বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পান রপ্তানির ক্ষেত্রে পান রপ্তানিকারক সমিতির বাধ্যতামূলক ছাড়পত্র বা প্রত্যয়নপত্র নেয়ার গত ৬ই আগস্ট হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। এর ফলে নির্ধারিত সরকারি শুল্ক ও রাজস্ব দিয়ে যে কেউ স্বাধীনভাবে পান রপ্তানি করতে পারবেন বলে জানিয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রবিবার হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি শেষে চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক এ স্থগিতাদেশ দেন।
এর আগে বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রিট পিটিশন নং-৫৪১৯/২০২৬-এর ওপর ৬ই আগস্ট আদেশ দেন হাইকোর্ট। ওই আদেশে বলা হয়, বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতির প্রত্যয়নপত্র ছাড়া বাংলাদেশ থেকে পান রপ্তানি করা যাবে না। এর ফলে পান রপ্তানির ক্ষেত্রে সমিতির প্রত্যয়নপত্র নেয়া বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। হাইকোর্টের ওই আদেশের কার্যকারিতা চ্যালেঞ্জ করে রাষ্ট্রের পক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (বাণিজ্য সংগঠন) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সিভিল পিটিশন দায়ের করেন।
হাইকোর্টে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তাকে সহযোগিতা করেন মন্ত্রণালয়ের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. তাজুল ইসলাম। অন্যদিকে বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতির পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যোষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল ও সাবেক বিচারপতি অ্যাডভোকেট ফয়সাল মোহাম্মদ ফায়েজী।
শুনানি শেষে সুপ্রীম কোর্টে নিজ কার্যালয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মানবজমিনকে বলেন, বাণিজ্য সংগঠন আইনের আওতায় ২০০৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি আদেশ জারি করে পান রপ্তানিতে সমিতির সদস্যপদ গ্রহণের কথা বলেছিল। তবে সেই আদেশের অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতি একটি বড় ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। রপ্তানির প্রতিটি চালানের আগেই সমিতির ছাড়পত্র নেয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে কৃত্রিম অচলাবস্থা ও বাধার সৃষ্টি করা হয়েছিল। বিষয়টি নজরে আসার পর সরকার সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত করে বাণিজ্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এর বিরুদ্ধে পান সমিতি হাইকোর্টে গেলে আদালত চালানের আগে সনদ নেয়ার আদেশ দেন। অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, রাষ্ট্র রাজস্ব ও কাস্টমস শুল্ক নির্ধারণ করবে, সেখানে একটি বেসরকারি সমিতির কাছে জিম্মি হয়ে সনদ নিয়ে পণ্য রপ্তানি করা গ্রহণযোগ্য নয়। চেম্বার আদালতের আদেশের ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপসহ বহির্বিশ্বে পান রপ্তানির পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত হলো এবং কোনো সিন্ডিকেটের বাধা ছাড়াই ব্যবসায়ীরা পণ্য পাঠাতে পারবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে পান সমিতির পক্ষের আইনজীবী ফয়সাল মাহমুদ ফয়েজী জানান, বাণিজ্য সংগঠন আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পণ্যের রপ্তানিকারকদের ট্রেড অর্গানাইজেশনের সদস্যপদ নেয়া বাধ্যতামূলক। অতীতে সবজি রপ্তানির নামে অবৈধভাবে পান পাঠানোসহ নানা অনিয়ম ঠেকাতে দীর্ঘ ২০ বছর আইনি লড়াই শেষে আপিল বিভাগের রায়েই রপ্তানিকারকরা সমিতির সদস্য হতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, পান রপ্তানিতে দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের আন্ডার-ইনভয়েসিং (কম মূল্য প্রদর্শন) ও হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপাচার হয়ে আসছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি পানের প্রকৃত মূল্য ৪ থেকে ৫ ডলার হলেও মাত্র ১ ডলার রপ্তানি মূল্য দেখিয়ে বাকি অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন করা হতো। এ ধরনের অর্থপাচার ঠেকাতে এবং সরকারি প্রণোদনার সঠিক ব্যবহারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রতিটি চালানে সমিতির প্রত্যয়নপত্র নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল।
আইনজীবী ফয়েজী আরও বলেন, এনবিআরের নির্দেশনা বাস্তবায়নে হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছিলেন, যা আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত সাময়িক স্থগিত করে পূর্ণাঙ্গ শুনানির জন্য পাঠিয়েছেন। আদালতের নির্দেশনার প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংকিং নথিপত্রে রপ্তানি মূল্যের গরমিল ও আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, যা আপিল বিভাগের চূড়ান্ত শুনানিতে উপস্থাপন করা হবে।
