উচ্চতা অনুযায়ী শরীরের অতিরিক্ত ওজন বা চর্বি জমে থাকাকে ওজনাধিক্য (Overweight) বলে | বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ স্থূল বা অতিরিক্ত ওজনের শিকার, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রতি আটজনে একজন।ওজনাধিক্য বা স্থূলতা মাপার সবচেয়ে প্রচলিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হলো বডি মাস ইনডেক্স (BMI)। বিএমআই - নির্ণয়ের সূত্র বিএমআই -- কিলোগ্রামে শরীরের ওজনকে মিটারে শরীরের উচ্চতার বর্গ (square) দিয়ে ভাগ করতে হয়। ধরুন কারো ওজন ৫০ কিলো উচ্চতা ১.৫ মিটার বিএমই হবে- ৫০/(১.৫)২=২০
শ্রেণী বিন্যাস : ওজন ১৮.৫ - ২৪.৯: স্বাভাবিক ওজন
২৫ - ২৯.৯: ওজনাধিক্য (Overweight)
৩০ বা তার বেশি: স্থূলতা (Obese)
ওজনাধিক্যের মূল কারণ
বেশি খাওয়া ও কম পরিশ্রম ই মূল কারণ। তবে এর পেছনে আরও অনেক জটিল কারণ দায়ী:
১) অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস।
২) শারীরিক পরিশ্রমের অভাব।
৩) বংশগত কারণ ।
৪) হরমোনজনিত রোগ: হাইপোথাইরয়েডিজম, পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS) বা কুশিং সিন্ড্রোমের মতো হরমোনজনিত সমস্যা।
৫) ঔষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: স্টেরয়েড, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা মানসিক রোগের কিছু ওষুধ ওজন বাড়াতে পারে।
৬) মানসিক চাপ ও ঘুমের অভাব।
ওজনাধিক্যের প্রধান জটিলতা:
১) হৃদরোগ ও স্ট্রোক: রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ও রক্তচাপ বেড়ে যায় ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
২) ডায়াবেটিস: স্থূলতা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাড়ায়।
৩) ক্যান্সারের ঝুঁকি: স্তন, জরায়ু, কোলন, কিডনি ও পিত্তথলির মতো বিভিন্ন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৪) হাড় ও জয়েন্টের সমস্যা: অস্টিওআর্থারাইটিস (ক্ষয়বাত)
৫) স্বাসকষ্ট ও স্লিপ অ্যাপনিয়া: ঘুমের মধ্যে সাময়িক শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া ও সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠার প্রবণতা তৈরি হয়।
৬) যকৃত ও পিত্তথলির সমস্যা লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে 'ফ্যাটি লিভার' রোগ হতে পারে ফলে লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
৭) মানসিক ও প্রজনন স্বাস্থ্য: ওজনাধিক্য মানসিক অবসাদ, হীনমন্যতা এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাসের কারণ হতে পারে।
চিকিৎসা:
ওজন কমানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করুন। প্রচন্ড মানসিক ইচ্ছা ও আজীবন প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
১) খাদ্য নিয়ন্ত্রন:
প্রতিদিন তিনবেলা খাওয়ার অভ্যাস করুন কোন অবস্থায় একবেলা বাদ দেওয়া ঠিক নয়।
খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ: ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ কমাতে হবে।
যা খেতে মানা:- ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, ভাজাপোড়া, তৈলাক্ত খাবার, রোস্ট, ফ্রাইড রাইস, কাবাব, মিষ্টি জাতীয় খাবার ইত্যাদি।
যা খাবেন:- প্রচুর শাকসবজি ,তাজা ফলমূল, ভালো মানের প্রোটিন যেমন মাছ ,ডিম ,দুধ ও দই ,চামড়া ছাড়া মুরগি ইত্যাদি।
রান্নাতে তেল কমিয়ে দিন - ননস্টিক প্যান ব্যবহার করুন ।
সারাদিন ছয় থেকে আট গ্লাস পানি পান করুন।
খাবার সময় ভালো করে চিবিয়ে খান ।
উচ্চক্যালরির খাবার বাদ দিয়ে নিম্ন ক্যালরির খাবার দিয়ে সুষম খাদ্য তালিকা তৈরি করুন তা মেনে চলুন।
২) শারীরিক ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ধরনের অ্যারোবিক ব্যায়াম (যেমন- দ্রুত হাঁটা, সাঁতার কাটা বা সাইকেল চালানো। জিমে যোগ দিতে পারেন।
৩) ওষুধ থেরাপি: কিছু ক্ষেত্রে ওর্লিস্ট্যাট (Orlistat) বা নতুন প্রজন্মের সেমাগ্লুটাইড (Semaglutide)-টিরজপেটাইড (Tirzepatide) এর মতো ঔষধ ওজন কমানোর জন্য ভালো ফল দেয়।
৪) ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি: বিএমআই এর মাত্রা ৩৫ বা তার বেশি হলে এবং ওজনের কারণে হৃদরোগ, ডায়াবেটিসের মতো জটিলতা দেখা দিলে অস্ত্রোপচারের (গ্যাস্ট্রিক বাইপাস ইত্যাদি) সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
ওজন কমলে-খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যায়াম কে একটি আজীবন অভ্যাসে পরিণত করতে হবে সঠিক ওজন বজায় রাখার জন্য।
লেখক
প্রফেসর ডা. এ কে এম মূসা
অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ
চেম্বার: আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর -১০, ঢাকা
হটলাইন: ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯কুরিয়ার ঠিকানা
