জাতীয় স্বার্থই সম্পর্কের মাপকাঠি
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের অর্জন নির্ধারিত হবে রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনার জাঁকজমকে নয়, বাংলাদেশের মানুষের প্রাপ্তিতে। সীমান্তে নিরাপত্তা, নদীতে ন্যায্য পানি, বাণিজ্যে সুবিচার এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্তের মর্যাদা—এসবই হতে হবে সম্পর্কোন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি।
নতুন বাস্তবতায় সম্পর্ক পুনর্গঠন
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে দাঁড় করানোর সুযোগ এসেছে। ঘোষিত লক্ষ্য সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়; পারস্পরিক স্বার্থ, সার্বভৌম সমতা ও বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্গঠন। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনার উদ্যোগও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। পর্যালোচনার যৌক্তিক লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্ষতিকর শর্ত চিহ্নিত ও সংশোধন করা; নির্বিচারে সব চুক্তি বাতিল নয়।
আমন্ত্রণের তাৎপর্য ও ভারতের স্বার্থ
ভারতের আমন্ত্রণ বহাল থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর সফরের তারিখ চূড়ান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন যাবত ভারতের আধিপত্যবাদ এবং অসংখ্য অমীমাংসিত বিরোধের সুরাহা না হওয়ার কারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে অংশ না নেওয়া যৌক্তিক। ভারতের স্বার্থ স্পষ্ট। প্রায় ৪,১০০ কিলোমিটার সীমান্ত, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগর, স্থল ও নৌ ট্রানজিট, বিদ্যুৎ–জ্বালানি বাণিজ্য এবং নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির মূল্যায়নেও এই সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে।
বহুমুখী কূটনীতি ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশের বহুমুখী কূটনীতিও দিল্লির হিসাবকে প্রভাবিত করছে। জুনে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে বাণিজ্য, অবকাঠামো, কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের অঙ্গীকার এসেছে। পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের বিকাশও আঞ্চলিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে ভারতের সংসদীয় কমিটি উদ্বেগ জানিয়েছে। এসব বিবেচনায় ঢাকার সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়িয়ে নিজের প্রভাব ধরে রাখা দিল্লির সম্ভাব্য কৌশলগত উদ্দেশ্য হতে পারে। ভারতকে বুঝতে হবে, অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বৃদ্ধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতবিরোধিতা নয়। স্বাধীন বাংলাদেশ নিজের প্রয়োজনেই সহযোগী বেছে নেবে। একই সঙ্গে বহুমুখীকরণ যেন নতুন কোনো একক নির্ভরতায় পরিণত না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
পানির ন্যায্য হিস্যা ও সীমান্তের নিরাপত্তা
সম্পর্কের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন। ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হচ্ছে। তিস্তার চুক্তি অনিষ্পন্ন; অধিকাংশ অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রেও স্থায়ী ও কার্যকর বণ্টনব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশের কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশের সঙ্গে জড়িত এসব প্রশ্ন কেবল সৌজন্যমূলক আশ্বাসে নিষ্পত্তি হতে পারে না। সীমান্তে প্রাণহানি, অননুমোদিত পারাপার ও কথিত ‘পুশ-ইন’ নিয়ে অভিযোগ, বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা এবং ভিসা-সংকটও জনমনে অসন্তোষ তৈরি করছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতার অঙ্গীকারের মূল্য তখনই থাকবে, যখন তা মানুষের নিরাপত্তায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনবে। বন্ধুত্বের দাবি ও সীমান্তের বাস্তবতার ব্যবধান কমানো অপরিহার্য।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে দ্বিপক্ষীয় আস্থার পরীক্ষা
এই মুহূর্তে দু'দেশের সম্পর্কন্নোয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অন্তরায় শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়া ও প্রত্যর্পণের দাবির নিষ্পত্তি দ্বিপক্ষীয় আস্থার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ভারত জানিয়েছে, আবেদনটি আইনি প্রক্রিয়ায় বিবেচনাধীন। সময়ক্ষেপণের উদ্দেশ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে নানাবিধ খোঁড়া অজুহাতে নিজেদের দেশে অবৈধভাবে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিরোধী অপকর্ম চালিয়ের যাওয়ার বিরামহীন পৃষ্টপোষকতা করা কোনো আইন ও যুক্তির মানদণ্ডের সম্পর্কন্নোয়নের অনুকূল পরিবেশ হতে পারে না।
চুক্তি পর্যালোচনা ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতা
অর্থনৈতিক সম্পর্কে আবেগের পরিবর্তে কঠোর হিসাব প্রয়োজন। প্রতিটি চুক্তির ব্যয়–সুবিধা, পারস্পরিকতা, আর্থিক দায়, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং সংশোধন বা বাতিলের শর্ত পৃথকভাবে পরীক্ষা করতে হবে। সমান অঙ্কের লাভই একমাত্র মানদণ্ড নয়; সুবিধা ন্যায্য কি না এবং বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্তের সুযোগ অক্ষুণ্ণ থাকছে কি না, সেটিই মুখ্য। আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সরকারনিযুক্ত পর্যালোচনা কমিটি এর মূল্য ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বচ্ছ দরকষাকষির মাধ্যমে যৌক্তিক মূল্য ও গ্রহণযোগ্য শর্ত নিশ্চিত করা। প্রয়োজন হলে চুক্তির বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান অনুসারে আইনি প্রতিকার বা আন্তর্জাতিক সালিশ বিবেচনা করতে হবে; তবে তা হতে হবে সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ, ব্যয় ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঝুঁকি হিসাব করেই।
সফরের আগে সুস্পষ্ট আলোচ্যসূচি
বিরাজমান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ভারত সফরকে সুনির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি ও প্রস্তুতিনির্ভর কূটনৈতিক উদ্যোগে পরিণত করতে হবে। অগ্রাধিকারে থাকতে হবে গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ, তিস্তার সময়বদ্ধ রোডম্যাপ, সীমান্তে প্রাণহানি ও পুশ-ইন প্রতিরোধ, বাণিজ্য ও ভিসা-সংকট, ১০১টি চুক্তির পর্যালোচনা, বিদ্যুতের মূল্য, প্রত্যর্পণ এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা উদ্বেগ।
সাফল্যের প্রমাণ হবে বাস্তব অর্জন
সফরের সাফল্য যাচাই হবে বাস্তব অগ্রগতিতে: পানিবণ্টনে কার্যকর কাঠামো হয়েছে কি না; তিস্তা আলোচনায় সময়সীমা এসেছে কি না; সীমান্তে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে কি না; বিতর্কিত চুক্তি সংশোধনের পথ খুলেছে কি না; এবং বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি সম্মানিত হচ্ছে কি না। যৌথ ঘোষণার পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তবায়নের দায়িত্ব, সময়সীমা ও অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা।
মর্যাদাপূর্ণ বন্ধুত্বই বাংলাদেশের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ
সফর করাই আত্মসমর্পণ নয়, সফর প্রত্যাখ্যানও স্বাধীনতার একমাত্র প্রমাণ নয়। দেশপ্রেমের কূটনৈতিক প্রকাশ হলো প্রস্তুতি, দক্ষ দরকষাকষি এবং জাতীয় স্বার্থে দৃশ্যমান অর্জন। ভৌগলিক কারণে বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্র। এই বাস্তবতা কোনো পক্ষকে অন্যের ওপর আধিপত্যের অধিকার দেয় না। বাংলাদেশের পথ হতে হবে মর্যাদাপূর্ণ বন্ধুত্ব, ন্যায্য সহযোগিতা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত। ভারতের আমন্ত্রণ সদিচ্ছা, কৌশল কিংবা উভয়ের সমন্বয়—যা-ই হোক, বাংলাদেশের জবাবের ভিত্তি একটাই: জনগণের স্বার্থ ও রাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদা।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর, ঢাকার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ
মোদাসসের হোসেন খান, বীর প্রতীক
মত-মতান্তর
১ ঘন্টা আগে
৬ অক্টোবর (মঙ্গলবার), ২০২৬, ১২ঃ১০ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
