ভিডিও ধারণ করার জেরে সাংবাদিকদের মারধর করার অভিযোগ উঠেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর। এতে চার সাংবাদিক গুরুতর আহত এবং ১০ জনের বেশি সাংবাদিক আহত হয়েছেন। আগামীর সময়ের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলামের মাথা ফেটে গেছে। রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
গুরুতর আহতদের মধ্যে হলেন—বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আরিফ উজ্জামান কোরবান, আগামীর সময়ের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল ও দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজু। এছাড়া আরও দশ জন সাংবাদিক আহত হন। বর্তমান তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন।
অভিযুক্তরা হলেন—রাবি ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, ছাত্রদলের সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম, সহদপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম অথিসহ ৮-১০ নেতাকর্মী।
সরজমিন ও প্রত্যক্ষদর্শীসূত্রে জানা যায়, গতকাল রাত ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেট থেকে মিছিল নিয়ে জিয়াউর রহমান হল গেটে আসেন ছাত্রদল নেতারা। এসময় তাদের হাতে বস্তা ভর্তি দেশীয় অস্ত্র রামদা, চাপাতি, হকি স্টিক, পাইপ, ব্যাজবলসহ অন্যান্য বিভিন্ন অস্ত্র দেখা যায়। পরে প্রক্টর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসলে তারা অস্ত্র লুকিয়ে ফেলে। পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হল গেইটে অস্ত্র হাতে দেখতে পেয়ে দৈনিক সমকাল ও আজকের পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ভিডিও করার জন্য এগিয়ে গেলে প্রক্টরের উপস্থিতিতে সমকালের প্রতিনিধিকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো শুরু করে। পরে আজকের পত্রিকা প্রতিনিধির মোবাইল কেড়ে নিতে তেড়ে আসে। এক পর্যায়ে সেখানে বিডিনিউজ ২৪.কম-এর প্রতিনিধিকে পেটানো শুরু করে। পরে প্রক্টর সাংবাদিকদের হলের ভেতরে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দেন।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য সাংবাদিকরা উপস্থিত হলে সেখানে দ্য ডেইলি স্টারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, আগামীর সময়ের প্রতিনিধিকে বেধড়ক মারধর করেন। এতে আগামীর সময় প্রতিনিধির মাথা ফেটে যায়। এছাড়াও অন্য সাংবাদিকরা রক্ষা করার জন্য এগিয়ে গেলে তাদের 'পুতে ফেলা'র হুমকি দেন শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবিব।
এ বিষয়ে রাবি ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি সেন্ট্রাল ছাত্রদলকে জানিয়েছি। দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর মাহবুবর রহমান বলেন, ‘আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছি কিন্তু পুলিশও ভয়ে পালিয়ে গেছে।’
আহত সাংবাদিক সমকালের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজু বলেন, ‘ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা রড, স্টিক, চাইনিজ, কিরিচ নিয়ে জিয়া হলের সামনে অবস্থান নিলে পেশাগত দায়িত্ব পালনে আমরা কয়েকজন সাংবাদিক সেখানে যাই। এক পর্যায়ে ভিডিও ধারণ করার সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীবের নেতৃত্বে অন্তত ১০ জন নেতা-কর্মী আমাদের কয়েকজনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এরপর শিক্ষার্থীরা আমাদের হলের ভেতরে নিয়ে যায়। পরে ডেইলি স্টারের সাংবাদিক ঘটনাস্থলে এলে তাকেও বেধড়ক মারধর করে তারা।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেভাবে সাংবাদিকদের হামলা করেছে এটা কোনো ছাত্র বা ছাত্র সংগঠনের কাজ হতে পারে না। এটা স্বাধীন সাংবাদিকতায় বাধা।’
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে দৈনিক আগামীর সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা হলের শহীদ জিয়াউর রহমান হলে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছে এমন তথ্য পেয়ে সংবাদ সংগ্রহে ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই কোনো কথাবার্তা ছাড়াই ছাত্রদল নেতা আহসান হাবীব লোহার রড দিয়ে আমার ওপর অতর্কিত হামলা করেন। সঙ্গে আমার আরও তিন সহকর্মীর ওপরও এলোপাতাড়ি হামলা চালানো হয়।’
জাহিদুলের ভাষ্য, ছাত্রদলের কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধ ছিল না। এমনকি হামলায় অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা আহসান হাবীবকেও তিনি ভালোভাবে চিনতেন না। তিনি বলেন, ‘ছাত্রদলের কারও সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ ছিল না। এমনকি ছাত্রদলের যে নেতা আমার ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছেন, তাকেও আমি ওইভাবে চিনতাম না। কোনো কারণ ছাড়াই আমার ওপর আক্রমণ শুরু করেন।’
জাহিদুল বলেন, ‘রডের প্রচণ্ড আঘাতে আমার মাথা ফেটে যায়। এছাড়া আমার হাঁটুর মধ্যে লিগামেন্টের সমস্যা দেখা দেয়। আমার দুই হাতেও আঘাত করা হয়েছে।’
