শিশু দিবসে শিশুদের সঙ্গে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে অন্যরকম সময় কাটিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি একদল শিশুকে ডেকে নেন মঞ্চে। এরপর শিশুদের সঙ্গে শেয়ার করেন শৈশবের স্মৃতি। কোমলমতি শিশুদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন সানন্দে। এ সময় ‘মানবিক বাংলাদেশ’ গড়তে শিশুদের ‘প্রকৃতি ও পশু-পক্ষী’র প্রতি মানবিক হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। গতকাল বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে ‘শিশু অধিকার দিবস-২০২৬ এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরে শিশু একাডেমির শিশুদের পরিবেশনা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অতিথি সারিতে বসে উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
শিশুদের স্মারক উপহার প্রদান, স্মরণিকা ‘শৈশব’-এর মোড়ক উন্মোচন এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুদের সঙ্গে কথা বলার কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া শিশুদের আঁকা ছবি ও ফটো গ্যালারি পরিদর্শন করেন তিনি। পরে তিনি শিশু জাদুঘর ভবনে যান এবং ভবনটির নিচ তলায় স্থাপিত সোলার প্যানেল ও সাব-স্টেশনের উদ্বোধন করেন। এর আগে সকালে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে দেড় শতাধিক শিশু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমানকে বরণ করে নেয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর একটি পর্ব ছিল শিশুদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর-পর্ব। এই পর্বে অংশ নিতে মঞ্চে উঠেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান। একজন শিশুর প্রশ্ন ছিল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার শৈশবের সবচেয়ে মজার বা প্রিয় স্মৃতি কোনটি যা আপনার আজও মনে পড়ে? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বললেন, শৈশবের মজার স্মৃতি বলতে গেলে, ধরো আমার বাবা তো খুব ব্যস্ত থাকতেন। আমরা, আমি এবং আমার ছোট ভাই খুব যে উনাদের সঙ্গে বাইরে বের হতে পারতাম তা না, আমরা আমাদের স্কুলে থাকতাম, স্কুল নিয়ে, স্কুল হোমওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। তবে একবার আমার আব্বা, আমার আম্মাকে, আমাকে এবং আমার ছোট ভাইকে- আমাদের তিনজনকে নিয়ে উনি বাংলাদেশের সুন্দরবনে গিয়েছিলেন। আমরা তিনদিন ওখানে গিয়েছিলাম বেড়াতে। ওই স্মৃতিটা আমার খুব মনে পড়ে। সুন্দরবনে। ওখানে আমরা একবার নামলাম- হিরণ পয়েন্ট একটা জায়গা আছে। আইল্যান্ডের মতো, ছোট দ্বীপের মতো। ওখানে নামলাম। ওখানে একটা পুকুর ছিল, পুকুরটার পাড়ে যখন আমরা গেলাম তখন ওখানকার লোকাল যারা ছিল তারা একজন দেখালো পুকুরটার পাড়ে আগের দিন রাতের বেলায় বাঘ এসেছিল- রয়েল বেঙ্গল টাইগার পানি খেতে। হ্যাঁ ওই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের, পুকুর পাড়ে কাদা কাদা তো, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একদম ফ্রেশ থাবাটা, ছাপটা ওখানে ছিল, তো ওই স্মৃতিটা এখনো মনে পড়ে।
আরেক শিশুর প্রশ্ন ছিল, আপনি যখন আমাদের মতো ছোট ছিলেন তখন বড় হয়ে কী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন এবং কীভাবে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছালেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, সত্যি কথা বলবো, আসলে তখন কোনো স্বপ্ন দেখতাম না। তোমার মতো যখন ছোট ছিলাম তখন শুধু ভাবতাম যে, বড় হয়ে সব খেলনাগুলো কিনে নেবো আমি-এরকমই ভাবতাম।
‘আমাদের দেশের সব শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে আপনার সরকার ঠিক কী কী পরিকল্পনা করছে’-এমন প্রশ্নের জবাবে সরকারপ্রধান বলেন, আমি মনে করি যে, তোমরা যত সুন্দরভাবে, যত কনফিডেন্টলি বড় হবে বাংলাদেশটা তত একটা কনফিডেন্ট বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। তোমরা যেরকম লেখাপড়া করবে, শুধু লেখাপড়া করলে হবে না। লেখাপড়ার পাশাপাশি তুমি যেরকম আজকে গান করেছো বোধহয়, তোমার যেরকম এই কোয়ালিটিটা আছে। তোমাদের মতো এরকম অনেক শিশু আছে বাংলাদেশে যার বিভিন্ন রকম কোয়ালিটি আছে, কেউ গান ভালো করে, কেউ মিউজিক করতে পারে ভালো, কেউ নাচ করতে পারে, কেউ কবিতা আবৃত্তি করতে পারে, কেউ কোরআন-কেরাত প্রতিযোগিতায় ভালো, কেউ ভালো স্পোর্টসে প্রত্যেককে যতটুকু সম্ভব সুযোগটা করে দেয়া। সো দ্যাট তুমি যখন যত বড় হতে থাকবে, তুমি একজন কনফিডেন্ট মানুষ হিসেবে বড় হও। তুমি যাতে আত্মবিশ্বাস নিয়ে বড় হতে পারো। শুধু লেখাপড়া না, লেখাপড়ার পাশাপাশি মানুষ হিসেবে তোমার মধ্যে আর যেসব কোয়ালিটি আছে, সেগুলো যাতে তুমি ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারো, কোয়ালিটিগুলো যাতে ভালো বলে প্র্যাকটিস করতে পারো, ভালো করে সেই সুযোগটা করে দেয়া।
‘আমরা আজকাল ইন্টারনেটে অনেক সময় কাটাই। পড়াশোনা ও বিনোদনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার কীভাবে করা উচিত বলে আপনি মনে করেন’- এই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারটা তোমার প্রয়োজনের জন্য যেটা প্রয়োজন, তোমার লেখাপড়ার জন্য হোক অথবা তুমি কোন সায়েন্স ফেয়ারে তুমি পার্টিসিপেট করছো সেক্ষেত্রে সায়েন্স ফেয়ারের ওই সাবজেক্টের ব্যাপারে হোক অথবা তুমি কোনো স্পোর্টস সম্পর্কে জানতে চাচ্ছো সেটার ব্যাপারে হোক অর্থাৎ এরকম ব্যাপার যেগুলো থাকবে সেখানে তুমি প্রযুক্তি অবশ্যই ব্যবহার করতে পারো। কিন্তু আনফরচুনেটলি আমরা প্রায়ই দেখি ইদানীং যে সেটি ছোট হোক, বড় হোক অনেকেই আমরা অনেক সময় নিয়ে নিজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়ে আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেক সময় স্পেন্ড করি। আমি মনে করি এটা বোধহয় ঠিক না। ঠিক আছে সোশ্যাল মিডিয়াতে আধা ঘণ্টার জন্য তুমি একবার ব্রাউজ করলে, দেখবে কে কি বললো। বাট সোশ্যাল মিডিয়া হোক বা এই বিষয়টাতে হোক এত লম্বা সময় না থেকে বরঞ্চ তোমার জন্য যেটা ইম্পর্টেন্ট সেগুলোতে টেকনোলজি যেই কাজটা তোমাকে হেল্প করবে, পড়ালেখা হোক বা অন্য যে বিষয় হেল্প করবে সেগুলোতে মোর টাইম স্পেন্ড করা উচিত।
শিশুদের প্রশ্নের ধরন দেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার কাছে মনে হয় প্রশ্নগুলো বড়রা শিখিয়ে দিয়েছে। তোমাদের নিজেদের কিছু থাকলে জিজ্ঞেস করো? যেটা মনের মধ্যে আছে সেটা জিজ্ঞেস করো? এই সময়ের একজন শিশু জানতে চান, প্রধানমন্ত্রী কোন স্কুলে পড়ালেখা করেছেন? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি দুইটা স্কুলে পড়ালেখা করেছি। একটা শাহীন স্কুলে, ল্যাবরেটরি স্কুলেও ছিলাম।
‘আমাদের উদ্দেশ্যে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি কী’-এমন প্রশ্নের জবাবে সরকারপ্রধান বলেন, তোমরা ভবিষ্যতে একজন কনফিডেন্ট মানুষ হিসেবে গড়ে উঠো, যেই মানুষটা বাংলাদেশকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে হেল্প করতে পারবে। তুমি বুঝতে পেরেছো আমি কি বলেছি? ওকে গুড।
‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমি যখন বাসা থেকে বের হই দেখি রাস্তার ফুটপাথের মধ্যে পথশিশুরা বসে আছে, তারা অনেকেই পড়ালেখা করতে পারে না, তাদের সেই টাকা পয়সা নেই অথবা গ্রামের গরিব ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে পারে না। এ সকল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য তাদের মুখে হাসি ফোটাতে ও তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে সরকারের কোনো বিশেষ পদক্ষেপ আছে কি?’ এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তুমি যেটা বলেছো খুবই আনফরচুনেট। আমাদের অনেক লক্ষ লক্ষ শিশু তুমি যেরকম বললা তারা মিনিমাম এডুকেশন থেকে বা মিনিমাম বাচ্চাদের যে ফ্যাসিলিটি সেগুলো থেকে তারা ডিপ্রাইভ। তো আমরা চেষ্টা করছি, তার জন্য সময় লাগবে। আমরা চেষ্টা করছি আস্তে আস্তে এই বাচ্চাগুলোর কাছেও যাতে আমরা এডুকেশন দিতে পারি। তুমি যেরকম সুবিধা পাচ্ছো বিভিন্ন আর্ট কালচার এডুকেশন সবকিছুতে। এই বাচ্চাগুলোকেও যাতে আমরা সেই ফ্যাসিলিটিগুলো পৌঁছে দিতে পারি। আমরা চেষ্টা করছি হয়তো সময় লাগবে। কিন্তু ইনশাআল্লাহ আমরা পারবো।
‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি তো দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বে আছেন এ অবস্থান থেকে কাজ করার অনুভূতি কেমন? এটা কি খুব কঠিন’-এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, এই যে তোমরা এতজন মিলে প্রশ্ন করছো না, ডেঞ্জারাস ব্যাপার এখান থেকে কাজ করা। খুব কঠিন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, তোমাদেরকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হবে। শুধু পড়ালেখা শিখলে হবে না, শুধু খেলাধুলায় ভালো হলেই হবে না। শুধু আর্ট কালচারে ভালো হলেই হবে না। শুধু দু’টির বদলে তিনটি বা তিনটির বদলে চারটি ভাষা জানলেই হবে না। তোমাদের কিন্তু মানবিক হতে হবে। তোমাদেরকে এই দেশের প্রকৃতি, পশুপাখির প্রতিও কিন্তু মানবিক হতে হবে। তোমরা যদি মানবিক হতে পারো, হয়তো আমরা হতে পারিনি যেমনটি হওয়া উচিত ছিল। আমাদের জেনারেশন হয়তোবা আমরা হতে পারি। কিন্তু আমরা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশা করি, আমরা এই বাংলাদেশকে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। শুধু মানুষের প্রতি মানুষ দয়া করবে না। মানুষ প্রকৃতির প্রতি দয়া করবে। মানুষ দয়া দেখাবে। প্রকৃতির সৃষ্টির সবকিছুর প্রতি এবং আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তোমরা সেটি করতে সক্ষম হবে।
শিশুদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, তোমাদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ থাকবে যে, তোমরা যখন বড় হচ্ছো, তুমি চেষ্টা করবে তোমার আশপাশে যে প্রকৃতি আছে, অর্থাৎ তোমার আশপাশে যে গাছপালা আছে- চেষ্টা করবে তোমার বাড়ির আশপাশে হোক কিংবা স্কুলের মধ্যে হোক, তুমি যেখানে যেই জায়গাটি পছন্দ করো, সেই জায়গাটির আশপাশে যদি কোনো গাছ থাকে, যেটি তোমার মতো ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। আজকে হয়তো শিশু আছে তোমার মতন গাছটি, সেই গাছটি যাতে তোমার মতো বড় হতে পারে, তুমি গাছটিকে সাহায্য করো, তুমি গাছটিকে পানি দাও, তুমি গাছটিকে যত্ন করো, যাতে সেটি বড় হতে পারে।
সরকারপ্রধান বলেন, তুমি যেখানে থাকো তোমার বাসায় হোক, তোমার স্কুলে হোক- সেখানে কোনো না কোনো পশুপাখি তোমার আশপাশে আছে। এই পশুপাখিও কিন্তু এই দেশের সম্পদ অর্থাৎ তোমার দেশের সম্পদ, তোমার সম্পদ। তুমি চেষ্টা করো পশুপাখির প্রতি কাইন্ড হওয়ার জন্য, তুমি চেষ্টা করো সেই পশুপাখির প্রতি দয়া দেখানোর জন্য, তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার জন্য।
অনুষ্ঠানে জুবাইদা রহমান বলেন, স্নেহের ছোট বন্ধুরা সকল বাধা-বিপত্তি ছিন্ন করে তোমরা প্রস্ফুটিত হবে, আশা-আকাঙ্ক্ষার সার্থকতার আলোক রশ্মি দুই হাতে বরণ করবে। প্রতিটি শিশুর মধ্যে ঘুমিয়ে আছে অপার সম্ভাবনা। সেই প্রতিভাকে প্রকাশ করতে দিতে হবে নতুন উদ্যমে, নতুন উদ্যোগে। ইনশাআল্লাহ তোমরা সফল হবেই। প্রতিটি শিশুর শৈশব হোক নিরাপদ, প্রতিটি শিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হোক এই আমাদের কামনা। তিনি বলেন, আজ থেকে ৫০ বছর আগে শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে শত বাধা- বিপত্তি সত্ত্বেও শিশু একাডেমি নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এই একাডেমির আঙ্গিনায় ছবি আঁকা, সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও সাহিত্য চর্চায় অগণিত প্রতিভা একটি অভাবনীয় প্রতিষ্ঠান। শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সমপ্রসারণ করেন বলে জানান জুবাইদা রহমান।
মহিলা ও শিশু মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের সচিব রওশন আরা বেগম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
