বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের দেয়া ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
গত বছরের ১৬ মার্চ হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শেষে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রেখে এ আদেশ দেন। তবে রায়ের পর উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে এখনও মামলাটির শুনানি সম্পন্ন হয়নি। আপিল নিষ্পত্তিতে আরও ৪-৫ বছর সময় লাগার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। অন্যদিকে, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন সাজা না পান এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়—সে ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষের স্পষ্ট অবস্থানের কথা জানিয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়।
এ বিষয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু মানবজমিনকে বলেন, মামলার বর্তমান ধারাবাহিকতা ও আপিল বিভাগের কার্যতালিকার জট অনুযায়ী শুনানি শুরু হতে আরও ৪ থেকে ৫ বছর সময় লেগে যেতে পারে। তিনি দাবি করেন, সম্পূর্ণ নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মক্কেলরা কারাগারে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।
আইনজীবী দুলু এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন ও মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলামের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন।
আসামিদের নির্দোষ দাবি করে তিনি বলেন, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন শারীরিকভাবে অক্ষম, তার হাতের লিগামেন্ট ছেঁড়া ছিল। এমন শারীরিক অবস্থায় কারও পক্ষে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করা অসম্ভব।
অপর আসামি মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঘটনার সময় অমর্ত্য রাজশাহীতে অবস্থান করছিলেন। এমনকি সিআইডি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে যে ২০ জনের মতো ছাত্রকে চিহ্নিত করেছিল, সেই তালিকায়ও অমর্ত্যের নাম ছিল না। তা সত্ত্বেও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হতে আরও কয়েক বছর লাগতে পারে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, চূড়ান্ত শুনানিতে তারা ন্যায়বিচার পাবেন।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল মানবজমিনকে বলেন, বিচার প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন অন্যায়ের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তিনি জানান, রাষ্ট্রপক্ষ বা অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় কোনো মামলা অন্ধভাবে পরিচালনার পক্ষপাতী নয়। সবার জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য।
রাষ্ট্রের অবস্থান ও বিচার নিষ্পত্তিতে বিলম্ব আপিল শুনানির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন বহাল রেখে হাইকোর্ট রায় দিলে, সংক্ষুব্ধ হয়ে আপিল বিভাগে যাওয়ার প্রাথমিক দায়িত্ব দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের। সেখানে রাষ্ট্রপক্ষ বিবাদী হিসেবে থাকে এবং শুনানি বিলম্বিত করার কোনো সুযোগ রাষ্ট্রপক্ষের নেই।
আইনের শাশ্বত নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাজার অপরাধী শাস্তি পেলেও একজন নিরপরাধ ব্যক্তি যেন অন্যায়ের শিকার না হন। কেউ লঘুপাপে গুরুদণ্ড পেলেন কি না বা হাইকোর্টের রায়ে কোনো আইনি বিচ্যুতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখে সামগ্রিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিচারক সংকট ও বিচারাধীন মামলার জটের কারণে অনেক সময় দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হয় না। তবে জনগুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর আপিল যেন দ্রুত নিষ্পত্তি পায়, সে লক্ষ্যে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় তৎপর রয়েছে।
হাইকোর্টের রায় ও পর্যবেক্ষণ: ২০১৯ সালের ৬ই অক্টোবর দিবাগত রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মীর নির্মম নির্যাতনে নিহত হন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (ইইই) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। পরে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন এবং পরবর্তীতে ১৬ই মার্চ নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেন, ভিন্নমত পোষণ কোনো অপরাধ হতে পারে না। রাজনৈতিক তকমা বা সন্দেহের অজুহাতে পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও হলের ‘গেস্টরুম টর্চারের’ নৃশংস সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরিহার্য। দীর্ঘ সময় ধরে এ নৃশংসতা চললেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও হল কর্তৃপক্ষের এগিয়ে না আসাকে সামগ্রিক ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন আদালত।
একই সঙ্গে ঘটনাস্থলে উপস্থিত আসামিদের কেউই আবরারকে বাঁচাতে বা আঘাত ঠেকাতে এগিয়ে আসেনি বলে পর্যবেক্ষণে বলা হয়।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সবাই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেতাকর্মী।
মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ২০ আসামি: এ মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা আসামিরা হলেন, মেহেদী হাসান রাসেল, মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ সকাল, মো. মনিরুজ্জামান মনির, মো. মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মো. মাজেদুর রহমান মাজেদ, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম তানভীর এবং হোসাইন মোহাম্মদ তোহা।
এছাড়া মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল জেমি, মো. শামসুল আরেফিন রাফাত, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ সেতু, মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম এবং মুজতবা রাফিদেরও মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে।
আর যে পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রয়েছে তারা হলেন মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, মো. আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত সাহা এবং ইশতিয়াক আহমেদ মুন্না।
এ মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের সময় তিন জন আসামি পলাতক ছিলেন। তারা হলেন মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম এবং মুজতবা রাফিদ।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির পলায়ন ও আত্মসমর্পণ: ২০২৪ সালের ৬ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বিদ্রোহ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগে দেয়াল টপকে মুনতাসির আল জেমিসহ বেশ কিছু বন্দি পালিয়ে যান। তিনি এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর মোনতাসির আল জেমি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের আদালতে হাজির হয়ে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেন। আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে পুনরায় কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
