উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রসঙ্গে

ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ২১

উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রসঙ্গে

ফন্ট সাইজ:

পৃথিবীর প্রতিটি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার প্রতিটি বিজিত কিংবা দখলকৃত উপনিবেশে আপন আপন শাসন-শোষণকে নির্বিঘ্নে জারি রাখার জন্য উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর ভেতর থেকে এক একটি নতুন অভিজাত শ্রেণি সৃষ্টি ও তার ক্ষমতায়ন করেছে, যে শ্রেণির স্বার্থান্ধ সদস্যরা আপন আপন দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে, বিদেশি ঔপনিবেশিক শক্তির সক্রিয় তাঁবেদারিতে নিয়োজিত থেকেছে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণি তাঁদের উপনিবেশগুলোতে এই শ্রেণিটি তৈরি করার জন্য, স্থানীয় পর্যায়ে বৈষয়িক কায়েমি স্বার্থ সৃষ্টির পাশাপাশি, নিজেদের ভাষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছে। ঔপনিবেশিক ভাষায় শিক্ষিত ও ঔপনিবেশিক শিক্ষায় দীক্ষিত স্বদেশ ও স্বজাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাকারী এই স্বার্থান্ধ শ্রেণিটি বিভিন্ন উপনিবেশে বিভিন্ন নামে পরিচিতি লাভ করেছে। পর্তুগিজ উপনিবেশগুলোতে এদের নাম ছিল ‘আসিমিলাদো’ বা ‘সিভিলিসাদো’, ফরাসি উপনিবেশগুলোতে এরা পরিচিত ছিল ‘আবসিমিলে’ বা ‘এভোলুয়ে’ হিসেবে। ব্রিটিশদের ভারতীয় উপনিবেশে সাধারণভাবে এদের নাম ছিল ‘ব্রাউন সাহিব’, আর ভারতের বাংলা প্রদেশে এই শ্রেণিটি ‘বাবু সম্প্রদায়’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

‘আসিমিলাদো’ ও ‘আসিমিলে’ দিয়ে বোঝানো হতো, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘অ্যাসিমিলেটেড’ হয়ে যাওয়া— উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর ভেতর থেকে যারা ঔপনিবেশিক ভাষা ও শিক্ষার জারকরসে নিষিক্ত ও বিকশিত হয়ে, ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণির সঙ্গে মিলেমিশে একীভূত হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে, ‘সিভিলিসাদো’ বলতে বোঝানো হতো, উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর যেই অংশটি ঔপনিবেশিক ভাষা, শিক্ষা ও ভাবধারায় দীক্ষিত হয়ে ‘অসভ্য’ থেকে ‘সভ্য’ হতে পেরেছে। উল্লেখ্য যে, পর্তুগিজ শাসিত গিনিতে ঔপনিবেশিক ভাষায় উচ্চতর ঔপনিবেশিক শিক্ষালাভের পর কোনো স্থানীয় ‘অসভ্য’ নাগরিককে ‘সভ্য’ হিসেবে কর্তৃপক্ষীয় স্বীকৃতি অর্জনের জন্য তাকে একটি ‘সভ্যতার পরীক্ষায়’ উত্তীর্ণ হতে হতো।১৮৪

‘এভোলুয়ে’ বলতেও কাছাকাছি ধরনের ব্যক্তিকেই বোঝানো হতো, যে কিনা ঔপনিবেশিক শক্তির ভাষা, শিক্ষা ও ভাবধারায় দীক্ষিত হওয়ার মাধ্যমে ‘বিবর্তিত’ হয়ে উপনিবেশবাদীদেরই একজন হয়ে উঠেছে। এই শ্রেণিটিই, সাধারণভাবে, আপন আপন দেশে ঔপনিবেশিক শক্তির স্বার্থ উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করেছে।

উপনিবেশবাদী শিক্ষা উপনিবেশগুলোর শিক্ষার্থীদের কীভাবে আপন জনগোষ্ঠী ও তার সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেমন ধরনের ‘এভোলুয়ে’ বা ‘ব্রাউন সাহিব’ তৈরি করেছে, তা তুলে ধরার জন্য ইউরোপ ও এশিয়া থেকে এক জোড়া উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

পশ্চিম আফ্রিকার ফরাসি উপনিবেশ সেনেগালের একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান ব্লেইস ডিয়াগ্নে (১৮৭২-১৯৩৫) ফ্রান্সে লেখাপড়া শিখে কিছুকাল সেদেশের কাস্টসম ডিপার্টমেন্টে চাকরি করেন। পরে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন এবং উপনিবেশিত সেনেগালের একটি অঞ্চল থেকে কালো আফ্রিকা বংশোদ্ভূত প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ফ্রান্সের ‘চেম্বার অব ডেপুটিসের’ সদস্য নির্বাচিত হন। সেনেগালে তাঁর নির্বাচনী এলাকার জনগণকে পুরোপুরি ফরাসি নাগরিকত্ব মঞ্জুর করে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনি ফরাসি আইনসভাকে প্রভাবিত করেছিলেন এবং তার বিনিময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ফরাসি শাসিত সেনেগালের তরুণদের ফরাসি সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিয়ে ফ্রান্সের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। যা-ই হোক, ফরাসি শিক্ষা ডিয়াগ্নেদের মতো কালো মানুষদের ‘আফ্রিকার বাস্তবতা ও জীবনপ্রণালি থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল যে, তাঁরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে দাবি করতেন যে, তাঁরা ইউরোপীয় এবং ইউরোপীয়-ই থাকবেন’।১৮৫ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও তার ইংরেজি শিক্ষা ভারতবর্ষসহ তার উপনিবেশগুলোতে ব্লেইস ডিয়াগ্নের মতো বহু বিভ্রান্ত মানুষ তৈরি করেছে। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষার বহুলালোচিত বাঙালি লেখক নীরদচন্দ্র চৌধুরী (১৮৯৭-১৯৯৯) তার একটি উদাহরণ।

নীরদচন্দ্র চৌধুরী বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে ‘ভূমির চিরস্থায়ী ব্যবস্থা’-প্রসূত এক ‘ভূস্বামী’ পরিবারে জন্মেছিলেন। চৌধুরীর নিজের কথায়, “আমি জন্মে ও বাল্যশিক্ষায় বাঙালি ভদ্রলোক, অর্থাৎ ভূস্বামীবংশীয় বাঙালি। [...] কিন্তু আমি বারো বৎসর বয়সে সেই জীবনের অবস্থান, পূর্ববঙ্গ ছাড়িয়ে কলিকাতায় আসি, সেখানেই আমার মনের পূর্ণ পরিণতি হয়। তবু আমি কলিকাতার বাঙালি হইতে পারি নাই, বত্রিশ বৎসর বাস করা সত্ত্বেও হই নাই। কলিকাতা হইতে যে মানসিক ধর্ম পাইয়াছিলাম উহা ইউরোপীয়।”১৮৬

কলকাতায় শিক্ষা ও কর্মজীবনের একাংশ শেষে নীরদ চৌধুরী ‘আটাশ বৎসর দিল্লিতে বাস’ করেন, কিন্তু সেখানে তিনি কখনোই কোনো ভারতীয় ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না। তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘দিল্লিতে ইংরেজিতে কথা বলিয়াছি, বাহিরে ইংরেজি পরিচ্ছদও পরিয়াছি।’১৮৭

নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি ‘অবাঙালিও’ হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, “প্রথমত ইংরেজি শিক্ষার জন্য অল্প বয়স হইতেই আমার মানসিক ধর্ম ইউরোপীয় হইয়া গিয়াছিল, বিলাতবাসের ফলে আচরণও অনেকটা ইউরোপীয় হইয়া গিয়াছে।”১৮৮

ইতিমধ্যে নীরদ চৌধুরী কতোটা ‘ইউরোপীয়’ কিংবা ‘ইংরেজ’ হয়ে গিয়েছিলেন, নিজেই তা লিখে রেখে গেছেন। চৌধুরীর ভাষায়, “আমি যে ইংরেজের প্রশংসা করি ও ইংরেজের জীবন ও সভ্যতা সম্বন্ধে গৌরব অনুভব করি, তাহা ইংরেজের অধীন বাঙালী হিসাবে নয়, করি নিজেকে ইংরেজ মনে করি বলিয়া; অর্থাৎ জন্মে না হইলেও মানসিক ধর্মে এবং আংশিকভাবে জাতীয়তাবোধেও, আমি ইংরেজ, ইহা মনে করিয়া। সুতরাং বলিবো, ইংরেজ জাতির কীর্তি সম্বন্ধে আমার গর্ব জাতীয় গর্ব, পরাধীন ব্যক্তির বিজাতীয় শাসকের উদ্দেশ্যে স্বার্থ প্রণোদিত অথবা দাস মনোবৃত্তি-প্রসূত স্তুতি নয়।”১৮৯

তিনি আবার ‘ইংরেজের আধুনিক জীবন ও আচরণের কঠিন সমালোচনাও’ করেছেন। কিন্তু কেন? চৌধুরী নিজে এ প্রশ্নের একটি কৌতুকজনক উত্তর দিয়েছেন বইকি! তিনি লিখেছেন, “কেহ যদি নিজের দেশ ও জাতিকে সত্যই ভালোবাসে তাহা হইলে সে উহাদের কোনোটিরই বিপথে যাওয়া সম্বন্ধে উদাসীন হইতে পারে না। আমি যে বর্তমানে ইংরেজের সমালোচনা করি উহা প্রকৃত প্রস্তাবে দেশের দোষ সম্বন্ধে দেশপ্রেমিকের অসহিষ্ণুতার ফল।”১৯০

নীরদ চৌধুরী অবশ্য নিজের পরিচয় হিসেবে ‘খাঁটি বাঙালি’র দাবি কখনোই পরিত্যাগ করেননি। একই সঙ্গে, নিজেকে ‘ইংরেজ-বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রবলতার সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন যে, “রামমোহন হইতে আরম্ভ করিয়া শরৎচন্দ্র পর্যন্ত সকল মহান বাঙালিকেই ‘অবাঙালি-ইংরেজ’ অথবা ‘ইংরেজ-বাঙালি’ বলা যাইতে পারে।”১৯১

স্পষ্টতই, ফরাসি ভাষায় শিক্ষা লাভ করে সেনেগালের ব্লেইস ডিয়াগ্নে যেমন ‘ফরাসি’তে পরিণত হয়েছিলেন, ভারতের নীরদ চৌধুরীরা ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা লাভ করার মাধ্যমে ‘ইংরেজে’ পরিণত হয়েছিলেন।

যা-ই হোক, ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ তাদের অধিকৃত দেশগুলোতে নিজেদের ভাষা ও শিক্ষাকে কেন ও কীভাবে ব্যবহার করে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাকে প্রলম্বিত করেছে, তা বর্ণনা করার পূর্বে একটি স্বতঃসিদ্ধ সত্যের ওপর আলোকপাত করা প্রয়োজন; আর তা হলো, ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ প্রথমে উপনিবেশিত জনগণের ভেতর কোনো প্রকার শিক্ষা বিস্তারের প্রকল্পই গ্রহণ করেনি। কেননা, তারা বিশ্বাস করতো শিক্ষার আলো উপনিবেশিত জনগণের ভেতর রাজনৈতিক সচেতনতার জন্ম দেয়, যা যথেচ্ছ শাসন-শোষণ জারি রাখার জন্য বিপজ্জনক। সংশ্লিষ্ট উপনিবেশবাদী কর্মকর্তারা মনে করতো, ‘শিক্ষার আলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে শুধু ঔপনিবেশিক স্বার্থের পরিপূরক নিঃস্বার্থ শ্রমদানেই নিরুৎসাহিত করবে না, ঔপনিবেশিক প্রভুদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করারও প্রেরণা জোগাবে’।১৯২

আর সে কারণে, পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনির ব্রিটিশ প্রশাসক একদা সেদেশে শিক্ষা বিস্তারের পক্ষপাতী একজনকে ‘গাছতলায় মৌখিক শিক্ষাদানের ভেতরই তার তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাঁর জেলা-কর্মকর্তাদের স্কুলের পেছনে একটি পয়সাও খরচ না করার আদেশ জারি করেছিলেন’।১৯৩

আবার, কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোনো নির্দিষ্ট উপনিবেশে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা অপরিহার্য হয়ে উঠলে, উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীগুলো যেন বেশিমাত্রায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে না পারে, তা ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতো। যেমন, বেলজিয়াম। বেলজিয়াম ১৮৯০ সালে আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম অঞ্চল ও সবচেয়ে সমৃদ্ধ এলাকার একটি, কঙ্গো, দখল করে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক শাসকরা শিক্ষা বিস্তারের প্রশ্নে অন্যান্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির তুলনায় খানিকটা উদারতা প্রদর্শন করলেও, তা প্রাথমিক শিক্ষার পরিধি অতিক্রম করেনি। কেননা, বর্ণবাদী বেলজিয়ান শাসকশ্রেণি মনে করতো, আফ্রিকায় ‘স্থানীয় জনগণকে ধীরে ধীরে সভ্য করে তুলতে হবে’। আফ্রিকার উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর ভেতর মাধ্যমিক শিক্ষা বিস্তারের বিরুদ্ধে তার ‘যুক্তি’ ছিল, ‘তাকে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রদানের ব্যাপারটি আসলে, একটি বাচ্চা শিশুকে যবের নরম মণ্ড খেতে দেয়ার পরিবর্তে মাংসের শক্ত টুকরো চিবুতে দেয়ার মতো’। স্বভাবতই, বেলজিয়ান কর্তৃপক্ষ তার উপনিবেশগুলোতে ১৯৪৮ সালের পূর্বে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চিন্তাও অনুমোদন করেনি। এটা অতএব আশ্চর্যের ব্যাপার নয় যে, ১৯৬০ সালে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার সময় এক কোটি ত্রিশ লক্ষ মানুষ অধ্যুষিত কঙ্গোতে বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৬ জন

তথ্যসূত্র:

১৮৫. Simin Fadayee, Global Marxism: Decolonization and Revolutionary Politics, p. 112

১৮৬. Walter Rodney, How Europe Underdeveloped Africa, p. 303

১৮৭. নীরদ চন্দ্র চৌধুরী,‘শ্রেষ্ঠ বাঙালি কে?’শ্রী নীরদ চন্দ্র চৌধুরী: নির্বাচিত প্রবন্ধ, পৃষ্ঠা: ১২৬

১৮৮. প্রাগুক্ত

১৮৯. প্রাগুক্ত

১৯০. শ্রী নীরন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী, “আমি একাধারে বাঙালী ও ইংরেজ”, আমার দেবোত্তর সম্পত্তি, পৃষ্ঠা: ১১৫

১৯১. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১১৫-১১৬

১৯২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১১৬, ১১৭

১৯৩. Eric Ashby, Universities: British, Indian, African: A Study in the Ecology of Higher Education , p. 366

১৯৪. প্রাগুক্ত