ফিফা আসিয়ান কাপে টানা তিন ম্যাচে হার। শেষ ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলের লজ্জাজনক হার। বাংলাদেশ দলে কোচ টমাস ডুলি বললেন, ‘হ্যাঁ, এমনই (নিজের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় হার)। আশা করি এটাই শেষ।’ ফিফা আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের প্রথম আসরটা কাটলো ব্যর্থতায়। র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে মাঠে নামাটাই কেবল প্রাপ্তি। অবশ্য টুর্নামেন্টে খেলার আগে কোচ টমাস ডুলির বড় প্রত্যাশা ছিল না। তার শিষ্যরাও আসিয়ান কাপকে শেখার বড় পাঠশালা হিসেবেই নেন। যার ফল তিন ম্যাচে ১৩ গোল হজমের অভিজ্ঞতা। সাফের আগে ইন্দোনেশিয়ায় এমন অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই টমাস ডুলি চাননি। যতটুকু লড়াকু মানসিকতা দেখতে চেয়েছেন, সিঙ্গাপুর ম্যাচে একটু ছাপ দেখা গেলেও মালয়েশিয়া ও স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে অসহায় আত্মসমপর্ণ করে বাংলাদেশ।
ইন্দোনেশিয়া সফরের শেষটা এত বিবর্ণভাবে হবে সেটা ডুলি বোধহয় কল্পনা করেননি। দুই কিংবা তিন নয়, একেবারে ৯ গোল হজম। দেশের ফুটবল ইতিহাসে এমন লজ্জাজনক অধ্যায় আছে কেবল দুইবার। সেই দুঃসহ স্মৃতিগুলোও প্রায় চার যুগ আগের। ১৯৭৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে এবং ১৯৮২ সালে ইরানের কাছে ৯ গোল হজম করে বাংলাদেশ। এই দুই ম্যাচ থেকে ইন্দোনেশিয়া ম্যাচে পার্থক্য তাদের জালে বাংলাদেশের দুটি গোল। নভেম্বরে ঘরের মাঠে সাফের আগে র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা দলের বিপক্ষে এত বড় ব্যবধানে হার যে কাক্ষিত নয়, সেটা ডুলির কথায় স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, এমনই (নিজের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় হার)। সবকিছুই একবার না একবার ঘটে। আশা করি, এটাই শেষ।’ টুর্নামেন্ট শুরুর আগে র্যাঙ্কিংকে সামনে এনেছিলেন ডুলি। টুর্নামেন্টে শেষেও একই কথা ডুলির। তিনি বলেন, ‘আপনি র্যাঙ্কিং দেখলেই বুঝতে পারবেন। আমাদের র্যাঙ্কিং যদি ১৮১ হয়, আর তাদের র্যাঙ্কিং যদি ১১৬,১৩০ বা ১৪০ হয়, তবে তা স্পষ্ট করে যে র্যাঙ্কিংয়ে আপনি যত ওপরে থাকবেন, দল ও খেলোয়াড় হিসেবে আপনারা ততটাই ভালো। কারণ সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে তাদের অনেক বেশি ম্যাচ জিততে হয়েছে। যখন আপনি তাদের মুখোমুখি হবেন, তখনই এই পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দলগুলো দক্ষিণ এশিয়ার দলগুলোর চেয়ে ফুটবল বিচারে এগিয়ে।’ আসিয়ান কাপে নিজেদের চেয়ে র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা দলগুলো বিপক্ষে খেলার সুযোগ পায় বাংলাদেশ। হামজা-জামালদের চেয়ে ইন্দোনেশিয়া ৬৪ ধাপ, মালয়েশিয়া ৪৬ ও সিঙ্গাপুর ৩২ ধাপ এগিয়ে। এমন দলগুলোর বিপক্ষে নিয়মিত খেলার সুযোগ পেলে নিজেদের দুর্বলতা আরো স্পষ্ট হবে বলে জানান ডুলি। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি কেবল র্যাঙ্কিংয়ে পেছনে থাকা দলগুলোর বিরুদ্ধে খেলে জিতে যান, তবে তা দেখতে হয়তো ভালো লাগে, কিন্তু আপনার কোনো সত্যিকারের উন্নতি হয় না। দুর্বল দলের বিরুদ্ধে খেলে কেবল আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, কিন্তু যখন আপনি দ্রুতগতির শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে খেলবেন, তখন হঠাৎ ধাক্কা খাবেন।’
র্যাঙ্কিং পার্থক্যই নয়, আসিয়ান কাপে মাঠ ও মাঠের বাহিরে অনেক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে বাংলাদেশ। ড্রেসিংরুমে নিয়ন্ত্রণ হারান হেড কোচ। ডুলির সঙ্গে আসিয়ান কাপে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হওয়া ফারহান আলী ওয়াহিদের দুরত্ব মিডিয়ায় আলোচিত হয়। রক্ষণভাগে তপু বর্মনের অনুপস্থিতি হারে হারে টের পায় বাংলাদেশ। তার অনুপস্থিতিতে সাদ উদ্দিন, জিদান ইউসুফ, তারিক কাজী, শাকিল আহাদ তপু, জায়ান আহমেদরা আলো ছড়াতে পারেননি। তিন ম্যাচে রক্ষণভাগ ৪৫টি ট্যাকল করে। তবে প্রতিপক্ষকে ২২টি কর্ণার দেয় বাংলাদেশের রক্ষণভাগ। গোলরক্ষক মেহেদি হাসান শ্রাবণকে নিয়েও চলছে সমালোচনা। তবে পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ১৬টি সেভ না দিলে গোল হজমের সংখ্যা আরো বাড়তো। তিন ম্যাচে ৩৫ শতাংশ বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে বাংলাদেশ। ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে সেটি ২৩ শতাংশে নেমে আসে। পাসিং অ্যাকুরেসি ৬২ শতাংশ। বড় দলগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশের আক্রমণভাগ যে কতটা নাজুক তার প্রমাণও মিলে। পুরো টুর্নামেন্টে তিন ম্যাচে মোট ১৪টি শট নেয় বাংলাদেশ। যার মধ্যে মাত্র পাঁচটি ছিল অন টার্গেট। ফিফা আসিয়ান কাপে বাংলাদেশে পাওয়া দুই প্রবাসী ফুটবলার ফারহান আলী ওয়াহিদ ও শুকি ইতোফুসা। ফারহান নিজের দ্বিতীয় ম্যাচে গোলের দেখা পান। ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে দারুণ একটি অ্যাসিস্ট করেন শুকি। বড় দলের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। এ নিয়ে ২৯ বছর বয়সী হামজা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা খুব ভালো কিছু খেলোয়াড়ের বিপক্ষে খেলেছি যাদের অনেকেই ইউরোপে খেলেন। তাই এটি আমাদের জন্য একটি ভালো অভিজ্ঞতা ছিল। এই সফরটি অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যই ছিল এবং আমার মনে হয় আমরা কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পেরেছি।’
