নানা মতামত থেকে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কলকাতাভিত্তিক সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় ১৮৪৯ সালের ২রা এপ্রিল তারিখে প্রকাশিত একটি দীর্ঘ চিঠিতে বাংলাভাষা বিদ্বেষী এক শ্রেণির বাঙালির ইংরেজিপ্রীতির ব্যাপারে আক্ষেপ প্রকাশ করে এক বাঙালি পাঠক লিখেছিলেন, “আমাদের ভূপতিরা যে দেশীয় ভাষার প্রতি এরূপ অনাদর করিবেন তাহা তখন বড় আশ্চর্য জ্ঞান হয় না [...] যখন আমরা দেখি আমাদিগের দেশীয় ভ্রাতারাই ইহার উচ্ছেদে সম্পূর্ণ সচেষ্ট আছেন, তাহাদিগের ইচ্ছা ইংরাজি ভাষাই এ দেশের ভাষা হইলে সুখের কারণ হয়।”২০২
মাত্র তিন দিনের মাথায়, ২৩শে এপ্রিল, আরেকজন লিখেছিলেন, “স্বদেশীয় ভাষার প্রতি যে রূপ যত্ন করা কর্তব্য দেশীয় মহাশয়েরা তাহা না করাতেই বঙ্গ ভাষার উন্নতির ব্যাঘাত হইয়াছে। [...] দেশীয় লোকেরা পরদেশীয় ভাষা শিক্ষার জন্য অধিক মনোযোগী হওয়াতেই কর্তা সাহেবেরা এতদ্দেশ মধ্যে ইংরেজি বিদ্যা বিস্তার নিমিত্ত অধিক যত্ন করিতেছেন।”২০৩
এই উপনিবেশিত ‘কর্তা সাহেবেরা’ আপন মাতৃভাষার বদলে ঔপনিবেশিক শাসকদের ভাষা নিজেরা রপ্ত করতে ও সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে উদগ্রীব ছিলেন, কারণ বিদেশি শাসকের ভাষা ও সংস্কৃতি রপ্ত করার ভেতর দিয়ে তাঁরা শাসকদের সমতুল্য হয়ে উঠতে চান।২০৪
এই স্থানীয় শ্যামলা ‘কর্তা সাহেবেরা’ জানতেন যে, তাঁরা যতটুকু মাত্রায় সাদা ইংরেজ শাসকের ভাষা ও সংস্কৃতি রপ্ত করতে পারবেন, ঠিক সেই মাত্রায় তাঁরা শাসক ইংরেজের সমকক্ষতা অর্জন করে শাসকশ্রেণির সহজাত সুবিধাদির কিঞ্চিৎ অংশীদার হয়ে উঠবেন। ঔপনিবেশিক শাসকদের তাতে আপত্তি থাকে না, তারা বরং এই প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করেছে। পৃথিবীর সর্বত্রই ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ তাদের উপনিবেশগুলোতে এমন উপনিবেশবাদী স্থানীয় সম্প্রদায় সৃষ্টি করে, পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে, উপনিবেশবাদকে টিকিয়ে রেখেছে।
ইতিমধ্যে, সামান্য অনুসন্ধানেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, ম্যাকলের ভাষা ও শিক্ষানীতি পরবর্তীকালের প্রায় সকল ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতে বাস্তবায়ন করা হয়। বিভিন্ন উপনিবেশের ব্রিটিশ শাসকরা স্থানীয় অশ্বেতাঙ্গ অভিজাতদের মনে-প্রাণে ইংরেজ বা ইউরোপীয় বানানোর জন্য ম্যাকলে প্রদত্ত যুক্তি ও ভাষাই ব্যবহার করতেন। ১৮৩৫ সালে ম্যাকলে কর্তৃক ভারতের শিক্ষাবিষয়ক ‘মিনিটস’ প্রণীত হওয়ার ৮৭ বছর পর, ১৯২২ সালে, আফ্রিকার শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি ভাষার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন সময়ে উগান্ডা, ফিজি ও কেনিয়ার ব্রিটিশ গভর্নর, স্যার ফিলিপ মিশেল (১৮৯০-১৯৬৪), ইংরেজি প্রচলনের রাজনৈতিক ফজিলত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “[ইংরেজি শিক্ষা] এমন একটি সভ্য রাষ্ট্রের বিকাশ ঘটাবে, যেখানে প্রত্যেকের মূল্যবোধ ও মান ব্রিটিশদের মূল্যবোধ ও মানের সমতুল্য হবে, যেখানে জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেকের স্বার্থ ও অংশগ্রহণ থাকবে।”২০৫
আবার, তানজানিয়ার কথিত প্রগতিশীল ব্রিটিশ গভর্নর ডোনাল্ড চার্লস ক্যামেরনের (১৮৭২-১৯৪৮) বিরুদ্ধে ১৯২০ সালে এক উপনিবেশবাদী অভিযোগ উত্থাপিত হয় যে, তিনি নাকি সেদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘আফ্রিকার চারিত্র্য’ বজায় রাখতে চান। কিন্তু গভর্নর ক্যামেরন সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে পরিষ্কার করে বলেন যে, তার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার মাধ্যমে আফ্রিকাবাসীকে তার ‘আফ্রিকান পরিচয় ভুলিয়ে দিয়ে পরিচ্ছন্নমনা ইংরেজে’ পরিণত করা।২০৬
ওদিকে, ম্যাকলে প্রণীত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভাষা ও শিক্ষানীতি ইউরোপের অপরাপর ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোও অনুসরণ করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তৃতীয় ফরাসি রিপাবলিকের জনশিক্ষা মন্ত্রী, আলফ্রেড নিকোলাস র‌্যাবো, ১৮৯৭ সালে ফরাসি উপনিবেশ আলজেরিয়া দখল সম্পর্কে বলেছিলেন, “ফ্রান্সের তরফে প্রথম আলজেরিয়া বিজয় সম্পন্ন হয় সামরিকভাবে, যা ১৮৭১ সালে [বিদ্রোহী] কাবিলিয়া অঞ্চলের নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করে। আলজেরিয়ার ওপর দ্বিতীয় ফরাসি বিজয় নিষ্পন্ন হয় স্থানীয় জনগোষ্ঠী কর্তৃক আমাদের প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার মাধ্যমে। আমাদের তৃতীয় বিজয় সম্পন্ন হবে স্কুলের মাধ্যমে: আমাদের প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলোর উচিত হবে আলজেরিয়ার নানা স্থানীয় ভাষার ওপর আমাদের ভাষার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা, ফ্রান্স ও সারা পৃথিবীতে ফ্রান্সের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের নিজস্ব ধারণাসমূহ স্থানীয় মুসলমানদের ভেতর সঞ্চারিত করা ও তার মাধ্যমে আলজেরিয়ার মুসলমানদের অজ্ঞানতা ও গোঁড়ামিপূর্ণ কুসংস্কারগুলোকে ইউরোপের সহজ কিন্তু স্বচ্ছ বৈজ্ঞানিক ধারণাসমূহ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা।”২০৭
আলজেরিয়ায় ফরাসিদের এই কর্মসূচিও সফল হয়েছিল। ফরাসি শাসনাধীন আলজেরিয়ায় ‘বেনি উই উই’ বা ‘জি, জি হুজুর’ বলে পরিচিত একদল ‘শিক্ষিত’ প্রজার সৃষ্টি হয়েছিল, ‘যারা বরাবরই আলজেরিয়ার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থের পরিপন্থি যেকোনো ফরাসি হুকুম তামিল করে যেত’।২০৮

তথ্যসূত্র:
১৯৫. Macalay Minutes on Education, 1835
১৯৬. ম্যাকলের পুরো বক্তৃতার জন্য দেখুন, https://franpritchett.com/00generallinks/macaulay/txt_commons_indiagovt_1833.html
১৯৭. Eric Ashby, Universities: British, Indian, African, p. 52
১৯৮. চার্লস উডের ডেসপাচের জন্য দেখুন,The_despatch_of_1854,_on_General_education_in_India.pdf)
১৯৯. প্রাগুক্ত
২০০. প্রাগুক্ত
২০১. মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম (সংকলক ও সম্পাদক), ভাষা-বিতর্ক: উনিশ শতক, পৃষ্ঠা: ৬১
২০২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৭৯
২০৩. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৮২
২০৪. দেখুন, Frantz Fanon, Black Skin White Mask, p. 18

২০৫. Ngugi Wa Thiong’o, “Decolonising Education”, Decolonizing Language and Other Revolutionary Ideas, p. 6

২০৬. Walter Rodney, How Europe Underdeveloped Africa, p. 302-303

২০৭. Robert Phillipson, Linguistic Imperialism, p. 113-114

২০৮. Walter Rodney, How Europe Underdeveloped Africa, p. 316