মানচিত্রের একটি রেখা নিজে কোনো বন্দর গড়ে তোলে না। আদালতের একটি রায় একাই কোনো অর্থনীতি বদলে দিতে পারে না। সমুদ্রবক্ষে বিপুল গ্যাস থাকলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তোলিত হয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয় না। সমুদ্রসীমার স্বীকৃতি মূলত একটি রাষ্ট্রের আইনি অধিকার নিশ্চিত করে। সেই অধিকারকে প্রকৃত অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করতে প্রয়োজন নির্ভুল তথ্য, বৃহৎ বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতি।
বাংলাদেশের জন্য এই যাত্রায় দুটি রায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণী মামলায় বাংলাদেশ যথাক্রমে ২০১২ সালের ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ট্রাইব্যুনালে এবং ২০১৪ সালের ৭ জুলাই জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদের অধীন গঠিত সালিশি ট্রাইব্যুনালে গুরুত্বপূর্ণ রায় লাভ করে। এই দুই রায় দীর্ঘদিনের আইনি অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক সীমানা ও অধিকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়তা তৈরি করে। কিন্তু মানচিত্রের এই ঐতিহাসিক অর্জনকে সুদৃঢ় সামষ্টিক অর্থনীতি, টেকসই কর্মসংস্থান ও জ্বালানি নিরাপত্তায় রূপান্তরের পরীক্ষায় বাংলাদেশ এখনো প্রাথমিক স্তরেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
নীতির কাগজ আর বাস্তবের খতিয়ানের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান থাকে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত বাংলাদেশের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা’ পর্যালোচনা করলেই এই ব্যবধানের একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। ওই নথিতে সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের কথা বলা হলেও কোনো নীতি বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগের আকার, বন্দরের দক্ষতা ও রাজস্ব আয়ের মতো বাস্তব মানদণ্ডেই বিচার করতে হয়। সোনাদিয়া ও মাতারবাড়ীর অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, জাপানের অর্থায়নে মাতারবাড়ী বন্দর প্রকল্প এগিয়ে যাওয়ায় সোনাদিয়া প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। এরপর ২০২০ সালে সরকার জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে সোনাদিয়া প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে। সরকারি ব্যাখ্যায় পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টি সামনে থাকলেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কিছু বিশ্লেষণে সিদ্ধান্তটির সঙ্গে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের সম্পর্কও তুলে ধরা হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে মাতারবাড়ী বন্দর দৃশ্যমান হলেও এই মেগাপ্রকল্পের আর্থিক বিস্তৃতি নেহাত কম নয়। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ ও ২০২৩ সালে সংস্থাটি দুই ধাপে মোট ১৪৪,২২৮ মিলিয়ন ইয়েনের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করে। দশ বছরের রেয়াতকালসহ মোট ত্রিশ বছরে পরিশোধযোগ্য এই বিপুল বিনিয়োগের সাফল্য শুধু জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা দিয়ে মাপা যাবে না। বন্দর কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ প্রকল্প দলিল অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে প্রায় ১৬ মিটার গভীর নৌপথে সর্বোচ্চ ৮,২০০ টিইইউ (ঞঊট) ধারণক্ষমতার বৃহদাকার জাহাজ ভেড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে মাতারবাড়ী বন্দরের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ এগিয়ে চলছে। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন হলো, পণ্য খালাস ও শুল্কায়ন প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত ও দক্ষ হবে। বৃহদাকার মূল জাহাজ সরাসরি ভিড়লে বিদেশি বন্দরের ওপর ট্রান্সশিপমেন্ট-নির্ভরতা কতটা কমবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন ব্যয় কমাতে না পারলে গভীর সমুদ্রের এই সুবিধা কার্যত উপকূলেই থমকে যেতে পারে।
সমুদ্রের উপরিভাগের অবকাঠামোর চেয়ে সমুদ্রবক্ষে জ্বালানি অনুসন্ধানের বাস্তবতা আরও কঠিন। ২০২৪ সালে নরওয়েজীয় প্রতিষ্ঠান টিজিএস এবং মার্কিন প্রযুক্তি ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এসএলবির সঙ্গে যৌথভাবে পেট্রোবাংলা বিশাল সামুদ্রিক এলাকায় দ্বিমাত্রিক সিসমিক জরিপ পরিচালনা করে। কিন্তু সামুদ্রিক ভূতাত্ত্বিক তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ হওয়া আর বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য মজুত আবিষ্কার; দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ওই বছর আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো দরপত্রের কাগজপত্র ও তথ্যভাণ্ডার কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউ চূড়ান্ত দরপত্র জমা দেয়নি। সে সময় আন্তর্জাতিক তেলের দামের পতনকে কারণ হিসেবে দেখানো হলেও বিনিয়োগ পরিবেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও এর অন্যতম নিয়ামক ছিল।
সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ২০২৬ সালের সামুদ্রিক গ্যাস ব্লকের নতুন দরপত্রে চুক্তির কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক দরপত্রে অগভীর ও গভীর সমুদ্রের মোট ২৬টি ব্লক উন্মুক্ত করা হয়েছে, যার দরপত্র জমার শেষ দিন আগামী ৩০ নভেম্বর। নতুন মডেল উৎপাদন অংশীদারি চুক্তিতে মুনাফা প্রত্যাবাসনের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক ব্রেন্ট ক্রুড সূচকের সঙ্গে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে। শতভাগ ব্যয় উত্তোলনের সুযোগের পাশাপাশি অগভীর সমুদ্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের ১০ শতাংশ বিনা মূলধনের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রথম অনুসন্ধানে কাঙ্ক্ষিত গ্যাস না মিললে পরবর্তী কূপে অপারেটর কোম্পানির মুনাফার হিস্যা বৃদ্ধির বিশেষ প্রণোদনাও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, এই বিনিয়োগবান্ধব চুক্তি কেবল বিদেশি কোম্পানিকে ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা নয়; বরং রাষ্ট্র ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে ঝুঁকি ও সম্ভাব্য লভ্যাংশ বণ্টনের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো।
বঙ্গোপসাগরকে কেবল তেল-গ্যাসের খনির মানচিত্র হিসেবে দেখলে তা হবে একটি গুরুতর কৌশলগত ভুল। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতি বা সামুদ্রিক খাত থেকে প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার মূল্য সংযোজন হয়েছিল, যা মোট অর্থনীতির প্রায় ৩ শতাংশ। তবে সামুদ্রিক প্রতিবেশগত সেবা ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের অর্থনৈতিক ক্ষতি বাদ পড়ায় এটি ছিল কেবল একটি আংশিক হিসাব। এক দশকের বেশি পুরোনো এই হিসাব আমাদের তথ্যগত ঘাটতিরই একটি প্রকট চিত্র তুলে ধরে। মৎস্য আহরণ, সামুদ্রিক পর্যটন ও জাহাজ নির্মাণের মতো খাতের বিপুল সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
সুনীল অর্থনীতির এই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে খণ্ডিত উদ্যোগের বদলে এখন একটি সমন্বিত জাতীয় ডেটা অবকাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য। ভূতত্ত্ব, মৎস্য, পরিবেশ ও নৌপরিবহনের তথ্য পৃথক দপ্তরে বিচ্ছিন্নভাবে সংরক্ষিত থাকলে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের সময় সমুদ্রসম্পদের পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। দরপত্রে কয়টি কোম্পানি অংশ নিল, তার চেয়ে জরুরি হলো বাজারের প্রকৃত প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করা। বড় আবিষ্কার হলে রাষ্ট্রের আয় কত হতে পারে, আর অনুসন্ধান ব্যর্থ হলে কে কতটা ঝুঁকি বহন করবে; এই দুই দৃশ্যপটের আর্থিক মূল্যায়ন জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। বিদেশি প্রযুক্তির পাশাপাশি দেশীয় প্রকৌশলী ও সামুদ্রিক গবেষকদের কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে সুনীল অর্থনীতির রূপকল্প শেষ পর্যন্ত নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সমুদ্র বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কতটা মূল্যবান হবে, তা কেবল বিশাল জলরাশির আয়তন কিংবা খনিজ সম্পদের সম্ভাব্য মজুত দিয়ে মাপা যাবে না। এর মূল্য নির্ভর করবে নির্ভুল তথ্য, স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের চুক্তি পরিচালনার দক্ষতার ওপর। আন্তর্জাতিক আদালত ও সালিশি ট্রাইব্যুনালের রায়ে টানা কালির রেখাগুলো এত দিন আমাদের মানচিত্রের সীমানা নির্ধারণ করেছে। এখন সেই রেখাগুলোকে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার সময়। বঙ্গোপসাগরের এই বিশাল জলরাশি তখনই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন জোরদার করার বাস্তব ভিত্তিতে পরিণত হবে, যখন সমুদ্রসীমার আইনি অধিকার দক্ষতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও সুশাসনের মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক ফলাফলে রূপ নেবে।
লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
