সিরাজ-উদ-দৌলা সম্পর্কে ব্রিটিশ রাজনীতিক ও ভারতে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিল সদস্য থমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে (১৮০০-১৮৫৯) মিলের চেয়েও বেশি রূঢ় মন্তব্য করেছেন। সিরাজকে ইতিহাসের সামনে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য এহেন কুৎসামূলক কটুবাক্য নেই, যা তিনি ব্যবহার করেননি। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত ক্লাইভ সম্পর্কিত এক রচনায়, ম্যাকলে সিরাজ সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে, “প্রাচ্যের স্বৈরশাসকেরা সম্ভবত মনুষ্যপ্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে খারাপ শ্রেণিভুক্ত প্রাণী, আর এই অসুখী বালকটি ছিল তাদের মধ্যে নিকৃষ্টতমদের একজন। এর বোধবুদ্ধির মাত্রা স্বভাবগতভাবেই ছিল নিম্ন পর্যায়ের, আর মেজাজ ছিল উগ্র। তার শিক্ষা-দীক্ষার মান এতই নিম্নমানের ছিল, যা এমনকি কোনো বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের বোধকেও ভোঁতা করে দিতে পারে, বিকৃত করে দিতে পারে উদার মনোভাবাপন্ন ব্যক্তির মনকেও। সে ছিল যুক্তিশীলতাবর্জিত এক বালক, কেননা কেউ তার সঙ্গে কখনো যুক্তিযুক্ত আলাপ করার সাহস করেনি; ছিল স্বার্থপর, কেননা অন্যদের সদিচ্ছার ওপর তার অস্তিত্ব ও বিকাশের অপরিহার্যতার বিষয়টি তাকে উপলব্ধি করতেই দেয়া হয়নি। যৌবনের শুরুতেই লাম্পট্যে লিপ্ত থাকার ফলে তার দেহ-মন উভয়ই শিথিল হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত সুরাসক্তি তার দুর্বল মগজকে অকেজো করে দিয়ে তাকে উন্মাদে পরিণত করে। তার নির্বাচিত সঙ্গীরা ছিল ভাঁড়ামি আর দাসোচিত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত স্তাবক মাত্র। বলা হয়ে থাকে যে, এই তরুণের নৈতিকতা ভ্রষ্টতার সর্বনিম্ন স্তরে অধঃপতিত হয়েছিল, যে স্তরে নিষ্ঠুরতা আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে, [...] কিংবা অপরাধের শাস্তিবিধান না করা, বিপদ এড়িয়ে না চলা ইত্যাদি একধরনের উত্তেজনাকর বিনোদনে পরিণত হয়। তার কৈশোরের আনন্দের উপকরণ ছিল পশু-পাখিদের উৎপীড়ন করা, আর বড় হয়ে খোদ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও বেদনাকে সে আরও প্রাণভরে উপভোগ করতো।”১৫৮ সিরাজ সম্পর্কে এহেন নেতিবাচক সব মন্তব্যকে যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করার জন্য ম্যাকলে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র উল্লেখের প্রয়োজন বোধ করেননি।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে ম্যাকলে দু’টি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। প্রথমত, সিরাজ ‘শিশুকাল থেকেই ইংরেজদের ঘৃণা করতেন’।১৫৯ দ্বিতীয়ত, দু’টি সামান্য ‘অজুহাতে’ সিরাজ ‘বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে’ ইংরেজদের কলকাতাস্থ দুর্গ আক্রমণ করেন। ম্যাকলেরই ভাষায় ‘অজুহাত’ দু’টি হলো, ‘নবাবের প্রাক-অনুমতি ছাড়া ইংরেজরা দুর্গ নির্মাণ করেছে এবং রাজকোষের ‘অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ফেরারি আসামিকে ইংরেজরা সেই দুর্গে আশ্রয় দিয়েছে।’১৬০
স্পষ্টতই, ম্যাকলে যেগুলোকে নিছক ‘অজুহাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, তা যেকোনো দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা, একটি স্বাধীন ভূখণ্ডে কোনো বিদেশি বণিক সম্প্রদায় সাধারণভাবে কোনো প্রকার সামরিক স্থাপনা নির্মাণেরই অধিকার ভোগ করতে পারে না, আর বিশেষ ক্ষেত্রেও স্থানীয় রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে সামরিক স্থাপনা নির্মাণরীতি তো গর্হিত অপরাধ। কিন্তু ইংরেজ বণিকরা ঠিক এই অপরাধটাই করেছিল। বাংলায় ইংরেজদের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে সিরাজের কোনো আপত্তি ছিল না— আপত্তি ছিল ইংরেজ কুঠির অধিকতর সামরিকায়নে। দুর্গ আক্রমণের পূর্বে সিরাজ তাঁর এই নীতিগত অবস্থান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছিলেন। নবাবীতে অভিষিক্ত হওয়ার পরপরই তিনি কোম্পানির কাশিমবাজার কুঠির প্রতিনিধি ওয়াটসকে বিনা অনুমতিতে নির্মিত দুর্গ ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, “আমি তোমাদিগকে বণিক বলিয়াই জানি— যদি বণিকের ন্যায় শান্তভাবে বাস করতে চাও, আমি তোমাদিগকে সমাদরে আশ্রয় দান করিবো। কিন্তু মনে রাখিও— আমিই এ দেশের নবাব, যদি দুর্গপ্রাচীর চূর্ণ করিতে ত্রুটি হয়, তবে কিছুতেই আমাকে সন্তুষ্ট করিতে পারিবে না।”১৬১ কোম্পানির প্রতিনিধি ওয়াটস নবাবের সঙ্গে একমত হয়ে এই মর্মে একটি মুচলেকাও দিয়েছিল। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নবাবের নির্দেশ উপেক্ষা করে। কিছুদিন পর মুর্শিদাবাদভিত্তিক নবাব সিরাজ কলকাতার দুর্গপ্রাচীর ভেঙে ফেলার নির্দেশ সংবলিত একটি পত্রসহ তাঁর একজন ‘সম্ভ্রান্ত সুকৌশলসম্পন্ন প্রতিভাবান ব্যক্তিকে দৌত্যকার্যে নিয়োগ করিয়া কলিকাতাস্থ কোম্পানি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করেন’। কিন্তু ‘ইংরাজেরা নবাবের পত্রের কোনো প্রত্যুত্তর না দিয়া, সেই সম্ভ্রান্ত রাজদূতকে অশেষ প্রকারে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করিয়া নগর-বহিষ্কৃত করিয়া দিলেন’।১৬২ রাজদূতের এই অপমানের পরও সিরাজ ‘ধৈর্যচ্যুত হইলেন না’। তিনি বরং ফের অভিন্ন উদ্দেশ্যে তার ‘চরাধিপতি’ রামরাম সিংহকে রাজদূত হিসেবে কলিকাতার দুর্গে পাঠিয়েছিলেন, ‘কিন্তু তাহার ভাগ্যেও লাঞ্ছনার একশেষ হইল’।১৬৩ এমতাবস্থায়, যেকোনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন স্বাধীন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সামনে এহেন ঔদ্ধত্যপরায়ণ বিদেশি বণিক সম্প্রদায়ের সামরিক দুর্গ আক্রমণ করে গুঁড়িয়ে দেয়া একটি দেশপ্রেমিক কর্তব্য হিসেবে হাজির হতে বাধ্য। সিরাজ-উদ-দৌলা ঠিক সেই দেশপ্রেমিক কর্তব্যই পালন করেছিলেন।
অন্যদিকে, ম্যাকলে যেটাকে দ্বিতীয় ‘অজুহাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, সেটা বরং সিরাজের বিরুদ্ধে ইংরেজের দ্বিতীয় উস্কানি হিসেবে অভিহিত করাই সমীচীন। কেননা, সিরাজ-উদ-দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য তাঁর ঢাকার শাসনকর্ত্রী খালা ঘসেটি বেগম ও খালার অনুগ্রহভাজন দেওয়ান রাজবল্লভের মিলিত প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলিকাতা কর্তৃপক্ষ সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল।
যা-ই হোক, দেওয়ান রাজবল্লভের বিরুদ্ধে সরকারি তহবিল তছরুপের অভিযোগ থাকায় তার হিসাব চাইলে, রাজবল্লভ তাঁর পুত্র কৃষ্ণদাসকে অনেক ধনসম্পদসহ নিজ বাড়ি রাজনগর থেকে সংগোপনে কলিকাতায় ইংরেজদের দুর্গে পাঠিয়ে দেন এবং কলিকাতায় কোম্পানির ‘গভর্নর ড্রেক সাহেব ঘুষের বিনিময়ে কৃষ্ণদাসকে দুর্গের ভেতর আশ্রয় দেন’।১৬৪ ইতিহাসবিদ মজুমদার মনে করেন, ‘সম্ভবত ঘসেটি বেগমের ধনরত্নও এইরূপে কলিকাতায় সুরক্ষিত হইল’।১৬৫ এমতাবস্থায়, নবাবের বারংবার নির্দেশ দান সত্ত্বেও কোম্পানি-কর্তৃপক্ষ কৃষ্ণদাসকে নবাবের কাছে প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকার করে। পৃথিবীর যেকোনো দেশে, যেকোনো আইনে, একটি দেশের রাজকোষের অর্থ তছরুপকারী সরকারি কর্মকর্তাদের, শাসকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, সেদেশে বাণিজ্যরত কোনো বিদেশি গোষ্ঠী কর্তৃক আশ্রয়-প্রশ্রয় দান করা একটি গুরুতর ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হয়, আর তা সেই অপরাধী বিদেশিচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ করা স্থানীয় শাসকের জন্য এক অপরিহার্য দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচিত হয়। সিরাজ সেই দেশপ্রেমিক দায়িত্বই পালন করেছিলেন মাত্র। বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার রূপকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতি ম্যাকলের উপনিবেশবাদী মমত্বই তাঁর এই সহজ রাজনৈতিক সত্য অনুধাবনের অন্তরায় হিসেবে জারি থেকেছে।
অন্যদিকে, সিরাজের ‘শিশুকাল থেকেই ইংরেজদের ঘৃণা করার’ বস্তুনিষ্ঠ কারণ ছিল। কারণ, ‘শিশুকাল থেকেই’ তাঁর মাতামহ নবাব আলিবর্দী খাঁর পরম সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠার সময়ে সিরাজ লক্ষ্য করেছেন যে, বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে ‘বাদশাহি সনদ’ লাভ করেছিল, তার দোহাই দিয়ে, ব্যক্তি হিসেবে, অপরাপর ইংরেজ বণিকরাও বিনা শুল্কে ব্যবসা চালিয়ে রাজকোষের ক্ষতিসাধন করছিল এবং সুযোগ পেলেই বাংলায় নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করার প্রয়াস গ্রহণ করছিল। সর্বোপরি, মৃত্যুশয্যায় আলিবর্দী তাঁর প্রিয় উত্তরাধিকারী সিরাজকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, ইউরোপীয় বণিকরা বাংলায় নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করছে —যা তরুণ নবাবের বিপদের কারণ হতে পারে। তবে, ইউরোপীয়দের মধ্যে বিশেষত ইংরেজদের সম্পর্কে বলেছিলেন, “ইংরাজদিগেরই সমধিক ক্ষমতা বৃদ্ধি হইয়াছে [...] তাহাদিগকেই সর্বাগ্রে দমন করিও। ইংরাজদিগকে দমন করিতে পারিলে অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকেরা আর মাথা তুলিয়া উৎপাত করিতে সাহস পাইবে না। ইংরাজদিগকে কিছুতেই দুর্গ নির্মাণ বা সৈন্য সংগ্রহ করিবার প্রশ্রয় দিও না— যদি দাও, এদেশ আর তোমার থাকিবে না।”১৬৬ অর্থাৎ, দেশ আর স্বাধীন থাকবে না। ইতিহাস সাক্ষী যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সশস্ত্র সহযোগিতায় নবাব সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করার চক্রান্তে লিপ্ত সেনাপতি মীর জাফর আলী খান ও তাঁর দোসরদের সহযোগিতার বিনিময়ে, ক্ষতিপূরণের নামে, ‘কোম্পানি বাহাদুর’কে নগদ ‘এক কোটি রুপি’ ও স্থানীয় ‘ইংরেজ অধিবাসীদের’ ‘পঞ্চাশ লক্ষ রুপি’সহ সংশ্লিষ্ট ভারতীয় ও আর্মেনীয়দের আরও সত্তর লক্ষ রুপি প্রদানের অঙ্গীকার সংবলিত একটি দ্বিপক্ষীয় ‘গুপ্ত সন্ধিপত্র’, ১৭৫৭ সালের ১৭ই মে, কলিকাতার খোদ ‘ইংরাজ দরবারে’ সম্পাদিত হয়েছিল।১৬৭ পরবর্তীকালে, সিরাজকে ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধে সিংহাসনচ্যুত করার পর, ‘গুপ্ত সন্ধিপত্র’ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে অনেক টাকা পরিশোধও করা হয়েছিল। ব্রিটিশ দলিল-দস্তাবেজ অনুযায়ী, সিরাজকে সিংহাসনচ্যুতির বিনিময়ে মীর জাফর আলী খান কোম্পানিকে মোট ১২,৫০০,০০০ পাউন্ড দিয়েছিলেন, তার মধ্যে রবার্ট ক্লাইভ ব্যক্তিগতভাবে ২,৩৪,০০০ পাউন্ড গ্রহণ করেছিলেন।১৬৮
মীর জাফরের কাছ থেকে পরবর্তীকালেও রবার্ট ক্লাইভ এত ‘বিপুল পরিমাণ উপঢৌকন’ লাভ করেছিলেন যে, পিতাকে লেখা এক পত্রে ক্লাইভ বলেছিলেন, তিনি ‘এখন স্বদেশে তার সর্বোচ্চ উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে ভালো জীবন যাপন করতে সমর্থ হবেন।’১৬৯ নিজের অভিজ্ঞতা ও তাঁর মাতামহের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অনুসরণ করে সিরাজ অতএব সঠিক কাজই করেছিলেন।
নবাব সিরাজের দিক থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে আরও একটি ন্যায্য অভিযোগ ছিল
তথ্যসূত্র:
১৫৮. Macaulay, Essay on Clive, pp. 40-41
১৫৯. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৪০
১৬০. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৪১-৪২
১৬১. অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, পৃষ্ঠা: ৮৩
১৬২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৮৫
১৬৩. প্রাগুক্ত পৃষ্ঠা: ৮৫-৮৬
১৬৪. রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলা দেশের ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৬৩-১৬৪
১৬৫. প্রাগুক্ত
১৬৬. অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, পৃষ্ঠা: ৭৭
১৬৭. James Mill, History of British India,Vol. IIIp. 164;
অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, পৃষ্ঠা: ১৮৭
১৬৮. Ramsay Muir, The Making of British India: 1756-1858, p. 59
১৬৯. প্রাগুক্ত, ঢ়. ৫৯-৬০
